করোনা ও মাস্ক ব্যবহার

আগের সংবাদ

এ কে খানের স্বপ্ন ও সাধনা

পরের সংবাদ

মোদির সফর ঘিরে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২১ , ১২:১২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৪, ২০২১ , ১১:৩০ অপরাহ্ণ

২৬ এবং ২৭ মার্চ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কালো রঙের সুতির হাতকাটা জ্যাকেট। সামনে ছ’টা বোতাম, দুপাশে দুটি পকেট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চিরপরিচিত সেই জ্যাকেটটিই পরে এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ভারতের উপহার ১২ লাখ কোভিড ভ্যাকসিন এবং ১০৯টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স। এর আগেও বাংলাদেশ লাভ করেছিল ভারতের উপহার ২০ লাখ কোভিড ভ্যাকসিন। বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথমেই তিনি যান সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। শ্রদ্ধা জানান শহীদদের উদ্দেশে। বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভারতীয়রা অভ্যর্থনা জানান মোদিকে। সফরের দ্বিতীয় দিনে নির্ধারিত ছিল দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক। তার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দুটি মন্দির সফর করেন। সাতক্ষীরার যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরে পূজা দেন। তিনি গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের আশ্রমেও যান এবং পূজা দেন। দুই মন্দির দর্শন করার পর মোদি টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা জানান। দুপুরে ঢাকা ফিরে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেন।
ছয় বছর আগে মোদির আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল ঢাকাতে। সে সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থলসীমানার চুক্তি হয়। এবারের সফরে নতুন কোনো মাইলফলক বা বাঁক বদলের কর্মসূচি ছিল না। দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন এবং তিস্তার পানি বণ্টন। বৈঠকে ঠিক কতটা আলোচনা হয়েছে এবং ভারত এ দুটি বিষয়ে বাংলাদেশকে কতটুকু আশার বাণী শুনিয়েছে, তার বিষদ কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গা নিয়ে ভারতের কাছ থেকে কখনো কোনো বড়সড় আশার কথা কিংবা বাংলাদেশকে সাহায্য করার কথা শোনা যায়নি। বাংলাদেশের দাবির মুখে তারা বরাবরই চুপ থেকেছে। তিস্তা নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলেছে ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ। ছয় বছর আগেও তিস্তা ছিল আলোচনার টার্নিং পয়েন্ট। তারও আগে কংগ্রেস আমলে ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে হতে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে এ সমস্যা দুই বন্ধু দেশের মধ্যে। তিস্তা নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে ভারত। এ ব্যাপারে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বারবার এমন কথাই শুনিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই নাকি তারা চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে পারছে না। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারত যেন ইতোমধ্যে দুটি ভিন্ন দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতার কারণে ভারত যেন কিছুই করতে পারে না। কেমন যেন হাসি পায় এমনটা শুনে!
এবার মোদির সফরের আলোচনার বিষয় ছিল মূলত দুটি। তিনি বাংলাদেশে এসে মতুয়াদের তীর্থস্থানে গিয়েছেন। তার সফরের বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমেছে হেফাজত সদস্যরা; পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন হেফাজত সদস্য। এর বাইরে আরো বেশ কয়েকজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। পুলিশের বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছেÑ হেফাজত সদস্যরা থানা আক্রমণ করেছেন, ভূমি অফিসে ভাঙচুর করেছেন, গাড়িতে আগুন দিয়েছেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে দিয়েছেন। মোদি ফিরে যাওয়ার পরও হেফাজতের বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। হেফাজতের সঙ্গে আরো কিছু ইসলামি দলও এবার মোদি বিরোধিতায় নামে। দ্বিতীয় আলোচনার বিষয়টি ‘মতুয়া’। মতুয়া সম্প্রদায় বাংলাদেশে হিন্দু নিম্নবর্ণের মানুষের সামাজিক জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে স্বীকৃত হরিচাঁদ ঠাকুরের হরিনামে মাতোয়ারা হওয়ার সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি গ্রামে অবস্থিত মতুয়া মন্দির। মতুয়া ধর্মমতের প্রবক্তা ছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর। তার বাণী ও নির্দেশনাবলি গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে। মোদির মতো ভিভিআইপির সেই গ্রামে যাওয়া ছিল বাংলাদেশের প্রশাসনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মোদির প্রকাণ্ড ইচ্ছার দাম দিতে গিয়ে বাংলাদেশ সব বাধা অতিক্রম করে তার সফরের ব্যবস্থাটি করে।
