সর্পের মস্তকে মণি থাকলেও সে কি ভয়ঙ্কর নয়

আগের সংবাদ

জীবন রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ

পরের সংবাদ

ভাইরাস বাহককে ‘লক’ না করলে সংক্রমণ ‘ডাউন’ হবে না!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২১ , ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০২১ , ৯:৫৫ অপরাহ্ণ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখ বাংলাদেশে প্রথম করোনাক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলেও ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে করোনা ভাইরাস গোটা দুনিয়াকে রীতিমতো আগাম হুমকি দিয়ে এর বিস্তার শুরু করে। বাংলাদেশে ২০২০ সালের মার্চে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের যাত্রা শুরু হলেও ততদিনে গোটা দুনিয়া বিশেষ করে ইউরোপে করোনার ব্যাপক বিস্তার ঘটে গেছে। ততদিনে বাংলাদেশের মানুষও বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কী কী করণীয় সেসব শিখে গেছে। মুখে মাস্ক পরতে হবে, বারবার সাবান দিয়ে (কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড) হাত ধুতে হবে কিংবা স্যানিটাইজ করতে হবে, খুবই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া যাবে না, বাইরে গেলে সামাজিক দূরত্ব (আদতে শারীরিক দূরত্ব) বজায় রাখতে হবে, কন্টাক্ট ট্রেসিং (কার ম০াধ্যমে কার কাছে ভাইরাস ছড়িয়েছে), আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, ইমিউনিটি প্রভৃতির সঙ্গে ততদিন পরিচয় ঘটে গেছে। আমাদের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও সমানতালে আমাদের শিক্ষিত করেছেন। কিন্তু সমাজের নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে ‘হররোজ যাদের জীবন-যুদ্ধ তাদের আবার মরণের ভয় কি’ জাতীয় গভীর জীবন-দর্শনের কারণে কিংবা যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার কারণে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত আতঙ্ক, ভয়-ডর এবং সচেতনতার ছবক খুব একটা কাজ করেনি। তবে যে বিষয় নিয়ে মানুষ মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছিল সেটা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের বিস্তার এবং সংক্রমণ রোধ করতে হলে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হচ্ছে ‘লকডাউন’। ঢাকার টোলারবাগে লকডাউন দিয়ে বেশ কার্যকর ফল পাওয়া গিয়েছিল। নারায়ণগঞ্জেও লকডাউন দিয়ে বেশ ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মডেলের একটা দেশীয় টেস্টও সীমিত আকারে হয়েছিল এবং সেটা বেশ সফল ছিল। চীনের যে শহরে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি বলে ধরে নেয়া হয়, সেই উহান শহরকে পুরোপুরি লকডাউন করে চীন করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণ রোধ করতে পেরেছিল বলে বিশ্বব্যাপী প্রচার করা হয়েছে। তা ছাড়া ইতালি, ফ্রান্স এবং স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন দিয়ে রাখা হয়েছিল মাসের পর মাস। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণ রোধে লকডাউন বেশ কাজে এসেছিল বলে দেশি-বিদেশি অনেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আমাদের জানিয়ে শিক্ষিত করেছেন। ফলে গত বছর করোনা ভাইরাসে বিস্তার রোধে বাংলাদেশে যখন ‘লকডাউন’ না দিয়ে ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন অনেকে বেশ গোস্সা করেছিলেন। সংবাদপত্রে এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছিল ‘কেন লকডাউন না দিয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল’। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, লকডাউনের ইউরোপীয় বা পাশ্চাত্য মডেল বাংলাদেশে পাইকারি হারে প্রয়োগ করা যাবে না। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, শহর-গ্রামের জীবন-জীবিকার ধরন ও প্রকার এবং সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি-বৈষম্যের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এদেশের নিম্নবিত্তের মানুষের জীবন ও জীবিকার কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর এমন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না, যা সমাজের ২০ শতাংশের জন্য কল্যাণকর কিন্তু ৮০ শতাংশ মানুষকে জীবন ও জীবিকার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। তাই গত বছরের সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিই বেশ কার্যকর ফল দিয়েছিল। আর ফল দিয়েছিল বলেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বেঁচে গিয়েছিল, অর্থনীতির চাকা সচল ছিল, সমাজের নিম্নবিত্তের মানুষ দুবেলা খেয়ে-পরে বাঁচতে পেরেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক নানান সূচকের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পতন