এখনই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

আগের সংবাদ

স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়বে বিপদ

পরের সংবাদ

বাংলার বন্ধু, লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

কোনো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান তাকে ‘বাংলার বন্ধু’ খেতাব দেয়নি, কোনো প্রকাশ্য সভায় কেউ তাকে ‘বাংলার বন্ধু’ ঘোষণা করেননি। তিনি নিজেই বলেছেন যে তিনি ‘বাংলার বন্ধু’। নিজের ঘোষণা বলে-বাই প্রোক্লেমেশন। কেন এবং কেমন করে তিনি বাংলার বন্ধু তা তুলে ধরতেই এই নিবন্ধটি লিখতে হয়েছে।
২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বর্বরোচিত আক্রমণের সংবাদ তখনো পশ্চিমের অনেকেই পাননি। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ালেন লর্ড আর্চিবল্ড ফেনার ব্রকওয়ে। ৪ এপ্রিল লন্ডনে তিনি প্রকাশ্য সভায় তার বক্তব্য প্রদান করলেন।
ব্রিটিশ কলোনিভুক্ত দেশগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার নির্দেশক ও উৎসাহদাতা ব্রিটিশ লর্ডস সভার সদস্য লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে জনসভায় বলেন, তিনি তার শৈশব কাটিয়েছেন বাংলায়, সে কারণে তিনি নিজেকে সব সময়ই বাংলার বন্ধু হিসেবে পরিচিত করিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, স্বাধীন পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাস খতিয়ে দেখলে এটা সম্ভবত কখনো মনে হবে না যে পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের অধীনে থাকুক এমন কোনো ইচ্ছে ব্রিটিশদের ছিল। পূর্ব বাংলায় যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে, তিনি অবিলম্বে তা বন্ধ করার দাবি জানান।
তিনি নিম্নলিখিত দাবিগুলো পেশ করেন :
(ক) ভোগান্তিতে পড়া পূর্ব বাংলার দুর্গত মানুষের জন্য এখনই উপযুক্ত ত্রাণ পাঠানো হোক। (খ) রাজনৈতিক সব বন্দির মুক্তি দেয়া হোক। (গ) পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে গুলি বন্ধের আদেশ দেয়া হোক এবং পূর্ব বাংলা থেকে তাদের প্রত্যাহার করে নেয়া হোক। (ঘ) অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকে স্বাধীনভাবে জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভার তাদের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির হাতে অর্পণ করা হোক। (ঙ) পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি যে বিশ^শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপÑ তা বিবেচনা করে অবিলম্বে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দরকার। (চ) ১৯৭১-এর জানুয়ারিতে কমনওয়েলথ সম্মেলনে স্বীকৃত আদর্শ সম্বলিত সিঙ্গাপুর ঘোষণায় পাকিস্তানও সম্মতিদাতা দেশ। সুতরাং লর্ড ব্রকওয়ে দাবি করেন, ব্রিটেন, কানাডা ও ভারতের মতো জ্যেষ্ঠ কমনওয়েথভুক্ত দেশ কমনওয়েথ সচিবালয়ের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন প্রেরণ করুক।
লর্ড ব্রকওয়ে জোর দিয়ে বললেন পূর্ব পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য ভারত নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের যে প্রস্তাব দিয়েছে তা অবশ্যই সবার সমর্থন করা উচিত। গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিনিধি মার্টিন অ্যাডেনি ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ঢাকায় ছিলেন, অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি সেখানকার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। শ্রমিক দলের এমপি এবং সাবেক মন্ত্রী পিটার শোর বলেন সশস্ত্র নির্মমতায় পূর্ব বাংলার গণতন্ত্র দমনকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে মেনে নেবার কোনো উপায় নেই; কী ঘটছে বসে না থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তা দেখার জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। পূর্ব বাংলায় রক্তপাত বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চাপ দিতে ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেছেন। তিনি দাবি জানান পূর্ব বাংলার ভবিষ্যৎ কি হবে সে সিদ্ধান্ত নেবে সেখানকার জনগণ, পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নয়। তিনি বলেন, আাগামীকাল ৫ এপ্রিল (১৯৭১) হাউস অব কমন্সের বিতর্কে ব্রিটিশ লেবার পার্টি পক্ষে তার যেটুকু ক্ষমতা আছে সব প্রয়োগ করে পূর্ব বাংলার সংকট নিরসনে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্রিটিশ সরকারকে চাপ প্রয়োগ করা হবে।
(ভারত সরকার প্রকাশিত বাংলাদেশ ডকুমেন্টস থেকে ৪ এপ্রিলের লন্ডন সভার বিবরণী অনূদিত)
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক মার্টিন অ্যাডেনির জন্ম ৭ সেপ্টেম্বর প্যালেস্টাইনের জেরুজালেমে (তখনো ইজরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়নি) ব্রিটিশ মা-বাবার ঘরে। ১৯৬৫ সালে কুইনস কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে গার্ডিয়ানের রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। একাত্তরের মার্চে তিনি যখন ঢাকায় তার বয়স মাত্র ২৫ বছর। ১৯৭৭ পর্যন্ত তিনি গার্ডিয়ানে কর্মরত ছিলেন, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৯ বিবিসি টেলিভিশনে কাজ করেছেন। তিনি বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক। তার মধ্যে রয়েছে : ব্যাগেজ অব এম্পায়ার, নাফিল্ড : এ বায়োগ্রাফি, দ্য মাইনার্স স্ট্রাইব ১৯৮৪-৮৫, দ্য মোটর মার্কেট, দ্য টারবুলেন্ট হিস্ট্রি অব ব্রিটেন’স কার ইন্ডাস্ট্রি।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তা পিটার শোর স্টেফনি থেকে নির্বাচিত লেবার দলীয় এমপি এবং সাবেক কেবিনেট মন্ত্রী, একাত্তরে লন্ডনে বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলোতে অংশগ্রহণ করেছেন এবং শুরু থেকে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের কঠোর সমালোচনা করে আসছিলেন। তার জন্ম ২০ মে ১৯২৪, গ্রেট ইয়ারমাউথ শহরে, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০১ মৃত্যুবরণ করেন, স্টেফনিতে তিনি সমাহিত হন। তিনি লন্ডনে বাংলাদেশিদের অন্যতম অভিভাবক ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় রয়াল এয়ারফোর্সের সদস্য হিসেবে তিনি ভারতে অবস্থান করেন।
লর্ড আর্চিবল্ড ফেনার ব্রকওয়ে ১ নভেম্বর ১৮৮৮ ব্রিটিশ ভারতের কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন, শতবর্ষ পূর্তির ৬ মাস আগে ২৮ এপ্রিল ১৯৮৮ মৃত্যুবরণ করেন। কমনওয়েথভুক্ত দেশগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক ছিলেন তিনি। ১৯৪৭-এর ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতায়ও তার অবদান এতটাই বেশি যে ভারত সরকার তাকে ১৯৮৯ সালে পদ্মভূষণ খেতাব প্রদান করে।
কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করার কারণ তার বাবা ডব্লিউ জি ব্রকওয়ে এবং মা ফ্রান্সেস এলিজাবেথ অ্যাবে উভয়ে মিশনারি হিসেবে কাজ করতে লন্ডন থেকে কোলকাতায় এসেছিলেন। শৈশবের একটি অংশ সেখানেই কাটে, তারপর তাকে ব্ল্যাকহিথে মিশনারির সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয় (এটিই এখন এলথাম কলেজ), এখানেই সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন।
