সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

আগের সংবাদ

মামুনুল হককে হেনস্থা করায় জুনায়েদ বাবুনগরীর নিন্দা

পরের সংবাদ

হেফাজতি তাণ্ডব এবং অতঃপর

রণেশ মৈত্র

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২১ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

হেফাজতি তাণ্ডব ও নৃশংসতা বাংলাদেশের রক্তার্জিত স্বাধীনতার প্রতি মারাত্মক হুমকি। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা, জামায়াতে ইসলামী, আলবদর, আলশামস ‘ইসলাম রক্ষার’ নামে বাঙালি নিধনে প্রবৃত্ত হয়েছিল, সেই একই উদ্দেশ্য নিয়ে আজ জঙ্গি উৎপাদনকারী সর্বাধিক সংগঠিত প্রতিষ্ঠান হেফাজতে ইসলাম ক’দিন ধরে দেশব্যাপী তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। অগ্নিদগ্ধ করা হয়েছে রেলস্টেশন, সরকারি নানা অফিস, থানা, ধ্বংস করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও কীর্তিগুলো, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ অনেক কিছু।
উপলক্ষ ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমন, মুজিব শতবর্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদানের বিরোধিতা। নরেন্দ্র মোদি সাম্প্রদায়িক দলের নেতা, ভারতে বহু মুসলিম নিধন করেছেন, তা সত্য। কিন্তু বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবিস্মরণীয় ভূমিকা কি তাই বলে বিস্মৃত হওয়া যাবে বা তাকে অশ্রদ্ধা জানানো যাবে?
পাল্টা সঙ্গতভাবেই এ প্রশ্নও তো করা যেতে পারেÑ লাখ লাখ বাঙালিকে নিধন, নারী ধর্ষণ, লুটপাট চালানো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে যদি ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হতো, তখনো কি লাখ লাখ বাঙালি মুসলিম নিধন ও বাঙালি নারী ধর্ষণের কারণে তার বিরোধিতা করতে ‘দেশপ্রেমিক’ হেফাজতে ইসলাম একই রূপ ভূমিকা নিত? পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরত আনার দাবি কদাপি ভুলেও কি হেফাজতে ইসলাম উত্থাপন করেছে বা সেই দাবিতে হরতাল, সমাবেশ, মিছিল করেছে?
আরো প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে যখন ওই মুসলিম নিধন ও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যখন বাবরি মসজিদের স্থলে রামমন্দির নির্মাণ শুরু করেন, তখন কি হেফাজতে ইসলাম তার প্রতিবাদে কোনো ভূমিকা রেখেছিল?
হেফাজতে ইসলামের ঘোষিত নীতি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই দাবি কি আদৌ যুক্তিসংগত। বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক নীতির ভিত্তিতে। সেখানে কি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের আদৌ অবকাশ আছে বাংলাদেশকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ ঘোষণার?
ক’দিন ধরে ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারী ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নানা স্থানে মোদির আগমনের বিরোধিতার নামে যে তাণ্ডব চালানো হলো, অগণিত সাংবাদিককে তাদের কর্তব্যরত অবস্থায় গুরুতর আহত করা হলোÑ এগুলোই কি তাহলে তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলনের নমুনা? মানুষের জীবন ও সম্পত্তি নিয়ে ছিনিমিনি খেলাও কি ইসলামসম্মত?
যে বার্তা দেশবাসীর কাছে ক্রমাগত পৌঁছে দিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম তাতে তো স্পষ্টই বুঝা যায়, তারা বাংলাদেশের সাংবিধান মানতে রাজি না, আইন-কানুন মানতেও রাজি নন।
হেফাজতে ঢাকায় তাদের প্রথম সমাবেশে সরকারের শিক্ষানীতি, নারীনীতিসহ রাষ্ট্রের মূলনীতিগুলোর প্রকাশ্য বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে সরকার উৎখাতের দাবি উত্থাপন করেছিল। এবারো নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতায় আয়োজিত মিছিলগুলোতে এই সরকারের বিরুদ্ধে সেøাগান দেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে উল্লেখ না করে পারা যায় নাÑ এত এত সন্ত্রাসী কাজ করা এবং সংবিধানবিরোধী দাবি তোলা ও সরকার উৎখাতে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও সরকার হেফাজতে ইসলামের মতো বিষধর সাপকে দুধ-কলা দিয়ে পুষেই চলেছে। ঢাকার প্রথম সমাবেশের পর তারা ‘ঢাকা অবরোধ’ করে অবস্থান করাকালে রাতের গভীরে পুলিশ দিয়ে হেফাজতের সমাবেশ বা অবস্থান-অবরোধ কর্মসূচি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভেঙে দিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বহু সংখ্যক মামলা দায়ের করা হলেও শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সব মামলাই প্রত্যাহত, হাটহাজারী মাদ্রাসা ও আল্লামা শফী হুজুরকে বিপুল পরিমাণ জমি উপহার, দফায় দফায় চিকিৎসার জন্য আল্লামা শফীকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় এনে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ঢাকার কাছাকাছি অপর এক সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান, মাদ্রাসার সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির সমতুল্য বলে ঘোষণা, আল্লামা শফীর বলার সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে জাস্টিশিয়া নামক ভাস্কর্য আদালতের অপর পাশে অপসারণ, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত জেনে মাওলানা মামুনুল (হেফাজতের যুগ্ম সচিব) হুমকি দেয়াতে আজতক সেই ভাস্কর্য নির্মাণ না করা এবং এত কিছু করার পরও আজতক হেফাজতের কারো বিরুদ্ধে কোনো মোকদ্দমা দায়ের বা কাউকে আটক না করাÑ এভাবেই সরকার হেফাজত নামক গোখরা সাপকে দুধ-কলা দিয়ে দিব্যি পুষেই চলেছে।
২৬ মার্চ থেকে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘এসব উচ্ছৃঙ্খলতা বন্ধ না করলে জনগণের জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে। তিনি আরো বলেন, ক’দিন ধরে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি, যারা উচ্ছৃঙ্খলতা করল তাদের নাম বা হেফাজতের নাম অনুল্লিখিত গোষ্ঠী ও ধর্মীয় উন্মাদনায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করে চলছে। যার মধ্যে উপজেলা পরিষদ, থানা ভবন, সরকারি ভূমি অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি, রেলস্টেশন, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাড়িঘর, প্রেসক্লাবসহ মানবসম্পদের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। এ জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি সব ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় জনগণের জানমাল, সম্পদ রক্ষার্থে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। অনুরূপ প্রতিক্রিয়াই দিয়েছেন আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার আরো কয়েকজন সদস্য।
এখন প্রশ্ন হলো, এ যাবৎ চার দিন ধরে যেসব অপরাধ হেফাজত করল, যত সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে ধ্বংস করা হলোÑ সেগুলো কি বৈধ? আইনসম্মত? যদি তা না হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা বা তাদের কাউকে এ যাবৎ গ্রেপ্তার করা হলো না কেন? তাদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে কেন?
যাদের জানমালের ক্ষতি হলো, কর্তব্যরত যেসব সাংবাদিক, পুলিশ আহত হলেনÑ তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হেফাজতকে বাধ্য করা হবে কি?
বাঙালি জাতি বহু সংগ্রাম, বহু লড়াই, বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছে। জাতির স্বপ্ন অনেক। সে স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে সরকার সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় জনগণ স্বভাবতই ক্ষুব্ধ। ক্ষুব্ধ এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, সাংবাদিক সমাজ ও দেশপ্রেমিক ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী সব নাগরিক।
হেফাজত, জামায়াত তোষণের নীতি তাই অবিলম্বে এবং দ্বিধাহীনভাবে পরিত্যাজ্য। মনে রাখা প্রয়োজন, এই হেফাজত ও জামায়াতি মতাবলম্বীরাই আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের তীব্র এবং সক্রিয় বিরোধিতা করেছে। এরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির শত্রু পাকিস্তানের পক্ষে কাজই করেনি শুধু তাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতা করেছে।
তাই নমনীয়তা পরিত্যাগ করে অবিলম্বে সব হেফাজতি দুষ্কৃতকারী, হেফাজতের সব নেতাকর্মীকে আইনের আওতার এনে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হোক। অপরাপর অপরাধের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে অপরাধ হেফাজত করেই চলেছে তা স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহ। তাই রাষ্ট্রদ্রোহের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আনা হোক।
রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়