রায় দ্রুত কার্যকর হোক

আগের সংবাদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অঙ্গীকার

পরের সংবাদ

রাজনীতির সিঙ্গাপুর মডেল নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার

বিভুরঞ্জন সরকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৭, ২০২১ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২১ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, একসময় সিঙ্গাপুরে মাত্র ১২০টি জেলে পরিবার বাস করত। অথচ এখন সিঙ্গাপুর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে। সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা পায় তখন সেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৫১১ মার্কিন ডলার। এখন মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ৬২ হাজার মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪.৫ শতাংশ। জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় সিঙ্গাপুরের অবস্থান এখন এশিয়ায় প্রথম এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ১১তম। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের মধ্যে সিঙ্গাপুরের অবস্থান এখন যথাক্রমে ১৫ এবং ১৪তম স্থানে। পরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে জীবনযাপনে এসেছে অভাবিত পরিবর্তন। মানুষের মনোজগৎও হয়েছে পরিবর্তিত। মানুষের গড় আয়ু ৮০.৬ বছর। শিক্ষিতের হার ৯৬ শতাংশ। ৯০.১ শতাংশ নাগরিক আবাসন সুবিধা পেয়েছেন। প্রতি ১ হাজার জনে ১০৭ জন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক। ভাবা যায়, আদিতে মাছ ধরা ছিল সেখানকার অধিবাসীদের একমাত্র পেশা!
সিঙ্গাপুরের এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের রূপকার ও কাণ্ডারি হলেন লি কুয়ান ইউ। ১৯২৩ সালে সিঙ্গাপুরে জন্ম নেয়া লি কুয়ান যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ থেকে আইন শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। লি কুয়ান অল্প বয়সেই রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) লি ছিলেন সহপ্রতিষ্ঠাতা। ৪০ বছর তিনি এই দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় আছে পিএপি। লি কুয়ান প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ৩১ বছর। ১৯৯০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। ততদিনে তিনি সিঙ্গাপুরকে বিস্ময়করভাবে বদলে দিয়েছেন। অপরাধ ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি বন্দর শহরকে এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা খুব সহজ কাজ ছিল না।
১৯৫৯ সালে স্বায়ত্তশাসন লাভ করার পর ১৯৬৩ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল সিঙ্গাপুর। কিন্তু আদর্শগত কারণে সেই মিলন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৬৫ সালে সম্পূর্ণ স্বাধীন হয় দেশটি। মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দেয়ার সময় ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে লি কুয়ান বলেছিলেন, ‘এটি আমার জন্য খুবই যন্ত্রণার মুহূর্ত, কারণ আমার সারাজীবন আমি এ দুই ভূখণ্ডের একত্রীকরণ ও ঐক্যে বিশ্বাস করে এসেছি। আপনারা জানেন আমাদের জনগণ, যারা ভূগোল, অর্থনীতি এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। তবে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। অনেক কিছুই আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকবে। আমরা সিঙ্গাপুরে বহু জাতিসত্তার সমন্বয়ে একটি জাতি পেতে যাচ্ছি, যেখানে সবাই সমভাবে নিজের ঠিকানা পাবে, যা অবশ্যই ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মের ভিত্তিতে নয়।’
মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দেয় তখন লি কুয়ানের কাছে মনে হয়েছিল এ তো শরীর ছাড়া হৃৎপিণ্ডÑ ইট বিকাম এ হার্ট উইদাউট বডি।
অথচ সেই সিঙ্গাপুর এখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের সাফল্যের পেছনে একটি বড় কারণ সম্ভবত এই যে, সেখানে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার একেবারেই নেই। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ঐক্য বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন লি কুয়ান। সব ধরনের অপরাধ ও দুর্নীতি বন্ধে নেয়া হয়েছিল শক্ত অবস্থান। নিষিদ্ধ করা হয়েছিল চুইংগাম, দেয়াল লিখন, পর্নোগ্রাফি। সিঙ্গাপুরকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রাষ্ট্রে পরিণত করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম একটি বাসযোগ্য শহরে পরিণত করার একক কৃতিত্ব লি কুয়ানের। তিনি আধুনিক সিঙ্গাপুরের ‘জনক’ বা ‘স্থপতি’।
আমরা অনেকেই এখন সিঙ্গাপুর যাই। কিন্তু আমাদের চেয়ে সবদিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা এত ছোট এবং স্বল্প জনসংখ্যার একটি দেশ কীভাবে, কোন কৌশলে, কোন রাজনীতি অনুসরণ করে এত সাফল্য পেল তা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো প্রশ্ন বা আত্মজিজ্ঞাসা আছে বলে মনে হয় না। আমরা গণতন্ত্র নিয়ে, ভোট নিয়ে, গদি দখল নিয়ে যত সোচ্চার ও বিচলিত, মানুষকে মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ নিশ্চিত করার ব্যাপারে ততটাই নীরব এবং নিষ্ক্রিয়।