পুরো ৮০ বছর তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। লন্ডনের কেন্দ্রস্থল হবর্ন-এর রেড লায়ন স্কোয়ারে তার একটি ভাস্কর্য স্থাপনের প্রস্তাব করে কৃতজ্ঞ কমনওয়েলথভুক্ত দেশের প্রতিনিধিগণ, সরকার অনুমোদন দিলেও তিনি নিজেই আপত্তি করেন। ধরে নেয়া হয়েছিল তাকে মরণোত্তর সম্মান জানাতে ভাস্কর্যটিকে উন্মোচন করা হবে, কিন্তু তার সক্রিয় কর্মজীবন এত দীর্ঘ হয়ে যায় যে নির্মাণের অনুমোদনকাল পেরিয়ে যায়; পুনরায় অনুমোদন নিয়ে তার জীবদ্দশায়ই তা স্থাপন করা, কিন্তু ১৯৮৭’র প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে ভাস্কর্যের ওপর একটি গাছ ভেঙে পড়লে একটি বাহু ভেঙে যায়। তার মৃত্যুর পর পরই এটি মেরামত করে বিমাকৃত ভাস্কর্য উন্মুক্ত করা হয়। পনেরো ষোলো বছর বয়সে তিনি স্কুলের কাজ না করে রাজনৈতিক ইশতেহার লিখতে শুরু করেন। এসব পুস্তিকার প্রচ্ছদ নিজেই আঁকতেন। তার ইশতেহারের পাঠক তখন বড়জোর একজন বা দুজন, কিন্তু তিনি অবিশ্বাস্য রকম তৃপ্তি পেতেন। তিনি নিজেই বলেছেন স্কুলে ভর্তি হয়ে শিখেছেন কেবল রাগবি খেলা আর রাজনীতি। স্কুলের হেড মাস্টার যখন তাকে বের করে দেবার হুমকি দেন তিনি বলেন তাহলে তিনি নিজেকে রাজনীতির জন্য শহীদ হয়েছেন বলে বিবেচনা করবেন। স্কুলও একজন ভালো রাগবি খেলোয়াড়কে ছাড়তে চায়নি বলে তিনি টিকে যান। বিংশ শতকের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তিনি সাক্ষী এবং কোনো না কোনোভাবে তাতে অংশগ্রহণকারী।
স্কুল ছেড়ে ১৯০৬ সালে সাংবাদিকতা ও রাজনীতির কাজ পাবার লোভে লন্ডন এলেন এবং কোনোভাবে টিকে থাকার কায়দা রপ্ত করলেন। আর তার ভাষায় ‘সমাজতন্ত্র হয়ে উঠল আমার জীবনের আবেগ’। নিজের ১৯তম জন্মদিন উদযাপন করে যোগ দিলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টিতে। সে সময় বামপন্থি পরিচিতির স্মারক ছিল লাল টাই পরা। লাল টাই পরে সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তৃতা দিতে দিতে তার ছোটবেলায় তোতলামি কেটে গেল। ১৯১১ সালেই ২৩ বছর বয়সে তাকে লেবার পার্টির মুখপাত্র ম্যানচেস্টার ভিত্তিক ‘লেবার লিডার’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হলো। ২৩ জুলাই ১৯১৪ লেবার লিডার-এর প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লিখলেন ফেনার ব্রকওয়ে ‘দ্য ওয়ার মাস্ট বি স্টপড’- যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। উল্লেখ্য, ২৫ দিন আগে ২৮ জুন ১৯১৪ প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। ৬ আগস্ট ১৯১৪ তিনি তার লেখার শিরোনাম করলেন : যুদ্ধ নিপাত যাক। ব্রিটেনের শ্রমিক-কর্মচারীদের উদ্দেশ্য করে লিখলেন, ‘গ্রেট ব্রিটেনের শ্রমিকদের ইউরোপের শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। এটি ইউরোপের শাসক শ্রেণির ঝগড়া। তাদের ঝগড়াকে নিজের ঘাড়ে তুলে নেবেন না। ভবিষ্যৎ অন্ধকার, কিন্তু শ্রমিকের সংহতি ইউরোপের জনগণকে আলোর দিশা দিতে পারে।’
সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের বিরোধিতা
১৯১৪ সালেই তিনি শুরু করলেন ‘নো কনস্ক্রিপশন’- যুদ্ধের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিরুদ্ধে আন্দোলন। ১৯১৬ সালে ব্রিটেন যখন ‘কনস্ক্রিপশন’ শুরু করল যুদ্ধবিরোধী প্রচারণার জন্য তার অফিস অবরোধ ও তল্লাশি হলো, তিনি গ্রেপ্তার হলেন, ছাড়া পেলেন; ১৯১৬’র জুলাই মাসে ‘কনস্ক্রিপশন’কে বিরোধিতা করে রচিত লিফলেট বিতরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন। নভেম্বরে আবার তাকে গ্রেপ্তার করে এই শর্তে সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো যে তিনি কেবল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন যা সরকারের যুদ্ধের উদ্যোগে সহায়ক হবে। কিন্তু তিনি শর্ত মানতে অস্বীকার করলেন। তখন বলপূর্বক তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হলো। রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে তাকে টাওয়ার অব লন্ডনে রাখা হলো, মানসিক নির্যাতন করা হলো। বলা হলো, তাকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফেনার ব্রকওয়ে সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি সেনাবাহিনীর কোনো কমান্ড মানতে বাধ্য নন।
