তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছ জবাবদিহিতা থাকতে হবে

আগের সংবাদ

মুজিবনগর সরকারের সংকট ও সাফল্য

পরের সংবাদ

পিটার কানের এপ্রিল ১৯৭১

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: এপ্রিল ১০, ২০২১ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২১ , ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

একাত্তরের বাংলাদেশ নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত ঢাকা ডায়েরি পিটার কানকে এনে দিয়েছে ১৯৭২ সালের পুলিৎজার পুরস্কার। তার জন্ম ১৯৪২ সালে আমেরিকার নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের প্রিন্সটন শহরে একটি ইহুদি পরিবারে। হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় সানফ্রান্সিসকো ব্যুরোতে যোগ দেন। ১৯৭১-এ তিনি ওয়াল স্ট্রিটের উপমহাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের তিনি অন্যতম সাক্ষী। ১৯৬৭ সালে পিটার কান ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সেখানে প্রথম রেসিডেন্ট রিপোর্টার নিয়োজিত হন। পরবর্তীকালে তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এশিয়ার সম্পাদক; ১২ বছর এ দায়িত্ব পালনের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান জার্নালের প্রকাশক এবং ডাউ জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজের চেয়ারম্যান হন।
তার স্ত্রী ক্যারেন এলিয়ট হাউজ (জন্ম ১৯৪৭) একই পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে সাংবাদিকতায় তিনিও ১৯৮৪ সালের পুলিৎজার পেয়েছেন।
২১ এপ্রিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত তার প্রতিবেদন ‘পূর্ব পাকিস্তানিরা আমৃত্যু লড়াই করতে প্রতিশ্রুত’ ভাষান্তর করে উপস্থাপন করা হচ্ছে :

মেহেরপুরের কাছে
গরুর গাড়িতে, রিকশা, সাইকেলে, কদাচিৎ ট্রাকে, তবে অধিকাংশই পায়ে হেঁটে- বাংলাদেশের জনগণ এবং সৈনিক ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করছে। মেহেরপুর থেকে আরো আধ মাইল ভেতর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি মর্টার ও ছোট অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ এখানে এসে পৌঁছেছে।
ভারতগামী ট্রাক আঁকড়ে ধরা এক দল বাঙালি চেঁচিয়ে বলল, ‘মেহেরপুরে পাঞ্জাবি কামান আর বোমা’, তারা তাদের গ্রামের শেষ সশস্ত্র মানুষটিকে তুলে দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত ৪ মাইলের সফর মূলত জনশূন্য গ্রামের ভেতর দিয়ে একটি ভ্রমণ। মেহেরপুরের ধনীরা একদিন আগেই তাদের শহর ছেড়ে দিয়ে সরে এসেছে। আজ যারা পালাচ্ছে তাদের অধিকাংশই গ্রামের মানুষ, খালি পা; ৬ সন্তানসহ বিপর্যস্ত এক নারী, সবার মাথায় একটি করে বোঝা; দুজন পুরুষ বহন করছে একটি বিচ্ছিন্ন করা খাট, এক অন্ধ দড়ি ধরে সে গরুকে অনুসরণ করছে।
ভারতীয় সীমান্তের এ পারে এক ভারতীয় সামরিক চত্বরে বাংলাদেশ আর্মির একশ বা তার বেশি ক্ষুব্ধ ও নির্বাক সদস্য, তাদের পদমর্যাদা ইনসাইনিয়া খুলে ফেলা হয়েছে। ভারতীয় এলাকায় এক ডজনেরও বেশি বাংলাদেশি জিপ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে কেবল দুটি রিকয়েললেস রাইফেল। এখান থেকে আরো কয়েক মাইল ভেতরে সীমান্তের নিকটবর্তী শহরে রাজনীতিবিদ, আমলা ও পেশাজীবীরা শব্দমুখরÑ তারা বলছেন লড়াই করে যেতে হবেÑ শেষ মানুষটি বেঁচে থাকা পর্যন্ত লড়াই চলবে। মার্চে পাকিস্তানে গণযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বহু বাঙালির মৃত্যু ঘটেছে। বিভিন্ন কারণে যথেষ্ট লড়াই এর মধ্যেই হয়ে গেছেÑ এ সময়ে ঘোষিত যুদ্ধটি সম্ভবত দুর্বলতম এবং সবচেয়ে কম সময়ের বিপ্লবী যুদ্ধ হিসেবে রেকর্ড করবে। এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ৫০ হাজার সৈন্য, সীমিত গোলাবারুদ এবং বিমানবাহিনীর সহায়তা নিয়ে সাড়ে ৭ কোটি বৈরী বাঙালিকে সাময়িকভাবে পরাস্ত করেছে বলে মনে হয়েছে।