হয়নি। অর্থাৎ লকডাউনের পরিবর্তে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার কারণে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণও যেমন একদিকে কমানো গেছে, তেমনি অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও শক্ত রাখা গেছে। কিন্তু এবারের সংক্রমণের ধরন, মাত্রা, তীব্রতা ও মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। হঠাৎ করে সংক্রমণের পরিবৃদ্ধি ও মৃত্যুর সংখ্যা এত বিপুল হারে বেড়ে গেছে এবং যাচ্ছে যে, এটাকে যদি যথাযথভাবে লাগাম টেনে ধরা না যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পরিণতি যে কী ভয়াবহ হতে পারে সেটা বছরজুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। বিশেষ করে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং ভারতের উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে আছে। বাংলাদেশ এমনিতেই জনবহুল এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। তাই যদি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে আমাদের সবার জন্য এটা যে একটা অনেক বড় বিপর্যয় নিয়ে আসবে সেটা উপলব্ধির জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ফলে সরকারের তরফ থেকে লকডাউন দেয়া ছাড়া আর কেনা উপায় ছিল না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কেমন লকডাউন? যে লকডাউনে গণপরিবহন ও আন্তঃজেলা বাস, ট্রেন এবং বিমান চলাচল ছাড়া প্রায় সবকিছুই আন-লক্ড, সেটা আদৌ লকডাউন কিনা তা নিয়ে বিস্তর বাহাস হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে বেশ লকডাউন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন! সংবাদপত্রে এবং টিভি চ্যানেলগুলোতে চলছে নানান বিচার-বিশ্লেষণ। অনেকে বলছেন এটা হচ্ছে লকডাউনের বাংলাদেশি ভার্সন। বিশেষ করে গণপরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রেখে অফিস-আদালত সীমিত আকারে খোলা রাখার কারণে লকডাউনের মধ্যেও জনগণকে জীবিকার সন্ধানে রাস্তায় নামতে হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খোলা রাখার জন্য আন্দোলনে নামার পর আজ থেকে খুলে দেয়া হয়েছে! মোটর রাইড-শেয়ারিং চালুর জন্য আন্দোলন করছে। সরকার দুদিন বন্ধ রেখে সিটিগুলোর অফিসযাত্রীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে গণপরিবহন চালানোর অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তৈরি পোশাক কারখানা খোলা, শিল্পকারখানা খোলা, অফিস-আদালত খোলা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার খোলা। জরুরি সেবা খোলা। উবারও যাত্রী পরিবহন করতে পারবে কেবল মোটর রাইড-শেয়ারিং ছাড়া। ফলে দৃশ্যত লকডাউন চললেও সবকিছুই যেন আন-লক্ড। তাই ২০২০ সালের লকডাউন না দিয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেও কার্যত সবকিছু ছিল লক্ড। আর ২০২১ সালে সরাসরি লকডাউন ঘোষণা করলেও প্রায় সবকিছু আনলক্ড। তাহলে সমস্যা কোন জায়গায়? সমস্যা হচ্ছে আমাদের মানসিকতা, ঔদাসিন্যতা এবং নিয়তি-বিশ্বাসী জীবনযাপনের প্রবণতা। সরকার হাজার চেষ্টা করলেও কোনো লকডাউন কার্যকর করতে পারবে না, যদি মানুষ নিজে লকডাউনকে গ্রহণ না করে এবং ব্যক্তি জীবনে সেটা প্রয়োগ না করে। কেননা, লকডাউন হচ্ছে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণ রোধের একটা পরীক্ষিত ব্যবস্থা মাত্র। এর মূল অর্থ হচ্ছে ভাইরাস বাহককে ‘লক’ করে ভাইরাসের সংক্রমণকে ‘ডাউন’ করা! অর্থাৎ করোনা ভাইরাস যেহেতু মানুষবাহিত ভাইরাস এবং মানুষই এর বাহক, সেহেতু এর দ্রুত বিস্তার ও সংক্রমণ রোধ করতে হলে ভাইরাসের বাহককে ‘লক’ করতে হবে। আর ভাইরাস বাহক লক্ড হয়ে গেলে, ভাইরাস ছড়াবে না। আর ভাইরাস না ছড়ালে সংক্রমণ কম হবে। আর সংক্রমণ কম হলে মৃত্যু কমে যাবে। এই হচ্ছে লকডাউনের শানে নুযুল। তাই এখন আমাদের সবার একটি নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের জীবনযাপনের ওপর একটি স্বেচ্ছা ‘লক’ আরোপ করা, যাতে সংক্রমণের পরিমাণ ‘ডাউন’ হয়। আর এ রকম স্বেচ্ছা-লকের ভেতর দিয়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গোটা সমাজের মানুষ ‘লক্ড’ হয়ে যাবে এবং সংক্রমণও ‘ডাউন’ হয়ে যাবে। তাই সরকারি নির্দেশনা দরকারি বটে, কিন্তু আমরা ব্যক্তি-মানুষ যদি সচেতন না হই এবং নিজেদের মতো করে নিজেরাই নিজেদের ‘লক’ না করি, তাহলে কোনোভাবেই করোনা ভাইরাসে বিস্তার ও সংক্রমণ ‘ডাউন’ করা যাবে না। আর, সেটা আমাদের কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না। কেননা ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে, সমষ্টিতগত কল্যাণ চিন্তার মধ্যেই সমাজের এবং সবার নিরাপত্তা নিহিত। তাই আজ আমাদের দর্শন হবে কবি কামিনী রায়ের কবিতার মতো ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়