হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা

আগের সংবাদ

নৌপথ সুরক্ষিত হবে কখন?

পরের সংবাদ

ভয়ানক করোনা সংক্রমণ এবং হেফাজতের উগ্রতা ও নৈতিক সংকট

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২১ , ১২:১০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৫, ২০২১ , ১০:৩৪ অপরাহ্ণ

গত প্রায় এক বছর ধরে করোনা সংক্রমণে সারা পৃথিবী ভয়ানক এক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে করোনা সংক্রমণ নিম্নগামী হওয়ার পর দেশে রাজনীতি, সামাজিক অনুষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত, দেশে-বিদেশে যাতায়াত ব্যাপক হারে বেড়ে যেতে থাকে। ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ থেকে করোনা টিকা দেয়া শুরু হলে কেউ কেউ টিকা সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচার করতে থাকে, কেউ কেউ টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করতে থাকে। আবার অনেকে মনে করেন যে টিকার কোনো প্রয়োজনই নেই, আমরা এমনিতেই ভালো হয়ে যাচ্ছি। আবার যারা টিকা নিচ্ছেন তারাও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনাগুলো উপেক্ষা করতে থাকেন। জাতীয়ভাবেই এক ধরনের আত্মতৃপ্তিবোধ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শীতপ্রধান অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়াতে থাকে। ইউকে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দুটি ধরন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার খবর সবাই জানতেন। তারপরও ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশে অনেকেই করোনা সংক্রমিত হয়ে দেশে বেড়াতে আসেন। তাদের মাধ্যমে ইউকে ধরনটি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বলে অনেকেই মনে করেন। তাছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই বাংলাদেশের নাগরিকরা কর্মসূত্রে অবস্থান করছেন। তাদেরও অনেকেই জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে বেড়াতে বা ছুটিতে আসেন। তাদের মাধ্যমেও দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রিটেনের করোনার ধরনটি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। তাছাড়া করোনার রূপান্তর ঘটার প্রবণতাটি সবারই জানা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে চায়নি। এসব কারণে বাংলাদেশে মার্চ মাসের প্রথম দিক থেকে করোনা সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি ধীরে ধীরে পরিলক্ষিত হতে থাকে। তখনই আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে, আমাদের এখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ধেয়ে আসার লক্ষণ অনুভূত হচ্ছিল। কিন্তু কোনো মহল থেকেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি প্রবণতা লক্ষ করেও গণজমায়েত, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়েশাদি, কক্সবাজার, সিলেট, কুয়াকাটাসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সপরিবারে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করতে চায়নি। ধরেই নিয়েছিল যে, দেশে করোনা সংক্রমণ গেল বছরের মতো আর বাড়বে না। কিন্তু মার্চ মাসের মাঝামাঝির পর থেকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাটি দ্রুত বাড়তে থাকে। ২৭, ২৮ তারিখে এটি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। দৈনিক সংক্রমণের হার আগের সর্বোচ্চ সীমাকেও অতিক্রম করে, মৃত্যুর সংখ্যাও দৈনিক ৫০-এর উপরে উঠে যেতে থাকে। এর ফলে বিশেষজ্ঞ মহল এবং সরকার নতুন ধরনের করোনা সংক্রমণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পথে হাঁটে। তার ফলেই এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে লকডাউনের ধারণাটি অতীতেও যেমন শহরে বসবাসকারীদের একটি বড় অংশ সাধারণ ছুটি হিসেবে দেখেছে এবারো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মজীবী মানুষদের বড় অংশই নানা আশঙ্কা থেকে গ্রাম অভিমুখে ছুট দেয়। এর ফলে করোনা সংক্রমণ সবার থেকে গ্রামে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সবাই আশঙ্কা করছে। কারণ এবারের করোনার ধরনটি অনেক বেশি তীব্র গতিসম্পন্ন। ফলে এটি দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হবেই। এতে কোনো সন্দেহ নেই। গত বছর যখন লকডাউনে অনেকেই শহর থেকে গ্রামে ছুটে গিয়েছিল তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল গ্রামগুলোতে করোনা সংক্রমিত হতে পারে। কিন্তু সেটি ততটা হয়নি। কারণ গতবারের করোনার ধরনটি ছিল অপেক্ষাকৃত কম তীব্র। এবারের ধরনটি একেবারেই ভিন্ন। ফলে এবার যারা গ্রামে থাকছেন তারা নিজেরা যদি করোনায় সংক্রমিত হয়ে থাকেন তাহলে তাদের থেকে তাদের পরিবারের সদস্য এবং পরিবার থেকে প্রতিবেশীরা সংক্রমিত হতে পারেন। সেটি ঘটলে বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাত হবে সত্যিই মারাত্মক। সুতরাং করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্বে বাংলাদেশে যে লকডাউন অপরিহার্য বলে মনে করা হয়েছে তা আদৌ সুফল দেবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে লকডাউন দেয়ার অপরিহার্যতা যেমন ছিল আবার দেয়ার ফলে মানুষের এভাবে গ্রামে ছুটে যাওয়ার ফলে সংক্রমণ রোধের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে উভয় সংকট আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে। এই মুহূর্তে ঢাকাসহ শহরগুলোর হাসপাতালে করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেছে। ঢাকায় বেশিরভাগ হাসপাতালে শয্যা নেই, প্রয়োজনীয় আইসিইউ আর অবশিষ্ট নেই। ফলে অক্সিজেন ও আইসিইউর হাহাকার অনেকটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি আরো বাড়তে থাকলে কোনোভাবেই চিকিৎসাসেবা দেয়া ডাক্তারদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এর ওপর যদি গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তাহলে চিকিৎসার বিষয়টি একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে লকডাউন দেয়ার সুফল পাওয়ার চেয়ে আমরা এর কুফলই বেশি ছড়িয়ে দিয়েছি কিনা সেটি দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
