করোনা বাড়ায় পাঠানের শ্যুটিং বন্ধ

আগের সংবাদ

লকডাউনেও চলবে পুঁজিবাজারের লেনদেন

পরের সংবাদ

জন কেরির ৪ ঘণ্টার সফর

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরল ঢাকা

প্রকাশিত: এপ্রিল ১০, ২০২১ , ১:৫৩ অপরাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২১ , ১:৫৯ অপরাহ্ণ

বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন শেখ হাসিনা

আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঢাকা ছাড়লেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি। তার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

এ সময় কেরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন প্যারিস চুক্তির আলোকে আবারো বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে রক্ষার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিতে চায়। ভবিষ্যতের সেই প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ, ভারতসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোর অংশগ্রহণও আশা করছেন তিনি। এমনকি প্যারিস চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা উল্লেখ ছিল, অঙ্গীকার অনুযায়ী সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে বাইডেন প্রশাসন। আর এসব বিষয় নিয়েই আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনা হবে বলে জানান কেরি। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার বিবরণ জন কেরির কাছে তুলে ধরা হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

একদিনের সফরে গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকায় পৌঁছান জন কেরি। চার ঘণ্টা সফর শেষে গতকালই বিকালে ঢাকা ছাড়েন তিনি। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা কালে ২০১৬ সালে একদিনের সফরে ঢাকা এসেছিলেন জন কেরি।

প্রসঙ্গত, আগামী ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে জলবায়ুবিষয়ক ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতেই একদিনের সফরে এলেন জন কেরি। যুক্তরাষ্ট্রে ৪০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ভার্চুয়াল এই জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেবেন। জলবায়ু সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সকলে মিলে সবুজ পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করা’। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তা মোকাবিলা নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ সম্মাননা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে কেরিকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এ সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারও উপস্থিত ছিলেন। এরপর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি মো. ফারুক খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা পদ্মায় বৈঠক করেন। এতে জলবায়ুর পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়সহ রোহিঙ্গা ইস্যুও আলোচনায় স্থান পেয়েছে। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মলেন করেন। এরপর কেরি গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘গ্লোবাল লিডারস সামিট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এ প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার বিবরণ জন কেরির কাছে তুলে ধরা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের বিভিন্ন নদনদীর নাব্যও যে কমে গেছে সেটিও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরো জোরালো ভূমিকা চেয়েছে বাংলাদেশ। আলোচনায় উঠে এসেছে সমুদ্র থেকে প্রাকৃতিক শক্তি উৎপাদনের বিষয়টিও।

জন কেরির সঙ্গে আলোচনার মূল লক্ষ্য কী ছিল জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. ফারুক খান ভোরের কাগজকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ওপর ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে যেসব নদীর নাব্য কমে গেছে সেগুলো ফিরিয়ে আনতেও বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সবমিলিয়ে বেশকিছু বিষয় তারা জানতে চেয়েছে যেখানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়কমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, জলবায়ু সম্মেলনের দাওয়াত দিতে এলেও জন কেরির সঙ্গে বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে সেসব বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। এই ক্ষতির বিবরণ নিয়েই আসন্ন সম্মেলনে আলোচনা হবে বলে জানান এই মন্ত্রী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য প্রতিবছর ১০০ কোটি ডলার তহবিলে অর্থায়ন করার কথা উন্নত বিশ্বের। কিন্তু এ বিষয়ে অগ্রগতি খুবই কম।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরিকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের কাজটি জন কেরি করতে পারবেন। মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের বনায়ন ধ্বংস করছে। তাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এর সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দরকার বলে কেরিকে জানিয়েছি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে জন কেরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অনুরোধে আমি এখানে এসেছি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আবার প্যারিস এগ্রিমেন্টের বাস্তবায়নের নেতৃত্বে ফিরে এসেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, আমাদের নাগরিক এবং দেশগুলোকে সুরক্ষার জন্য এসব প্রচেষ্টা। জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা কোনো একক দেশ সমাধান করতে পারবে না। সংকট যে আছে এ নিয়ে কোনো দেশের কোনো সন্দেহ নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন দুর্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দেখেছি। উত্তরণের জন্য সবাইকে এক সঙ্গে কাজে নামতে হবে।

জন কেরি জানান, বিশ্বের কোনো দেশই জলবায়ু ঝুঁঁকির বাইরে নয়। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু ইস্যু থেকে পিছিয়ে পড়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বাইডেন বলেন, ভবিষ্যতে এই খাতে দুই ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। প্যারিস ছিল সূচনা। আমরা জানি আমাদের আরো সামনে যেতে হবে। আমি দুঃখিত যে আমাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন জলবায়ু ইস্যুতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমার বাংলাদেশ, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই সফরের কারণ হচ্ছে এসব দেশের জলবায়ু সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিন্ন পথে হাঁটছে মিয়ানমার : রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমার সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যে মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা প্রশংসনীয়। এই সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কাজ করে যাবে। তারমতে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য অনেক উদারতার পরিচয় দিয়েছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ।

তিনি বলেন, আপনারা তাদের একটি দ্বীপ (ভাসানচর) দিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা হয়েছে এবং এখন মিয়ানমারের জনগণের সঙ্গে যা হচ্ছে, সেটি বর্তমান সময়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কেরি বলেন, আপনারা তাদের একটি দ্বীপ (ভাসানচর) দিয়েছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ কাজ করছে। কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নয়। এটি তাদের সমস্যা সমাধান করবে না।

জন কেরি আরো বলেন, নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন এ বিষয়ে নজর রাখছেন। তিনি এবং মার্কিন প্রশাসন মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য সবকিছু করবেন। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর যে চাপ ও চ্যালেঞ্জ আছে, সেটি কিছুটা কমবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত। কারণ, এটি বাংলাদেশের একার বোঝা নয়। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বিশ্বকে সহযোগিতা করবে- এমন প্রশ্নের জবাবে কেরি বলেন, করোনা ঝুঁঁকি মোকাবিলায় আমরা ভ্যাকসিনেশনে বৈশ্বিক সহযোগিতা চাই। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ স্বীকৃতি পাচ্ছেন শেখ হাসিনা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ স্বীকৃতি পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম ও ভালনারেবল টোয়েন্টি গ্রুপ অব ফাইন্যান্স মিনিস্টার্সের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জলবায়ু ঝুঁঁকির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও সহনশীলতা অর্জনে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জলবায়ু সংকট রোধে প্রশমন ও অভিযোজনকে সহায়তা দিতে এবং সমৃদ্ধিকে সমর্থন জোগাতে বিনিয়োগ দরকার। এই বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র। নভেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) ২৬তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ২৬) অনুষ্ঠিত হবে। তার আগেই কেরি এই সফরে আসেন। এই সফরের অংশ হিসেবে আবুধাবি ও নয়াদিল্লিতেও যাত্রা বিরতি করেন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এই বিশেষ দূত। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিলারের বরাত দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আপনারা আগেও দেখেছেন এবং অব্যাহতভাবে দেখবেন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনকে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় আলোচনার সব পর্যায়ে যুক্ত করছে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়