স্বাধীনতা পথ দীর্ঘ
এ কথার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ সৃষ্টির স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। গত চার সপ্তাহ বিপ্লবের যে স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ ঘটছে কেবল তার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা যাবে না। স্বাধীনতা অর্জন কয়েক সপ্তাহে হয় না, বছরের পর বছর লেগে যাবে, বক্তৃতা নয়, অনেক বেশি লড়াই লাগবেÑ গেরিলা কৌশলের লড়াই, প্রচলিত যুদ্ধ নয় আর সম্ভবত সেজন্য লাগবে জঙ্গি বামপন্থি, আদর্শবাদী মধ্যপন্থি নয়। অনেক বেশি নির্ভর করবে ভারতের ওপরÑ তারা অস্ত্র সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি যুদ্ধের জন্য সীমান্ত আশ্রয় দেবে কি না তার ওপর নির্ভর করবে।
যাই ঘটুক পশ্চিম পাকিস্তানকে গভীর সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রধানত বিশাল গ্রামাঞ্চল এবং বর্ষা মৌসুম এসে যাচ্ছে। এ সময় দখল বজায় রাখার জন্য সেনা মোতায়েন কেমন করে করবে তা তাদের দুশ্চিন্তার বিষয়। তিক্ততার বিজয় দিয়ে উপনিবেশ তারা কেমন করে চালাবে, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি, কেমন করে জোড়া লাগবে, কেমন করে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমিত সম্পদ দিয়ে এই উপনিবেশ টিকিয়ে রাখবে? বাঙালিদের প্রতিরোধের আন্দোলনে ভারত যদি আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তারা কেমন করে সামাল দেবে?
যদি পশ্চিম পাকিস্তানেও সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর আন্দোলন ও অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে ফেলে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল ও বিরোধী দলগুলো যদি তাদের সঙ্গে যোগ দেয় এই সংকট মোকাবিলা করা পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।
আন্দোলনটি স্পষ্ট
বিভান্তিকর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অস্পষ্ট নৈতিক বিরোধের যুগে বাঙালিদের যুদ্ধটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। ১৯৪৭-এ ইংল্যান্ড যখন তার ভারত সাম্রাজ্যকে স্বাধীনতা দিল, উপমহাদেশটি ভৌগোলিক যুক্তি অগ্রাহ্য করে ধর্মীয় সীমারেখা ধরে ভাগ করে দেয়া হয়। নতুন মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান দুই টুকরো ভূখণ্ড, মাঝখানে হিন্দু ভারত ১২০০ মাইলের দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবিদের হাতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্যে অন্যরা শোষণের শিকার হয়েছে, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান।
গত ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয়তাবাদী দল আওয়ামী লীগকে একচেটিয়া ভোট প্রদান করে। পরিষদে লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেÑ যার অর্থ দাঁড়ায় গণতান্ত্রিক শাসনের আওতায় ক্ষমতা বদল হয়ে পূর্ব পাকিস্তানিদের হাতে চলে যাবে। প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ছাড়া অন্য সব বিষয়ে আওয়ামী লীগের পশ্চিমা ভাবাদর্শ এবং সীমিত সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছেন। অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও সৈনিকরা এর ঘোর বিরোধিতা করে।
পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকের আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যও সামরিক সরঞ্জাম পূর্ব পাকিস্তানে আসতে থাকে। ২৫ মার্চ রাতে সেনাবাহিনী আকস্মাৎ বর্বরভাবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আক্রমণ চালিয়ে বাঙালি বিক্ষোভকারীদের সহিংস নির্মমতায় দমন করার উদ্যোগ নেয়। তারা চট্টগ্রাম এবং ঢাকা দখল করে নেয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অন্য শহরে বাঙালিরা প্রতিরোধ করতে থাকে এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এটা অনেকটা গল্পের বইয়ের বিপ্লবের মতো- হাজার হাজার প্যাট্রিক হেনরি সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেবেন এবং হাজার হাজার বেটসি রোজেস লাল, সবুজ ও হলুদের পতাকা তৈরি করতে শুরু করবে। সিভিল সার্ভিস ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী সংস্থা) স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেয়, যেমন দেয় সব শ্রেণির মানুষ এবং ভিন্নতার পরও সব রাজনৈতিক সমর্থক। বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে আদিম কুটির থেকে শুরু করে শহরের অফিসে, গরুর গাড়ি থেকে শুরু করে জিপে। আর কৃষকের সন্তান থেকে শুরু করে ঈষৎ স্থূলদেহের রাজনীতিবিদ, সবার মুখেই তাদের বিপ্লবী সেøাগান- জয় বাংলা।
অস্ত্রবিহীন সেনাবাহিনী
কিন্তু কিছু বিষয় আছে যা বাঙালিদের নেই, কিংবা তারা প্রস্তুত হয়নি। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের মিলিশিয়া ছাড়া স্বাধীনতার সৈনিকদের প্রায় সবারই অস্ত্রও নেই এবং প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি রাইফেলও পুরনো ফ্যাশনের হালকা অস্ত্র। অনেক জায়গায় বাঙালিরা সম্পূরক হিসেবে সরবরাহ করছে ঘরে তৈরি মলোটভ ককটেলের মতো একটা কিছু এবং আদ্দিকালের মাইন।
বাঙালিরা এই যুদ্ধটির জন্য বিস্ময়করভাবে অপ্রস্তুতÑ এমনো হতে পারে বছরের পর বছর ধরে এ যুদ্ধ চলবে। তাদের কাজ চালানোর মতো যোগাযোগ ও সংযোগ মাধ্যম নেই, এমনকি নেই বার্তাবাহক রানার- ফলে বাংলাদেশের নিয়তি এক এক জেলায় এবং এক গ্রামে ভিন্ন ধরনের। নেতৃত্ব রয়েছে মূলত আওয়ামী লীগের হাতে, সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের হাতেও। শুরুতে শহরে থেকে তাদের লোকজন নিয়ে আবেগময় উদযাপন: পরে আবারো আবেগময় কণ্ঠে উড়োজাহাজ, কামান ও বিদেশি সহায়তা না থাকার বিলাপ। শেখ মুজিব পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি বলেই বিশ^াস, একজন পুরোদস্তুর বাঙালি। তার একজন বাঙালি সমালোচক বলেছেন- ‘একজন অসম্ভব মানুষ, যখন তাকে কোনো প্রশ্ন করবেন তিনি ঠাকুরের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে জবাব দেবেন।’ ঠাকুর বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ কবি। সম্ভবত আরাকানসাস অঙ্গরাজ্যের আকৃতির ৫৫ হাজার বর্গমাইল জায়গায় ছড়িয়ে থাকা সাড়ে ৭ কোটি মানুষের সামনে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সশস্ত্র অবস্থায় মুখোমুখি হয়ে আছে। তারা যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহ শহরে সামরিক দুর্গের গর্তে ঢুকে আছে। কিন্তু গোলন্দাজ গোলার সমর্থন নিয়ে তারা যখন শেষ পর্যন্ত মাঠে নামল, বাঙালিরা সামান্যই প্রতিরোধ করতে পারল।

