মামুনুলের ফোনালাপ ফাঁস: ‘ওই মহিলা শহীদুল ভাইয়ের স্ত্রী’

আগের সংবাদ

উগ্রবাদ দমনে রাজনৈতিক ঐকমত্য জরুরি

পরের সংবাদ

করোনা এবং আমরা

বনশ্রী বড়ুয়া

শিক্ষকা, লড়িহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২১ , ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৪, ২০২১ , ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

বনশ্রী বড়ুয়া
স্বাগতম! সুস্বাগতম আপনাদের। সবাই চমকে গেলেন তো? ঠিকই শুনেছেন! উন্মুক্ত জনতার সামনে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাই, আমার সব কৃতকর্মের ও দুঃসাহসিক উচ্চারণ যা আপনাদের ব্যথিত করেছে তার জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছি আজ। প্রকৃতই যদি বলি, ক্ষমা নয় ধ্বংস চাই, ধ্বংসস্তূপে ভরে থাক পৃথিবী! ভরে যাক বিশ্বচরাচর! বন্দিত্ব চাই, মানুষকে অসহায় প্রাণীর মতো আটকে রাখতে চাই চার দেয়ালে! বন্দি করতে চাই সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ যত জুলুম জালিমদের বেপরোয়া তীর্যক ব্যঙ্গ। ভেবে দেখেছেন, আজ বন্দি ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ইরিত্রিয়া বন্দি আফগানিস্তা, ইউএসএ আজ বন্দি হোক গোটা বিশ্ব! বন্দি আমার প্রিয় বাংলাদেশ! সস্ত্রম আর রক্তের দামে কেনা এই বাংলা! আমার সোনার বাংলা! আজ জিম্মি হয়ে আছে ঈশ্বরের কাছে। আজ প্রকৃতির অভিশাপে নেমে এসেছে চিৎকার-হাহাকার! তাকে অভিনন্দিত করুন। অকাতরে, স্বইচ্ছায় মরণকে বুকে আঁকড়ে ধরুন। এমন মৃত্যু যার কিনা হবে জানাজাবিহীন দাফন! হবে না শেষ গোসল, থাকবে না প্রিয়জনের দুফোঁটা অশ্রু! অভিশপ্ত কোয়ারেন্টাইনের পালা চুকিয়ে বিদায় পৃথিবী! লাশের পরে লাশ, নেই গোর, নেই গোরস্তান! নেই খাটিয়া, নেই বড়ই পাতার জল! নেই মোমবাতি, নেই তুলসীর মালা! আজ জীবন্ত শবের ওপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা বিশ্ব! করোনাক্রান্ত বিশ্ব! জানেন, আজ পৃথিবী বড় অসুখ!
এই তো সেদিনও শান্ত জলে অকারণ ঢেলেছি উত্তপ্ত লাভা, মানুষ তবু অমানুষের মতো মানবতার গায়ে লাগিয়েছি মুখোশ, অরণ্যের কাঁচা সবুজ আবরণে জ্বেলেছি আগুন, পুড়িয়ে ছারখার করেছি বুনোপাখির পালক, গলা টিপে মেরেছি অতিথি পাখি কিংবা গাঙচিলের অসহায় প্রাণ! পুঞ্জীভূত করেছি কালো টাকার স্তূপ, মহাতাণ্ডবলীলায় আমিই রাজা, মহারাজা! নির্মম বর্বরোচিত আঘাতে তুলেছি ঘর্মাক্ত মানুষের চামড়া, ঘাম চুষে নিয়ে তুলেছি তৃপ্তির ঢেঁকুর।
উল্লাসে গিলে খেয়েছি অসহায়ের দুমুটো অন্ন। শুকনো রুটি চুরির দায়ে কষে লাথি বসিয়েছি ছোট্ট অভুক্ত শিশুটির পেটে, স্তন কিংবা কোমরের ভাঁজে মাংসল তনুতে চোখ রাখতে হয়েছি হায়েনা, যে স্তনের অমৃত সুধা পান করে আজ আমি হয়েছি হিংস্র ব্যাঘ্র! গলা বেয়ে নেমে আসা ঘাম চেটে খেতে হয়েছি নপুংসক, তিলে তিলে গড়েছি একজোড়া অন্ধ আঁখি, দেখেও দেখিনি ধসে যাওয়া পৃথিবীর মৃত মানচিত্র! প্রকৃতির গলায় বসিয়েছি ধারালো ছুরি! আর কত ক্ষমা চাইলে থেমে যাবে এই মৃত্যু, এই সারি সারি লাশের মিছিল!