বাংলাদেশের অনেক মানুষ সিঙ্গাপুরে আছেন। এর মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যাই বেশি। যেসব বাঙালি সিঙ্গাপুরে আছেন তারা সেখানকার সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে খুব বেশি উৎসাহ আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে তেমনটা আমার মনে হয়নি। ১০ বছর ধরে সিঙ্গাপুর আছেন এমন একজন বাংলাদেশির কাছে সে দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নাম জানতে চেয়েছি। মনে করতে পারেননি।
সিঙ্গাপুর যে একটি ছোট্ট নগররাষ্ট্র তা আমাদের জানা আছে। বর্তমানে জনসংখ্যা ৫৫-৬০ লাখের মতো। ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট মালয় ফেডারেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তখন এটি ছিল একটি জেলেপল্লী মাত্র। এই জেলে পল্লীসম দ্বীপ রাষ্ট্রটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। তিনি তখন ছিলেন ২০ লাখ মানুষের নেতা। মূলত লি কুয়ানই হচ্ছেন আধুনিক, উন্নত, সমৃদ্ধ সিঙ্গাপুরের স্রষ্টা। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই প্রথমে উন্নতশীল এবং বর্তমানে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে চলে আসে। লি কুয়ান ন্যায়সঙ্গত শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে পুঁজিবাদী ধাঁচে সিঙ্গাপুরকে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তিনি একজন শক্তিধর রাষ্ট্রনায়ক তথা সফল সরকার পরিচালক হিসেবে দুনিয়াজুড়েই পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।
লি কুয়ান মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে স্বায়ত্তশাসিত সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীন সিঙ্গাপুরের যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন তার বয়স ৪২ বছর। তার সহকর্মীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সি।
লি কুয়ান পরবর্তী সময়ে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন : আমি তাদের সবার চেয়ে বয়সে কনিষ্ঠ ছিলাম। তারপরও তারা কখনো আমার কোনো কাজে বাধা দেননি। নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়েও দেননি। এমনকি আমি যখন কোনো ভুল করেছি, তখনো তারা আমার বিরোধিতা করেননি। তারা সব সময় আমাকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে অবস্থান করতে সহায়তা করেছেন এবং আমার ভেতরে যেন ‘মুই কি হনু রে’ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আত্মম্ভরিতার প্রকাশ না ঘটে সে বিষয়ে সচেতন থেকেছেন। অর্থাৎ লি কুয়ানের সাফল্যের পেছনে একটি বড় কারণ তিনি একদল বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সহকর্মী পেয়েছিলেন। তাদের সমর্থন-সহযোগিতা তার পথচলায় শক্তি জুুগিয়েছিল।
শুধু কি তাই? লি কুয়ান সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বুঝেছিলেন, দেশের উন্নয়ন করতে হলে রাজনৈতিক স্থিরতা একটি জরুরি বিষয়। তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যে কোনো ধরনের কঠোরতা দেখাতে পিছপা হননি।
উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন তিনি। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ঐক্য বজায় রাখতে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো দ্বিধা করেননি।
ইউরোপ-আমেরিকার মতো সিঙ্গাপুরে এত মানবাধিকার, গণতন্ত্র ইত্যাদির চর্চা নেই। সেখানে গণতন্ত্রের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করতে দেয়া হয় না কাউকে। বিশৃঙ্খলা কঠোর হাতে দমন করা হয়। সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক দল আছে অনেক। কিন্তু শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একটি দলই শাসনক্ষমতায় আছে। ভোটে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতাসীন দল সরকার গঠন করে। বিরোধী দলের জনসমর্থন একেবারেই কম। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার জন্য প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। পুরো নগররাষ্ট্রটি কঠোর নিয়ম-নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত।
আইনের কড়াকড়ি সিঙ্গাপুরে প্রবল। আইন না মানা বা অমান্য করার সুযোগ কারো নেই। আইনের প্রশ্নে কারো কোনো ছাড় নেই। এখনো বেত্রাঘাত, মৃত্যুদণ্ডসহ কঠিন শাস্তি বহাল আছে। নিজেদের ভালোমন্দের ব্যাপারে সিঙ্গাপুর পরদেশের পরামর্শ শোনে না, গ্রাহ্য করে না।
উন্নয়নের জন্য লি কুয়ান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েও ‘মানবাধিকার’ প্রশ্নে সমালোচিত হলেও শক্ত হাতে দেশ শাসনের নীতি থেকে তিনি পিছু হটেননি। বিরোধীদের ব্যাপারে তার উদারতা, সহনশীলতা ছিল কম। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণবিক্ষোভ, মিছিল-সমাবেশ ইত্যাদি নিয়ে কাউকে খুব উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। সিঙ্গাপুরের মানুষ কেন সরকারবিরোধী নয়, এক দলই কেন বারবার ক্ষমতায় থাকছে, মানুষ কেন পরিবর্তন-প্রত্যাশী নয়Ñ এ বিষয়গুলো নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা হওয়া উচিত। কম গণতন্ত্র কীভাবে মানুষের স্বস্তির কারণ হয় সেটা নিশ্চয়ই কৌতূহলের বিষয়।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়