প্রতিরোধহীন সেনাবাহিনী
গত সপ্তাহের শেষ নাগাদ সেনাবাহিনী শহর জনশূন্য করতে শুরু করেছে, সৈন্যরা যখন রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছে সাধারণত কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে না। কোনো কোনো জায়গা থেকে খবর আসছে বাংলাদেশের নেতা ও বাঙালি সৈন্যরা গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য জায়গা যেমন- মেহেরপুর বা সীমান্তবর্তী শহর থেকে ভারতীয় পশ্চিমবঙ্গের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় সীমান্ত শহর গেদেতে (দর্শনা সীমান্তে) একজন বাঙালি স্কুল প্রিন্সিপাল বাংলাদেশের সাময়িক রাজধানীতে স্বাগত জানাচ্ছিলেন, তিনি একটি ভারতীয় গেস্ট হাউসে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বললেন, আমাদের ৭ কোটির শেষ মানুষটি বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব।
গেদেতে অন্য একজন হতাশাবাদী কিন্তু তার অনুভূতির যথার্থ বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, যা ক্ষতি হয় হোক, হাজার হাজার লোক মেরে পাঞ্জাবিরা হেসে-খেলে আমাদের শাসন করে যাবে। আমরা কী করব? অস্ত্র তো আমাদের নেই। ভারতীয়রা আমাদের হাঁস মারার বন্দুক দিয়েছে, পাঞ্জাবিরা তো আর হাঁস নয়। গতকালই আমরা চাষবাস করেছি, আর আজই আমাদের হতে হবে গেরিলা সৈন্য। এটা কেমন করে সম্ভব। কেউ বলছে বর্ষাকাল আমাদের সহায়ক হবে। কিন্তু কেমন করে? আমাদের আছে পেন্সিল কাটা ছুরি আর ঠৈঙ্গা, আমরা পানির মধ্য দিয়ে যাবÑ তাদের আছে উড়োজাহাজ, কামান আর কারবাইন। আমরা কী করতে পারি!
দর্শনা সীমান্তে ৩ মাইল ভেতরে বহুসংখ্যক বাংলাদেশ সমর্থক একটি সাবেক পুলিশ ফাঁড়িতে বসে তারা পরস্পরবিরোধী খবর দিয়ে আতঙ্কিত করে তুলছে যে অস্থায়ী রাজধানী আরো ১০ মাইল ভেতরে চুয়াডাঙ্গার পতন আসন্ন হয়ে উঠেছে। দুটি পাকিস্তানি উড়োজাহাজ চুয়াডাঙ্গায় বোমা ফেলেছে… একের বেশি বাঙালি নিহত হয়েছে… পাঞ্জাবিরা শহর থেকে আর মাত্র ৩ মাইল দূরে আছে, আশপাশে কোনো বাংলাদেশি বাহিনী নেই, সবাই চলে গেছে।

আমরা মরতে প্রস্তুত
একজন রাজনীতিবিদ শপথ নেয়া আন্তরিক বক্তৃতায় বললেন, বাইরের পৃথিবী বাংলাদেশের কাজে আসতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্যজন জিজ্ঞেস করলেন আর্মি ঠেকাতে পরিকল্পনা কী? জবাব এলো প্রয়োজনে আমরা মরব, অন্যরা মাথা নাড়ল। কিন্তু পরের দিনই পাকিস্তানি সৈন্যরা বিনা বাধায় চুয়াডাঙ্গা শহরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে না আসার কথা শোনানো হচ্ছে। তাদের এই চাওয়া সরল বলে মনে হতে পারে, তবে বাস্তববাদী মানুষেরাও পৃথিবীর নিস্পৃহতায় হতাশ হয়েছে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পরই স্বাধীনতার লড়াই শুরু করেছে। হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে পাকিস্তানকে চিঠি দিয়ে রাশিয়া বাংলাদেশকে কিছুটা মৌখিক সমর্থন জুগিয়েছে। আর যুদ্ধের প্রস্তাবক চীন পাকিস্তানকে বড় গলায় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রতিবেশী এবং শত্রু ভারতই একমাত্র দেশ যে বাংলাদেশকে মৌখিক সমর্থন দিচ্ছে, সীমান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত সহায়তা পাঠাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ ও বাহিনীকে সাময়িকভাবে হলেও আশ্রয় দিয়েছে। ভারত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং সংঘটিত সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসছে।
এখন পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তান দুপক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে তিক্ত অভিযোগ আনলেও সত্যিকারের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে বলেই মনে হয়। কিন্তু তারা যদি এই সতর্কতা বজায় না রাখে তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের নৈরাজ্য উপমহাদেশকে গিলে খাবে।
ভারতীয় সীমান্ত থেকে অল্প ভেতরে গত শনিবার (১৭ এপ্রিল ১৯৭১) মুজিবনগরের আমবাগানে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার সংবাদ মাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়েছে, বক্তারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ভাষণ দিয়েছেন। এই গৌরব দ্রুত কমে আসতে শুরু করেছে, উৎসবের পরের দিনই কয়েক ডজন অধিবাসী ছাড়া গোটা গ্রামই জনশূন্য হয়ে গেছে। সেই আমবাগানের নিচে সন্ধ্যা আগের মতো স্থির হয়ে আছে, কেবল কিছু মুরগি এবং একটি রাজহাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে।
গৌরবের স্মৃতি রয়ে গেছে। সীমান্তের ভারতীয় দিকে বাংলাদেশি কর্মকর্তা আগের দিনের গৌরবের স্বপ্ন নিয়ে মজে আছে- সাতজন মন্ত্রী, সাতাশজন সাক্ষী, সুন্দর ভাষণ, চমৎকার উৎসব।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়