তাকে চেষ্টার ক্যাসেল কারাগারে পাঠানো হলো, কোর্ট মার্শাল করা হবে। তিনি কোর্ট মার্শালের প্রক্রিয়াকে বললেন হাস্যকর প্যান্টোমাইম। তার সশ্রম কারাদণ্ড হলো। আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বাইরে শ্রমমঞ্জুর হিসেবে কাজের অতিরিক্ত দৈনিক ৭০ ফুট মেইলব্যাগ সেলাই তার কাজ। তার স্ত্রী লীনা ১৮ মাস বয়সি কন্যাকে নিয়ে যখন স্বামীকে দেখতে এলেন, তিনি লিখলেন, ‘আমার মেয়ের কৌতূহলী চোখ তার বাবাকে একটি খাঁচার ভেতর আবিষ্কার করল।’ তিনি ব্রিটেনের কারা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্যও আন্দোলন শুরু করলেন। কারাগারের ভেতর থেকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য আরো দুবছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। তিনি কারাবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিলেন। তাকে সরিয়ে নেয়া হলো লিঙ্কন কারাগারে। কারাগার থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি ব্রিটিশ সরকারের একটি হাস্যকর চিঠি পেলেন, হিজ ম্যাজেস্টির ওয়ার অফিস থেকে তাকে জানানো হয়েছে তাকে সেনাবাহিনী থেকে ডিসচার্জ করা হয়েছে। আর তার আচরণ এত খারাপ যে তিনি যদি কখনো সেনাবাহিনীতে যোগদানের চেষ্টা করেন তাহলে তাকে দুবছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
ফেনার ব্রকওয়ে ওয়ার অফিসের রসবোধের দুরবস্থার কথা নিজেই লিখেছেন।
১৯৩০-এর দশকে তিনি নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। হিটলার যখন ব্রিটেন আক্রমণ করে, অবিরাম বোমা বর্ষিত হতে থাকে বস্তুত তখন তা প্রতিরোধ না করে এবং পাল্টা আক্রমণ না করেন নিষ্ক্রিয় বসে থাকা অযৌক্তিক হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন এবং সেখানেই বোমা পড়েছে তার রাজনৈতিক কর্মী ও ফায়ার সার্ভিস সমন্বিত করে সেখানে ছুটে গেছেন এবং বোমার আগুন যাতে না ছড়ায় সে জন্য কাজ করেছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন ফাইটার। যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জার্মানিতে গিয়ে তিনি ক্ষুধার্ত শিশুদের মধ্যে রুটি বিতরণ করেছেন।
তারপর তিনি শুরু করলেন আণবিক অস্ত্র পরিহার আন্দোলন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনিই ব্রিটেনে গঠন করলেন ‘ব্রিটিশ কমিটি ফর পিস ইন ভিয়েতনাম’। তিনি এর আগে শ্রমিক দলের এমপি নির্বাচিত হন। পরে তিনি লডর্স সভার সদস্য হন।
সত্তর ও আশির দশকে নিরস্ত্রীকরণের আলোচনা ও চুক্তিগুলোর তিনিই ছিলেন অন্যতম প্রবক্তা।
১৯৭১ সালের ফেনার ব্রকওয়ে লর্ড সভার ভেতরে ও বাইরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কথা বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার মানুষকেই তাদের ভাগ্য নিয়ন্তা হতে হবে।
ব্রকওয়ে কুড়িটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, চার খণ্ডের একটি আত্মজীবনীও প্রকাশ করেছেন। ভারতের সংকট নিয়ে ১৯৩১ সালেই প্রকাশ করেছেন ‘দ্য ইন্ডিয়ান ক্রাইসিস’।
করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাধির দিনগুলোতে তার নাম উচ্চারিত হয়েছে ১৯৩৭ সালে লেখা তার উপন্যাস ‘পার্পল প্লেগ : এ টেইল অব লাভ এন্ড রেভুলিউশন’ উপন্যাসের জন্য। এর কাহিনীতে প্লেগ আক্রান্ত যাত্রী থাকায় একটি সমুদ্রগামী জাহাজকে এক দশক হোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে জোর দিয়ে বলেছেন ‘সামাজিক ব্যবস্থা যদি ভালো না হয়, মানুষ ভালো জীবন প্রত্যাশা করতে পারে না।’ আমরা মন্দ সমাজব্যবস্থার শিকার।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়