রাজধানীর রূপনগর ও আদাবর থানায় করোনা সংক্রমণ বেশি

আগের সংবাদ

প্রিন্স ফিলিপের উপাধি কেন রাজা নয়

পরের সংবাদ

সাংবাদিকতার এক অধ্যায়ের অবসান

প্রকাশিত: এপ্রিল ১০, ২০২১ , ১০:৪৬ অপরাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২১ , ১০:৪৭ অপরাহ্ণ

আশির দশকের মাঝামাঝি আমরা যারা সাংবাদিকতা শুরু করেছি তারা দেখেছি, আকাশের মাঝখানে গনগনে দেদীপ্যমান এক সাংবাদিকতার জগত, যার মাঝখানে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো অবস্থান ছিল হাসান শাহরিয়ারের। তখন টেলিভিশন, ইন্টারনেট, অনলাইনের যুগ নয়; সাংবাদিকতা নিরেট লেখালেখি আর অপরিসীম জ্ঞানচর্চার এক জায়গা। দেশি-বিদেশি নানা কাগজে লেখালেখি আর তুমুল আড্ডার এক চর্চার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল সাংবাদিকতাকে ঘিরে। হাসান শাহরিয়ার ভাই, যাকে আমরা ডাকতাম শাহরিয়ার ভাই বলে, অগ্রজ এই সাংবাদিক বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিক সমাজের এক অভিভাবক হিসেবে কাজ করেছেন সেসময়। দেশের প্রথম সারির দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র এই সাংবাদিক ছিলেন নবীন সাংবাদিকদের এক আশ্রয়ের জায়গা। সাংবাদিকতায় বন্ধুত্বের জায়গাতে বয়স যে কোনো বিষয় নয়, সেটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হাসান সাঈদ, হাসান শাহরিয়ার এবং জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মতো সাংবাদিকরা। বহু জায়গায় একসঙ্গে অ্যাসাইনমেন্ট করেছি, অগ্রজ আর নবীন- এসব কোন বিবেচনাই ছিলনা। আমাদের মতো বহু সাংবাদিকের জন্য পথিকৃৎ ছিলেন তারা। পরামর্শ দিয়েছেন, উপদেশ দিয়েছেন কিভাবে সাংবাদিকতা করতে হয়। কখনো কখনো হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন কিভাবে প্রেস কনফারেন্সে প্রশ্ন করতে হয়, বড় সাংবাদিক হয়েও কত বিনয়ী থাকতে হয়। বাংলা-ইংরেজি, দুই ভাষায় লিখতেন শাহরিয়ার ভাই। একবার একসঙ্গে পাকিস্তানি গিয়েছিলাম নির্বাচন কভার করতে। পাকিস্তানের বড় বড় সাংবাদিকরা সবাই শাহরিয়ার ভাইয়ের বন্ধু। পেশাগত জীবনের শুরুর দিকে পাকিস্তানের প্রখ্যাত দৈনিক ডন-এ কাজ করেছেন তিনি। করাচি প্রেসক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল হামিদ ছাপরা শাহরিয়ার ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সুবাদে আমাদের তুমুল আড্ডা চলতো করাচি প্রেসক্লাবে।

কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার আগেই দেখতাম দুই হাতে লিখে বাংলা ও ইংরেজিতে কপি পাঠাচ্ছেন শাহরিয়ার ভাই। বাংলায় পাঠাচ্ছেন ইত্তেফাকে, ইংরেজিতে পাঠাচ্ছেন ভারতের প্রখ্যাত দৈনিক ডিকান হেরাল্ডে। আবার বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন নিউজ উইকের জন্য তৈরি করছেন কপি। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতাম- কিভাবে ইন্ট্রো বানাচ্ছেন, হেডিং তৈরি করছেন। আমাদের মতো নবীন সাংবাদিকদের জন্য তিনি ছিলেন এক বিস্ময়। একসঙ্গে পৃথিবীর বহু দেশে গেছি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। পরবর্তীতে আমরা দুজনেই যুক্ত হয়ে পড়লাম কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনে। ২০০০ সালে নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হলেন হাসান শাহরিয়ার। কমনওয়েলথ ভুক্ত ৫৪টি দেশের প্রতিনিধিদের সামলানোর এক অভূতপূর্ব কৌশল শিখলাম হাসান শাহরিয়ারের কাছ থেকে।

সম্মেলনে যাওয়ার আগে আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে। আমরা সহযোগিতা চাইলাম তার কাছে। প্রধানমন্ত্রী বললেন, সহযোগিতা করতে পারি কিন্তু শর্ত একটাই। সভাপতির পদে জিততে হবে। কিছু কৌশল বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে আফ্রিকানদের ডিল করতে হয়। কারণ তার মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ কমনওয়েলথ মহাসচিব পদে মনোনয়ন দিয়েছিল তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহানকে। আফ্রিকানদের অসহযোগিতায় বাংলাদেশ হেরে যায়, জিতে যায় নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধি। সেই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমরা কথা দিলাম বিজয়ী হব এবং আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম। হাসান শাহরিয়ার বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক, যিনি কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। শুধু সভাপতি পদে বিজয়ী নয়, পরবর্তী সম্মেলন আমরা বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলাম, যেটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৩ সালে। কিন্তু ততদিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে।

