প্রয়োজন জনগণের দায়িত্বশীল আচরণ

আগের সংবাদ

হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা

পরের সংবাদ

রমজানের আগেই অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার

হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

এস এম নাজের হোসাইন

ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২১ , ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৫, ২০২১ , ১০:৩২ অপরাহ্ণ

আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন দিয়েছে। একদিকে মানুষের আয় কমেছে, করোনায় সুরক্ষা সামগ্রীসহ জীবন-জীবিকা নির্বাহে ব্যয় বৃদ্ধি নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বৈশ্বিক মহামারি কম-বেশি সব পেশার মানুষকেই অস্থির করে তুলেছে। এ অবস্থায় সবার প্রত্যাশা ছিল এবার অন্তত বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে লাগামহীন হয়ে পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজার। পেঁয়াজ, চাল, আলু, সবজি, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, মসলা এভাবে চক্রাকারে একেকবার একেকটি পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। করোনার এই মহামারি সংকটে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর।
করোনাকালের শুরুতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাকরি হারিয়ে স্বল্প আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ছেড়েছে। অনেক বাড়ির মালিকই নতুন ভাড়াটে পাননি। গত বছরের শেষ দিকে করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নতুন বছরে বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর পথে হাঁটেননি অধিকাংশ বাড়ির মালিক। সরকারও নতুন করে গ্যাস, বিদু্যুৎ ও পানির মূল্য বৃদ্ধি করেনি। অতি সম্প্রতি নতুন করে আবার করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্যপণ্যের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় পবিত্র রমজান মাস ঘিরে আবারো নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় আছে সাধারণ মানুষ। দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধিকে খাড়া করলেও প্রতি বছর রমজান এলেই ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে দাম বৃদ্ধি করে থাকেন। তাই এখন সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাবে কে? ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম মাঝে মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এসব পণ্যে আমদানি নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা দ্রুত প্রভাব ফেলে স্থানীয় বাজারে। তবে কোনো কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পেলে বা দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে বা বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়।
প্রতি বছরই আমরা লক্ষ করি রমজান শুরু না হতে বেড়েই চলেছে রমজানে ব্যবহার্য সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম। ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই দাম নির্ধারণ করে দিতে হয়েছে। যদিও সরকারি নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল পাওয়া দুষ্কর। ভোজ্যতেল ছাড়াও ডাল, সাদা মোটর ও রমজানের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছোলার বাজার বাড়তি। এর একটি বড় কারণ থাকে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) স্লিপ নিয়ে বাণিজ্য। সারাদেশে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীর আবির্ভাব গড়ে, যারা রমজানের আগে মিল থেকে ডেলিভারি অর্ডার নিয়ে পণ্য সংগ্রহ করে না। অন্য ব্যবসায়ীর কাছে বাড়তি দামে পুনরায় স্লিপ বিক্রি করে দেন। এভাবে হাতবদলে পণ্যের দামও বেড়ে যায়। অথচ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ, ২০১১তে ডিও প্রথা বাতিল করে এসও (সাপ্লাই অর্ডার) চালু করা হয়েছে। যেখানে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্যের ডেলিভারি নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এখনো সেই স্লিপ বাণিজ্য বন্ধ হয়নি। ডিও স্লিপ হাতবদল ও ক্রেতারা সরবরাহ নিতে সময়ক্ষেপণ করছে কিনা তা মনিটরিং করা দরকার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে যেসব পণ্যের দাম বাড়তি, সেগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুল্ক ও কর কমানো গেলে কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা হ্রাস পাবে, যেমন সয়াবিন তেল ও চিনি। সয়াবিন তেল আমদানিতে বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৪ শতাংশ অগ্রিম কর, উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বিক্রয় পর্যায়ে ৫ শতাংশ ট্রেড ভ্যাট আরোপ করা আছে। আগে কেবল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট থাকলেও ২০১৯-২০ অর্থবছর উৎপাদন ও বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়। অন্যদিকে চিনি আমদানিতে প্রতি টনে ৩ হাজার টাকা আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ ও অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ দিতে হয়। বিক্রয় পর্যায়ে ৫ শতাংশ ট্রেড ভ্যাট আরোপ করা আছে। এ খাতে ব্যবসায়ীদের মতে আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রয় পর্যায়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে বর্তমানে ২৫-২৬ টাকা শুল্ক ও কর দিতে হয়। সরকার যদি কর কমায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কিছুটা কম দামে পণ্য দুটি কিনতে পারবে। কিন্তু সরকার চালের শুল্ক কমানোর পরও চালের মূল্য কমেনি। সেক্ষেত্রে চিনি ও ভোজ্যতেলেও কর কমানো হলে দাম কমবে কিনা সন্দেহ থেকেই যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই আশ্বস্ত করা হচ্ছে, তারা বাজার তদারকি অব্যাহত রেখেছেন। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তাহলে বাজার তদারকির সুফল ভোক্তারা পাচ্ছে না কেন? করোনাকালে দেশব্যাপী নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতির পাগলা ঘোড়া কোনোভাবেই বশ মানছে না। পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানতে সরকারের নানা উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হলেও কার্যত তা কোনো কাজেই আসছে না। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রায় আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেহেতু সেই চাপ যাতে আর না বাড়ে সেজন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও অস্থিরতারোধে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে সংকটকালে সরকারের জরুরি পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল। বিশেষ করে খাদ্য বিভাগের আওতায় ওএমএস, টিসিবির মাধ্যমে চাল ও ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রি চালু রেখে বিকল্প বাজার তৈরি দরকার ছিল। বাজার তদারকিতে জেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চেম্বার, ক্যাব প্রতিনিধি, গণমাধ্যমসহ সরকারের অন্যান্য প্রশাসনিক অঙ্গগুলোকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এছাড়া বিদেশ থেকে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য কী পরিমাণ ও কারা আমদানি করছেন তাদের বিতরণ ব্যবস্থাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ভোক্তাদের শিক্ষা ও সচেতনতায় আরো বেশি জোর দিতে হবে। ভোক্তারা সচেতন হলেই ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট ও ব্যবসায়ীদের কূটকৌশল বুঝতে সক্ষম হবে। সংকটকালে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পণ্য সরবরাহ ও বিপণন তদারকি কমিটিগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করার জন্য সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কার্যসূচিতে নিত্যপণ্যের বাজার তদারকিকে অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে যুক্ত করা গেলে কিছুটা সুফল মিলতে পারে।
এস এম নাজের হোসাইন : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়