যুক্তরাষ্ট্রে একই পরিবারের ৬ বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার

আগের সংবাদ

২০৩৬ সাল পর্যন্ত পুতিনের ক্ষমতা পাকাপোক্ত

পরের সংবাদ

পোশাক খাতে সংকট বাড়ছে

প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২১ , ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৬, ২০২১ , ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ

দাম কমে যাওয়ায় লোকসান বেড়েছে ৪৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রথম ঢেউ কাটিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এবার দেশে রেকর্ড মাত্রায় করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় আবারো শঙ্কা বাড়ছে তৈরি পোশাক শিল্পে। ইতোমধ্যে বিশে^র বিভিন্ন দেশে নতুন লকডাউনে ফের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, এখনো বড় মাত্রায় পোশাক ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়নি। তবে যে কোনো সময় পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কায় আছেন তারা।

জানা গেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৩ শতাংশ কমে যায়। দেশে দেশে করোনার লকডাউনের কারণে মানুষ পোশাক কেনা কমিয়ে দেয়। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে জমে পোশাকের স্তূপ। এতে অনেক ব্র্যান্ড কারখানাগুলো আগের কার্যাদেশ বাতিল করে, অনেকে দামও কমিয়ে দেয়।

করোনায় পোশাক খাতের ক্ষতির হিসাব কষে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, গত বছর করোনা শুরুর পর মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৩ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার স্থগিত হয়। পরবর্তীতে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত হওয়া অর্ডারের শতকরা ৯০ ভাগ ফিরে আসে। ৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার শেষ পর্যন্ত আর ফিরে আসেনি। গত বছরের অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং এই বছরের জানুয়ারি মাসে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কম ছিল। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসে শতকরা পাঁচ থেকে ১০ ভাগ রপ্তানি কমেছে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এখনো অর্ডার তেমন স্থগিত হয়নি। তবে অর্ডার ও পোশাকের দাম কমেছে। গত অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে গড়ে দাম কমেছে শতকরা পাঁচ ভাগ। যদিও পোশাক রপ্তানি করে লাভ হয় গড়ে শতকরা দুই-তিন ভাগ। ফলে লাভ-লোকসান বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।

বর্তমানে বিশ্বের বেশ কিছু দেশে ফের লকডাউন দেয়ায় সেখানকার খুচরা ক্রেতারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তাই আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও সতর্ক। তারা যেখানে একসঙ্গে এক লাখ পিস অর্ডার করত এখ তারা পাঁচবারে অর্ডার করছে। এখানে কারখানাগুলো সাধারণত তিন মাস আগে অর্ডার পেত। কিন্তু এখন সেই লিড টাইম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোকে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট আরশাদ জামাল দিপু বলেন, ইউরোপে পোশাকের স্তূপ জমে গেছে। গত শীতে করোনার সময় তারা যে পোশাক নিয়েছে সেই পোশাক এখন বিক্রি করছে। ফলে এই বছরে বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়া ২০ ভাগ কমবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।
তিনি বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে তারা যেটা দোকানে বিক্রি করবে তার অর্ডার দেবে এ বছরের জুন মাসে। গত বছরের আগস্টে ২ দশমিক ৫৮ ভাগ রপ্তানি বেড়েছিল, সেপ্টেম্বরে ৩ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ বেড়েছিল।

কিন্তু অক্টোবরে ও নভেম্বরে ৭ ভাগ এবং ডিসেম্বরে ৯ ভাগ রপ্তানি কমেছে। কারণ তারা এখন আগের জমে থাকা পোশাক ডিসকাউন্টে বিক্রি করছে।
এ বিষয়ে ফতুল্লা অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, দ্বিতীয় ধাক্কায় আমরা অনেক বেশি ইফেক্টেড হয়েছি। আমাদের অর্ডার কমে গেছে। করোনার প্রথম ধাক্কায় কিছু অর্ডার হোল্ড হয়েছিল, কিন্তু পরে ক্রেতারা সেগুলো পুনরায় দেয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো সেপ্টেম্বরের শেষ থেকেই লোকসানে চলছে।

এক গবেষণায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পোশাক শতকরা ২৩ ভাগ কম নিয়েছে আমদানিকারকরা। এই সময়ে শ্রমিকদের আয় কমেছে ৮ শতাংশ, আর তাদের ওপর চাপ বেড়েছে ৬০ শতাংশ। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনায় প্রথম ওয়েভে পোশাক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠে। কিন্তু এবার যে হারে করোনা বিস্তার করছে তাতে ক্ষতির আশঙ্কা অনুমান করা যাচ্ছে না।

তিনি জানান, গত বছরের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে শ্রমিকদের বেকারত্বসহ পোশাক খাতের সার্বিক অবস্থা জানতে জরিপ শুরু করেন। দেশের প্রায় ৭ শতাধিক কারখানার ওপর সাত মাস ধরে জরিপ শেষ হয় অক্টোবরে। এ সাত মাসে ৭ শতাংশ বা ২৩২টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এছাড়া লে অফ ঘোষিত হয়েছে ২ দশমিক ২ কারখানায়। ৩০ শতাংশ বন্ধ হওয়া কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে পারেনি।

তবে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ নিয়ে গত বছরের এপ্রিল-জুনে ৩৫ লাখ পোশাককর্মীকে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বেতন দেয়া হয়। শর্ত ছিল, এই ঋণ ১৮ মাসে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে নতুন করে পোশাক শিল্পের টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পোশাক শিল্পের মালিকরা প্রণোদনার খাতের এই বিশেষ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে ৫ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ৬ মাস থেকে বাড়িয়ে ১২ মাস করার প্রস্তাব দিয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সব মিলিয়ে রপ্তানি কমেছে ৫৭৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৪৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পোশাক রপ্তানি কমে গেছে ৫৬০ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলারের, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরি পোশাক খাতের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ১০৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় এসেছিল ২ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়