সেই আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। জানেন, একটু আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর পেলাম আমাকে বন্দি করে প্রকৃতি নেমেছে রং বদলের খেলায়। জেগেছে মৃত শহর পাখিদের কলকাকলিতে, ফিনিক্স পাখিরাও ফিরে ফিরে আসে। ইউরোপের রাস্তায় নাকি নেমে এসেছে বন্য প্রাণী, চারদিকে চলছে প্রকৃতির শৈল্পিক কারুকাজ! আমাকে হাত পায়ে শিকল পরিয়ে সমুদ্র তটে ভেসে বেড়ায় এক অবুঝ ডলফিন। যার জলকেলি স্নান যেন এক স্বর্গীয় অপরূপ সৌন্দর্য! ওই যে দেখুন বালুচর ঘেঁষে সৈকতে ঘুরে বেড়ায় কচ্ছপ! গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যায় লাল কাঁকড়ার দল, ওরা বেলাভূমির ক্যানভাসে আঁকে আলপনা। ব্যস্ততম শহরের চৌকাঠে আজ নাকি বাসা বুনেছে চড়ুই পাখি ঝাঁক, সমুদ্রের ঢেউয়ে উন্মাদ তালে হরিণ শাবকের নৃত্য মনে করিয়ে দেয় জল আর স্থলের ব্যবধান কিন্তু বেঁচে থাকা আর বেঁচে ওঠার আনন্দ যে কি স্বয়ং ঈশ্বর জানেন! দেখুন, রাস্তার দুপাশে হাসি ঝরায় বুনোফুল; ল্যান্টেনা কিংবা ভাঁটফুলের মাদকতা আপনাকে মাতাল করে ফেলবে। এক খণ্ড সবুজের ডানায় উড়ে যায় লাল-নীল-বেগুনি প্রজাপতি আর জোনাকির দল।
আমি ঈশ্বরকে একান্ত এবং সম্পূর্ণরূপে আমার ভেবেছিলাম, ভেবেছিলাম তিনি এই প্রান্তর, এই নীলিমা কিংবা অরণ্যের ডাক শুনতে পান না! ঈশ্বরের ওপরও আমার একাধিপত্য। কিন্তু কি অদ্ভুত! তিনি শুনেছেন এই প্রান্তরের আত্মচিৎকার! তিনি সমুদ্রের ব্যাকুলতায় কান পেতেছেন, অরণ্যের আরজ শুনেছেন বিনাবাক্যে, শুনেছেন অবলা প্রাণীর নিমগ্ন প্রার্থনা! আমাকে তুচ্ছ করে দিয়ে তিনি আশীর্বাদের হাত বাড়ালেন তাদের দিকে, আমাকে ঠেলে দিলেন অনিবার্য পরিণতির দিকে। পাপে তাপে রুষ্ট প্রকৃতিকে তিনি করে দিলেন শাস্ত! তবে কি শেষ হয়ে এলো অভিশপ্ত পৃথিবীর কান্না?
অমানবিক নিষ্ঠুর খেলা শেষ হলো তবে? প্রকৃতির অভিশাপে নুয়ে পড়া পৃথিবী জেগে উঠবে আবার! শিরায়-উপশিরায় অনুতে তনুতে আবার জাগবে প্রেম ক্ষত-বিক্ষত এই প্রান্তরে পাবে মুক্তি স্বাদ! অনাগত শিশুর তরে রেখে যাব বিশুদ্ধ পবন?
ভুলে যাব ভেদাভেদ শৃঙ্খল? তবে কি ভুলে যাব ক্ষুধার জ্বালা? রাষ্ট্রতন্ত্র নয়, রাজা নয়, মানুষই হবে পরিচয়! চিরতরে মুছে যাবে ক্রীতদাস হয়ে বেঁচে থাকার আজন্মকালের ইতিহাস! তবে কি আসছে নতুন সূর্য! ভয়কে সরিয়ে আহ্বান নতুনের! নব পরিচয় মানুষে মানুষে! থমকে যাওয়া পৃথিবী জেগে উঠবে আবার! তবে স্বাগতম হে নব আবাসভূমি! সুস্বাগতম! দাহ কাল শেষে বৃষ্টি দাও। পুড়ে কয়লা হওয়ার আগে এসো জ্বলে উঠি আবার। পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার এটাই শ্রেষ্ঠতম সময়! ভালোবাসায় চাদরে এবার লাগবে দখিনের হাওয়া! আসবে প্রকৃতির ডালে সবুজের কচি মুখ! ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে হাসবে হংসমিথুন! জোড়া শালিকের দল খুঁজে নেবে প্রেম! স্বাগতম হে বিশ্বচরাচর! সুস্বাগতম! আসুন ভালোবাসি। ভালোবাসা দিয়ে রচি নতুন পৃথিবী।
শিক্ষকা, লড়িহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়