কেন এই মতুয়া মন্দির দর্শন? ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে মতুয়াদের নাগরিকত্বে বিষয়টি ফয়সালা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোকসভার নির্বাচনে এ সম্প্রদায়ের ঢালাও ভোট পেয়েছিল বিজেপি। মতুয়াদের নিয়ে মোদির এমন বিশেষ টানের কথা আগে কখনো জানা ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে ৮ দফায় নির্বাচন শুরু হয়েছে। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের ৮৪টিতে মতুয়া ভোটারের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। বিশেষ করে নদীয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা মিলিয়ে মোট ৫০টি বিধানসভা কেন্দ্রের ৩২-৩৩টি আসনে প্রভাব ফেলতে পারে মতুয়াদের ভোট। পশ্চিমবঙ্গে ভোট শুরুর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে সেই মতুয়াদের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে মোদি সুকৌশলে কি পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রচার করে গেলেন? পড়শি দেশে এসে মতুয়া আবেগকে কি তিনি উসকে দিলেন? ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগেও পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরে ঠাকুর পরিবারের বড় মায়ের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেছিলেন। এ সময় মতুয়াদের ঢালাও ভোটও মিলে বিজেপির। কিন্তু দ্বিতীয়বার মোদি সরকার দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার পর মতুয়াদের ভারতে নাগরিকত্বের বিষয়টি এখনো অথৈ সমুদ্রে পড়ে আছে। তাই কি এবার মতুয়া ভোট প্রাপ্তির নতুন মাস্টার স্ট্র্রোক? তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ, ঠাকুরবাড়ির বধূ মমতা ঠাকুর মাঠে নেমে বুঝাচ্ছেনÑ মতুয়াদের রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সব রয়েছে। তারা এমনিতেই সবাই ভারতের নাগরিক। এখানে বিজেপির কিছুই করার নেই। মমতা ঠাকুরের এমন প্রচার পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়ে বেশ কাজ দিচ্ছে। তাই বুঝি বিজেপির প্রয়োজন ছিল আরো একটি মাস্টার স্ট্র্রোক?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মানে পুরো দেশের দায়িত্ব তার হাতে। সেই প্রধানমন্ত্রী একটি প্রদেশের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে ‘মতুয়া’ নামের এক বিশেষ সম্প্রদায়কে উসকে দিয়ে যাবেন ভিন দেশে এসেÑ বিষয়টি ভাবতেই যেন কেমন ভুল রাজনীতির গন্ধ পাওয়া যায়। মুজিববর্ষে এসে বাংলাদেশকে শ্রদ্ধা জানানো, বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানো, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন প্রদান সবকিছুরই একটি সুন্দর অর্থ থাকলেও গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দিরে গিয়ে পূজা দেয়ার সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি ও আবেগের সম্পর্ক থাকলেও ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের অর্ধ শতাব্দী পূর্ণ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের কী সম্পর্ক ছিল, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের ভাবনার একটি জায়গা তৈরি হয়েছে নিঃসন্দেহে।
মোদির ব্যক্তি ইচ্ছা কিংবা বিশ্বাসের চালক তিনি নিজে। কিন্তু তিনি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তখন তার গতির সঙ্গে প্রশ্ন থাকে পুরো ভারতবাসীর ইচ্ছার বিষয়টিও। সেখানে মতুয়া প্রেম কতটা যুক্তিযুক্ত তা না-হয় ভারতবাসীই ঠিক করুক। নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। যে ভারতের সাহায্যের ছাপ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমুছনীয় কালিতে চিরস্থায়ী হয়ে আছে, সেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করার নৈতিক কারণ হেফাজত সমর্থিত মানুষদের কতটুকু আছে তা অবশ্যই ভেবে দেখার বিষয়। কেননা প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অসম্মান করার মধ্যে বিপ্লব নেইÑ আন্তর্জাতিক বিধিব্যবস্থার বিপক্ষে দাঁড়ানোর প্রয়াস আছে মাত্র। অন্যদিকে মোদির বিরোধিতার সঙ্গে পুলিশ ফাঁড়ি পুড়িয়ে দেয়া কিংবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সেতার পুড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে কতটুকু মিল আছে, তা না-হয় হেফাজতের সব সদস্য নতুন করে একবার ভেবে দেখুক।
মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়