স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়বে বিপদ

আগের সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সংসদ ভবনে হামলার চেষ্টা, পুলিশসহ নিহত ২

পরের সংবাদ

দুর্নীতি : হন্ডুরাস নয় বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল

সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ১:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ১:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ কেন, মাত্র এক কোটির মতো জনসংখ্যার হন্ডুরাসের জনগণও কি দুর্নীতিমুক্ত দেশ চায়নি? দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও কি আমাদের দুদকের মতো দেশটিতে দুর্নীতি দমনের চেষ্টায় কোনো কমতি করেছিল? এরপরও দুর্নীতির লাগামে টান পড়েনি। দেশটিতে দুর্নীতি মহিরুহতে এসে ঠেকেছে ধাপে ধাপে। মানুষের গা-সহা হতে হতে সেখানকার প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসা তেমন ঘটনার মধ্যে পড়ে না। ?ন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে একটি মামলায় ঘুষ নেয়ার অভিযোগ ওঠার ঘটনাও দেশটির মানুষের কাছে কৌতূহল বা ঘৃণা কোনোটাই জাগায়নি। এ নিয়ে তাকে তেমন টালমাটাল অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে না।
নিউইয়র্ক শহরে মাদক চোরাচালানের অভিযোগে অভিযুক্ত জিওভান্নি ফুয়েন্তেসের বিচারকাজ চলছে। এ মামলায় জোহ নামে পরিচিত ?ন্ডুরাসের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনিও যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন পাচারে সাহায্য করার বিনিময়ে ঘুষ নিয়েছেন। গত ১৬ মার্চ ওই মামলার একজন সাক্ষী বলেছেন, ২০১৩ সালে হার্নান্দেজ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে দুবার ঘুষ নিয়েছেন। কিছুদিন আগে আরেক চোরাচালানকারী গোষ্ঠীর নেতা তার জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা পেতে হুয়ানকে আড়াই লাখ ডলার ঘুষ দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টও এ নিয়ে এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট করতে ছাড়েনি। মামলায় শেষতক কী হবে, সেটা অপেক্ষার বিষয়। তবে মাদক কারবারে প্রেসিডেন্ট হুয়ানের নাম ফেটেছে আরো আগেই।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া এক মামলায় এই প্রেসিডেন্টের ভাই সাবেক এমপি টনি অভিযুক্ত হন। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে কুখ্যাত মেক্সিকান ড্রাগ লর্ড এল চাপোর কাছ থেকে এক মিলিয়ন ডলার ঘুষ নেয়ার অভিযোগ। ওই মামলায় টনিকে যাবজ্জীবন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। তার বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগটি এলো এমন এক অস্থির সময়ে যখন ?ন্ডুরাসে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি মাস আটেক। নভেম্বরে ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও ১২৮ জন কংগ্রেস সদস্য নির্বাচন করবেন ভোটাররা। নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতি ও মাদক কারবার এরই মধ্যে ইস্যু হয়ে উঠেছে। অবশ্য ?ন্ডুরাসের জনগণ অভ্যস্ত হয়ে গেছে এ টাইপের অভিযোগ শুনতে। নির্বাচনে হুয়ানের যিনি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন বিরোধী লিবারেল পার্টির প্রার্থী ইয়ানি রোসান্থাল। মানি লন্ডারিংয়ের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিন বছরের জেলের মেয়াদ শেষ করেছেন ইয়ানি। তিনি হুয়ানের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ নিয়ে খুব ব্যস্ত।
আরেক প্রার্থী দেশটির বামপন্থি দল লিবারেল পার্টির মানুয়েল জেলায়ার স্ত্রী শিওমারা কাস্ত্রোর বিরুদ্ধেও ঘুষের অভিযোগ আছে। গ্রামবাংলার ‘চোরেও চোর দৌড়ায়’Ñ বচনটি ?ন্ডুরাসে বেশ মানানসই। মাদকের অর্থ ও দুর্নীতি হন্ডুরাসের রাজনীতির স্তরে স্তরে ঢুকে পড়েছে। হন্ডুরাসবাসী এ রাজনীতিতে ত্যক্ত-বিরক্ত। আবার এদেরকেই পছন্দ করতে হয়। গত বছরের করোনা মহামারি ও ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ত্রাহি অবস্থা যাচ্ছে হন্ডুরাসের মানুষের। জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেক লোক দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। বিভিন্ন পথে আমেরিকা যাওয়ার আশায় সীমানা পেরিয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আরো অনেকেই তাদের পথ অনুসরণ করছে। দেশে পড়ে থাকা বাকিরা চলমান রাজনীতি ও রাজনীতিকদের সঙ্গে একাট্টা হয়ে উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে টিকে আছে। স্রোতের বাইরে যাওয়ার আশা বা চেষ্টা কোনোটাই তারা করে না। আমরা তো করি। আমরা সুখী দেশ ফিনল্যান্ড নই। আবার দুর্ভিক্ষের দেশ সোমালিয়াও নই। গৃহযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে হাবুডুবু খাওয়া ইয়েমেনও নই। কিম জং উনের দেশ উত্তর কোরিয়া নই। ভুটানও নই। মহামারি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরাসহ প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। আমাদের সামনে এগোবার পথরেখা আছে। আবার দুর্নীতির মাখামাখিতে এগিয়ে যেতেও অভ্যস্ত। বিরতিহীনভাবে দেশের অর্থনীতির গতিময়তা পাচ্ছে। বাজেট বাড়ছে।