আসলে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্বটি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞমহল বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও আমরা সাধারণ মানুষরা স্বাস্থ্যবিধির কিছুই তোয়াক্কা করিনি। এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। এটি অবশ্য গেল সেপ্টেম্বর, অক্টোবরেও লক্ষ করা গিয়েছিল। তখন হেফাজতসহ ইসলাম নামদারী বেশকিছু সংগঠন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও ম্যুরাল নিয়ে নানা ধরনের উত্তেজনাকর বক্তব্য বিভিন্ন ধর্মীয় ওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রদান করা হচ্ছিল। বুঝাই যাচ্ছিল ২০২০ সালকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছর পালনের সরকারি উদ্যোগকে আওয়ামীবিরোধী সব শক্তি সহজে মেনে নিতে চাচ্ছিল না। তারা কৌশলগতভাবে হেফাজতসহ ধর্মীয় নামদারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে মানুষকে ধর্মীয়ভাবে উত্তেজিত করার লক্ষ্যে কাজ করতে থাকে। একই সঙ্গে বিএনপিসহ কিছু কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি ডিসেম্বর মাসে সরকার পতনের আন্দোলন সংঘটিত করার হুঙ্কার ছুড়ে। সেভাবে যুগপৎভাবে নভেম্বর, ডিসেম্বর মাসে দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হলেও সাধারণ জনগণের মধ্যে বিষয়টি তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ জনগণ অনেকটাই তখন করোনার অভিঘাতে অর্থনৈতিকভাবে নানা সংকটের আশঙ্কা করছিল। বৃহত্তর জনগণ দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা হানাহানি ইত্যাদির সঙ্গে খুব একটা যুক্ত হতে এখন আর মনোযোগী নয়। কেননা বিশ্বব্যাপী করোনার এই সংকটকালেও বাংলাদেশে মানুষ তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতার নানা সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছিল। ফলে রাজনীতির মাঠে হেফাজত, বিএনপিসহ আওয়ামীবিরোধী শক্তি যতই হুঙ্কার ছুটছিল তাতে তেমন কেউ কর্ণপাত করতে দেখা যায়নি। ২০২১ সাল শুরুর পর করোনা সংক্রমণ কমে আসার প্রবণতা দেখে মানুষ যার যার জীবন ও জীবিকা নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছিল। এছাড়া দীর্ঘদিন ঘরবন্দি কিংবা সীমিত পরিসরে বসবাসের কারণে অনেকেই বিভিন্ন দিকে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। এই অবস্থায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মার্চ মাসে সরকারের যেসব কর্মসূচি ছিল সেগুলোর বিপরীতে মার্চ মাসের শুরু থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র এবং আওয়ামী লীগের অতীত, বর্তমান ইত্যাদি প্রসঙ্গে কর্মসূচিগুলোতে বক্তব্য প্রদান করে। এর মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে তারা মøান করার বিকল্প কর্মসূচি পালন করে। অন্যদিকে সরকার ৫টি প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে ঢাকায় ১৭ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত করার মাধ্যমে ৫০ বছর পূর্তির ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছর উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই আয়োজনটি স্বাধীনতার ৫০ বছরকে মহিমান্বিত করছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমণের বিরোধিতা করে আসছিল। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে হেফাজতসহ বিভিন্ন সংগঠন মোদির আগমনের বিরোধিতা করে কর্মসূচি প্রদান করে। সেদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশে হেফাজতসহ বিরোধীদের মিছিল এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ছুড়ার ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে দেশব্যাপী অপপ্রচার ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মূলত ২৬ তারিখ থেকে দেশে একটি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা লক্ষ করা যায়। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হেফাজতের মিছিল থানা এবং ভূমি অফিসে আক্রমণ সংঘটিত করে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেলস্টেশনসহ কয়েকটি জায়গায় ব্যাপক ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করা হয়। তাতেও কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। এ নিয়ে হেফাজত ২৮ তারিখ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। সরকারবিরোধী সব সংগঠনই হরতালের প্রতি নৈতিক সমর্থন প্রদান করে। এর ফলে ২৮ তারিখ চট্টগ্রাম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপকভাবে হেফাজতের নেতাকর্মীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তবে অভিযোগ আছে যে, হেফাজতের ব্যানারে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের মধ্যে জামায়াত, বিএনপির নেতাকর্মীরাও অংশগ্রহণ করেছিল। ঢাকায় সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত রাস্তা অবরোধ করে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এতে কয়েকজন সাংবাদিককেও নিগ্রহ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় ৫০টির মতো স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, স্থাপনা লণ্ডভণ্ড করা হয়। দেশের আরো কয়েকটি জায়গায় হেফাজতের হরতালে উগ্র সহিংস আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। স্বাধীনতার মাসে দেশের যেসব ঘটনা ঘটছিল তা মোটেও কাক্সিক্ষত ছিল না। বিশেষত স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছর পালনের বিষয়ে হেফাজত, বিএনপি এবং আরো বেশকিছু সংগঠন পরোক্ষভাবে বিরোধিতা করে আসছিল। এমনকি বাম নামদারী কিছু কিছু ছাত্রও মূল সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের মধ্যেও উগ্রতা পরিলক্ষিত হয়। তারাও ২৬ এবং ২৮ মার্চ তারিখে পুলিশের গুলিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের প্রতি সমর্থন জানালেও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় যেসব ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়েছিল সেসবের কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নয়াগাঁও গ্রামে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বক্তব্যে বিরোধিতা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে হেফাজতের নেতাকর্মীরা আক্রমণ চালিয়েছিল। তাতেও প্রায় ৮৫টি পরিবার হেফাজতের হামলার স্বীকার হয়। এসব ঘটনা দেশকে মনে হয় বাংলাদেশে এই মুহূর্তে করোনা সংকটের যে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে তাকে উপেক্ষা করেই বিরোধী মহল একটি চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চলছে। এদিকে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে সরকার যখন লকডাউন ঘোষণা করে তখন দেশে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে করোনার আতঙ্ক এবং নিজেদের জীবন-জীবিকা নিয়ে একটি দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। সেই মুহূর্তে ৩ এপ্রিল হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব নারায়ণগঞ্জে একটি রিসোর্টে নারী কেলেঙ্কারিতে এলাকাবাসী দ্বারা আটক হন। বিষয়টি যখন আইনিভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছিল তখন হেফাজতের নেতাকর্মীরা সেই রিসোর্টে আক্রমণ ও তাণ্ডব চালিয়ে মামুনুল হককে ছিনিয়ে নেয়। তারা নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ ও ভাঙচুর করে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে বেশ কিছুক্ষণ হেফাজতের নেতাকর্মীদের দখল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। মামুনুল হকের বিষয়টি গণমাধ্যমে লাইভ প্রচারিত হচ্ছিল। তাতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল তিনি একজন ভিন্ন নারীকে নিয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন, সেই নারীকে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করছিলেন। তার কথার মধ্যেই অনেক অসংলগ্নতা ছিল। তারপরও হেফাজতের নেতাকর্মীরা তার পক্ষ অবলম্বন করে আক্রমণ সংঘটিত করেছিল সেটি নজিরবিহীন। শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয় দেশে আরো কয়েকটি জায়গায় রাতে মামুনুল হকের পক্ষে হেফাজতের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে পড়ে। এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আক্রমণ পরিচালনা করে। মামুনুল হকের নারী কাণ্ডটি তার স্ত্রীর সঙ্গে এবং ওই নারীর সঙ্গে ফোনালাপও প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এছাড়া তার বোনসহ আরো কয়েকজনের ফোনলাপে ঘটনাটি ধাপাচাপা দেয়ার অনৈতিক উপদেশ প্রদানের কথাও শোনা যাচ্ছিল। বস্তুত মামুনুল হক গত বছর সেপ্টেম্বর মাস থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা এবং পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি অস্থিরতা সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। সেই মামুনুল হক ৩ এপ্রিল তারিখে অন্য নারীর সঙ্গে অবকাশ কাটানোর ঘটনাটি ধরা পরার পর হেফাজতের নেতাকর্মীদের ধর্মীয় আদর্শবাদিতার গোমর অনেকটাই দেশবাসীর কাছে ধরা পড়ে যায়। এরপরও হেফাজতের নেতাকর্মীরা মামুনুল হকের অনৈতিক অবস্থানকে চাপা দেয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে থাকে। ৪ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনেও সেই চেষ্টার প্রমাণ পাওয়া যায়। বস্তুত বাংলাদেশে করোনার এমন একটি সংকটকালীনে হেফাজত এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি যেভাবে উগ্রতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে তাতে বাংলাদেশে শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাই নয়, ধর্মের পবিত্রতাও নষ্ট করা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো আমাদের সমাজের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অপশক্তির উত্থান, প্রসার এবং তাদের কর্মকাণ্ডের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তা মোটেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে নিরাপদ করার সামান্যতম পথ খোলা রাখছে না। সুতরাং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর কাজ হচ্ছে এসব উগ্র, হঠকারী অপশক্তির চরিত্র উন্মোচন এবং নিজেদের অবস্থানকে সংহত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা।
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়