একসঙ্গে গেছি লন্ডনে, মাল্টায়, ভারতে, হংকংয়ে, মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সংগঠন চালানোর অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার। ২০০৮ সালে ইত্তেফাক থেকে অবসর নেয়ার পরও সাংবাদিকতা-লেখালেখি থামাননি শাহরিয়ার ভাই। অকৃতদার এই সাংবাদিক বহু সাংবাদিকের পারিবারিক বন্ধু। নিজের পরিবার না বানিয়েও অসংখ্য সাংবাদিককে নিয়ে এক বড় পরিবার গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ২৬ এপ্রিল তার জন্মদিন। আর জন্মদিন মানে শাহরিয়ার ভাইয়ের একটি পার্টি। আর সেই পার্টিতে সস্ত্রীক তার ঘনিষ্ঠজনরা সবাই আমন্ত্রিত। মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, আমলা, বিচারপতি থেকে শুরু করে নবীন সাংবাদিক- কেউ বাদ যায় না এই পার্টিতে।

আর মাত্র কয়েকদিন পর ২৬ এপ্রিল। এবার আর শাহরিয়ার ভাইয়ের জন্মদিনের পার্টি হবে না। গত কয়েক বছর ধরে শাহরিয়ার ভাইয়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। করোনার কারণে দেড় বছর ধরে সেখানে যেতে পারছিলেন না। শরীর একটু সুস্থ হলেই ছুটে আসতেন প্রেসক্লাবে অথবা ঢাকা ক্লাবে। দেখা হতো মাঝে মাঝে, আগের মতো নিয়মিত নয়। তবে নিয়মিত কথা হতো টেলিফোনে, পরামর্শ নিতাম নানা কাজে।

কয়েকদিন আগে কথা হল। অনুরোধ করলেন তার নতুন একটি প্রকাশিত বই ‘যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ বইটির প্রচ্ছদ ছেপে দেয়ার জন্য। ছেপে দিয়ে ফোন করলাম। কথাও হল। জানালেন শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ খবর এলো শাহরিয়ার ভাইয়ের শরীর খুব খারাপ। নিয়ে যাওয়া হয়েছে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। রাতেই আইসিইউ দরকার। কোথাও নেই আইসিইউ। শেষ পর্যন্ত তেজগাঁওয়ের ইমপালস হসপিটালে ব্যবস্থা করা গেল একটি আইসিইউর। রাত সোয়া দুইটার সময় ভর্তি হলেন শাহরিয়ার ভাই। শুক্রবার দিনভর চিকিৎসা। ডাক্তাররা জানালেন, তার ফুসফুসের ৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। একটি ইঞ্জেকশন দরকার। অ্যাক্টেমরা। কোথাও পাওয়া গেল না এই ইঞ্জেকশন। ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাম এই ইঞ্জেকশনের। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণজনকে ধরেও ব্যবস্থা করতে পারলাম না আমরা ইঞ্জেকশনের। কয়েকজন ডাক্তার বন্ধু জানালেন, রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালগুলো এই ইঞ্জেকশন মজুদ করে রেখেছে তাদের নিজেদের রোগীদের জন্য। তারা দয়া করলে পেতে পারেন। সুইজারল্যান্ডের রস কোম্পানির ইঞ্জেকশনের স্থানীয় বিক্রেতা রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোন লাভ হল না।

মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশ। হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন একজন সাংবাদিক। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন একটি ইঞ্জেকশনের অভাবে। ইঞ্জেকশন দিলে বেঁচে যেতেন কিনা নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু আমরা পারলাম না একটা ইঞ্জেকশন জোগাড় করতে! শনিবার দুপুর ১২ টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার। মৃত্যুর খবরটি পেয়ে বাসার ড্রয়িং রুমে আমি বসে আছি নিস্তব্ধতায়। এই ড্রইংরুমে বহুদিন আড্ডা মেরেছি শাহরিয়ার ভাইয়ের সঙ্গে। আমার দুচোখ ভরে আসছে অশ্রsজলে। ক্ষমা করবেন শাহরিয়ার ভাই, আপনার প্রিয় বাংলাদেশে আপনার জন্য একটি ইঞ্জেকশনের ব্যবস্থা করতে পারলাম না আমরা।

শাহরিয়ার ভাইয়ের জন্মদিন ২৬ এপ্রিল আর মাত্র কয়েকদিন পরে। পৃথিবীতে তো তার আপন নিয়মেই সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। শুধু ২৬ এপ্রিল শাহরিয়ার ভাইয়ের সেই জন্মদিনটা আর হবে না। কী করে হবে? কারণ আমরা যারা তার অনুরক্ত, তাদের হৃদয়টা যে বেদনায় ভরা। আর শাহরিয়ার ভাই শুয়ে আছেন রায়েরবাজারে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত কবরস্থানে। জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে তার যে যাত্রা অসীমের পানে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়