১৯৭২ সালের ৩০ জুন স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঘোষিত বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার। ৫০ বছর পর চলতি বাজেটটি ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। বাজেটের আকারের এই বিশাল পরিবর্তনের সমান্তরালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তাক লাগানো। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা লাগানো পশ্চিমাদের কাছে তা তাক লাগানোর চেয়েও বেশি ম্যাজিকেল। যে যারে যত নিন্দে, তারেই তত পিন্দে আঞ্চলিক প্রবাদের মতো তারা এখন বাংলাদেশকে প্রশংসায় ধন্য করে। পাশে থাকার অঙ্গীকার শোনায়। বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের সাফল্যের সঙ্গে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এমডিজি পূরণের পর থেকে এ ভূমিকায় তারা। সাকসেস স্টোরিও রচনা করে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস এন্ড বিজনেস রিসার্চ-সিইবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে। তখন বাংলাদেশ হবে ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। বর্তমানে অবস্থান ৪১তম। ২০৩৩ সালে আমাদের পেছনে থাকবে মালয়েশিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ১২টি দেশকে টপকে গেছে। আগামী ১৫ বছরে টপকে যাবে আরো ১৭টি দেশকে। এমন আশাজাগানিয়া সাফল্যের পেছনে বিশেষভাবে কাজ করেছে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন। স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতা পাওয়ার পরের এক দশক বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরেছে কৃষিকে ঘুরে। এখন কেবল কৃষি নয়, শিল্প ও সেবা খাতও অর্থনীতির চাকা ঘুরাচ্ছে। রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি তো ভূমিকা রাখছেই।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে খ্যাতিমান কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পরামর্শ দিয়েছেন, দারিদ্র্য কাটাতে কী কী করা উচিত, তার শিক্ষা বাংলাদেশের কাছ থেকে নিতে। সত্য এবং তথ্য এভাবেই প্রকাশ পায়। হয়তো দেরি হয়। বাংলাদেশের আজকের অগ্রগতি পাকিস্তানিদের মর্মে বেদনা দিচ্ছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে, বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিম্ন শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, স্যানিটেশন ও নারীশিক্ষায় উন্নতি উন্নত বিশ্বকেও ঈর্ষান্বিত করছে। ত্রুটিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা, জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি দেশের এমন ‘প্যারাডক্স’ উন্নয়ন তাদের কারো কারো কাছে গবেষণার বিষয়। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ বাংলাদেশকে তাদের উন্নয়নের পোস্টার চাইল্ড হিসেবে উদাহরণ দেয়।
দুর্নীতি না থাকলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার গতি কোথায় গিয়ে পৌঁছত ভাবা যায়? দুর্নীতি দমনের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। এছাড়া বাংলাদেশে আরো যত আইন আছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই দুর্নীতি রোধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। আসলে শুধু আইন দিয়ে দুর্নীতি দমন করা দুরূহ। বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআই প্রতি বছর দুর্নীতির ধারণা সূচক রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশের অবস্থান একটু বাড়ে বা কমে। তবে শীর্ষত্ব অটুট থাকে। তা আর কত? মূলত রাষ্ট্রীয় খাতে ঘুষ লেনদেন, সরকারি অবস্থান ও সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রকাঠামোকে দখল করার প্রবণতা কমছে না। বরং কে বেশি করে, কার জমানা থেকে এগুলো বেশি হয়েছেÑ এ ধরনের বাৎচিত জমে। মন-মননে, ইতিহাস-ঐতিহ্যে আমরা হন্ডুরাস নই। এ দেশের সবাই দুর্নীতির ভাগ চায় না। বয়কট করতে না পারলেও দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের এ দেশের মানুষ ঘৃণা করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা প্রধানমন্ত্রী বরাবরই বলে আসছেন। দুর্নীতিগ্রস্তদের যে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না, এমনও নয়। রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে নিজেদের সম্পদ বিকাশের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করার লাগামে টান দেয়া জরুরি। নইলে জিরো টলারেন্স নীতি বা বিচারের উদ্যোগে সাফল্যে সুদূরপরাহত। বরং অতীষ্ট হতে হতে, দুর্নীতিবাজদের উল্লাসনৃত্য দেখতে দেখতে এক সময় মানুষের মধ্যে অতিমাত্রায় গা-সহা হয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। হন্ডুরাসের পরিস্থিতির নেপথ্য কিন্তু সেখানেই।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়