আজ চালু হচ্ছে ঢাকার ১০ ইউটার্ন

আগের সংবাদ

সুযোগের অপেক্ষায় জঙ্গিরা

পরের সংবাদ

ঢাকায় হাসপাতালে ঠাঁই নেই

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২১ , ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ

সংক্রমণের তীব্রতা রাজধানীতে বেশি, আইসিইউর জন্য হাহাকার

ধীরে ধীরে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকিতে যাচ্ছে সারাদেশ। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঝুঁকির তালিকায় এসেছে দেশের ৩১টি জেলা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, নমুনা পরীক্ষার তথ্যানুসারে, ৪০ শতাংশেরও বেশি করোনা রোগী ঢাকাতে। আর তাই দেশের বিভিন্ন জেলায় হাসপাতালের সাধারণ ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বেড ফাঁকা থাকলেও ঢাকার হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ। ঢাকায় করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত সরকারি ১০টি হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না অনেকে। নির্ধারিত ৯টি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়ছে।

হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক-নার্সরা বলছেন, ভর্তি রোগীদের আইসিইউ সাপোর্ট লাগলেও তা মিলছে না। এক্ষেত্রে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তবেই আইসিইউতে চিকিৎসার সুযোগ মেলে। ওপর মহলের ফোনেও এখন কাজ হচ্ছে না। সংক্রমণের এমন ঊর্ধ্বগতিতে হাসপাতালগুলোয় বেড সংকটের কথা স্বীকার করেছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। তিনি আশঙ্কা করছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বেড বাড়িয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সংক্রমণ এভাবে বাড়তে থাকলে অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন।

সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অতিরিক্ত ১০টি আইসিইউ বেড সংযোজন করা হয়েছে। ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে আড়াই হাজার সাধারণ বেড এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ১ হাজারের বেশি বেড বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে, হাসপাতালের বেড বাড়িয়ে রোগী সংকুলান করতে পারব না। ঢাকায় দেড় দুই কোটি মানুষের বাস। ফলে পুরো ঢাকা শহরকেই হাসপাতালে কনভার্ট করলেও রোগী সংকুলান হবে না।

এদিকে চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ঊর্ধ্বগতিকে ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’ বলা যায়। কারণ জনসংখ্যার অনুপাতে যেখানে প্রতিদিন ৪/৫ লাখ পরীক্ষা হওয়ার কথা সেখানে ২৮/২৯ হাজার পরীক্ষা হচ্ছে। প্রকৃত চিত্র এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে। তাই এখনোই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। বড় মাশুলও দিতে হতে পারে।

করোনার হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসকরাও হাসপাতাল পরিস্থিতি দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ডা. সাইয়েদা নাজিয়া ফেসবুকে ২৪ মার্চে তার নাইট ডিউটির অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে লিখেছেন, ‘ফজর পর্যন্ত আমি এবং আমার তিন কলিগ সাততলা থেকে ১২ তলা পর্যন্ত অবিরাম ছুটে বেরিয়েছি। অবিরাম রোগী আসছে শ^াসকষ্ট নিয়ে। বেশির ভাগ রোগীর ফুসফুস ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ আক্রান্ত। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭০ থেকে ৮০ পার্সেন্ট। আইসিইউতে অবিরাম কল যাচ্ছে। কিন্তু ১৪ বেডের আইসিইউ খালি হচ্ছে না। ২৫টা আইসিইউ কল পেন্ডিং। রোগীর অ্যাটেনডেন্টের অসহায় আর্তনাদে রাতের বাতাস ভারি। তাদের কাকুতি-মিনতি যত টাকা লাগে ডক্টর একটা আইসিইউ দিন।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিওলজি অধ্যাপক ডা. শাহজাদ হোসাইন মাসুম সম্প্রতি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, মাস দুয়েক একটু শ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। কখনো একটা বেডও খালি রাখতে না পারলেও রোগীদের ওয়ার্ডে শিফট করা যাচ্ছিল। মৃত্যুহার অনেক কম ছিল। এক সপ্তাহের মাঝে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আক্ষরিকভাবে রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে আমরা যুদ্ধ করে হেরে যাচ্ছি বারবার। এই পরিবর্তন আমরা আমাদের চোখের সামনে ঘটতে দেখছি।

ঢাকার হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে গঠিত জাতীয় পরামর্শক কমিটির এক সদস্য ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের সব কার্যক্রমই ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো বাদ দিয়ে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা এবং আইসিইউ ব্যবস্থাপনা উন্নত না হওয়ায় অনেক রোগী ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছে। গত বছর করোনা সংক্রমণের প্রথম ধাক্কার পর চিকিৎসা ব্যবস্থায় অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু তারপরও যে পরিমাণে বাড়ানো দরকার ছিল তা হয়নি। সম্প্রতি কমিটির সভায় হাসপাতালগুলোতে যথাসম্ভব কোভিড-১৯ রোগীর বেড ও আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ঢাকার বাইরে মেডিকেল কলেজগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে স্থানীয় রোগীদের চিকিৎসার সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশে লকডাউনের পক্ষে-বিপক্ষেও আছে নানামত। ২৯ মার্চ করোনার সংক্রমণ রোধে ‘লকডাউনের’ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছিলেন, দেশের কিছু এলাকায় হয়তো বিভিন্ন টাইপে লকডাউনের ঘোষণা আসতে পারে। আর লকডাউনই সব সমস্যার সমাধান নয় বলে মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ। তার মতে, নিজেরা সচেতন হয়ে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানলেই লকডাউনের কাজ হবে। করোনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আক্রান্তদের আইসোলেশন এবং সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে। টেস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখলেই হাসপাতালে রোগীর চাপ কমবে।
ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে মানুষের চলাচল বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন কোভিড-১৯ বিষয়ক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পরামর্শক কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।

অন্যদিকে, সর্বাত্মক বা আংশিক কোনো লকডাউনই বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ। সম্প্রতি তিনি লিখেছেন, আংশিক বা সর্বাত্মক লকডাউন কার্যকর করতে পারলে সুফল আসে, যদি কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়ানোর পর লকডাউন দিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং উল্টো জনদুর্ভোগ অনেক গুণে বেড়ে যায়। গত বছর টোলারবাগে আংশিক লকডাউন সফল হয়েছিল। কারণ তখন কমিউনিটিতে সংক্রমণ তেমন ছড়ায়নি। কিন্তু পরে রেড জোনভিত্তিক লকডাউন তেমন সফল হয়নি। কারণ তখন রেড-জোন কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।

তার মতে, ঢিলেঢালা লকডাউন অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি এবং মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। তাই সর্বাত্মক কিংবা আংশিক লকডাউন কোনো সুফল বয়ে আনবে না, তা আমরা গত বারের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি। আর দেশব্যাপী লকডাউনের আর্থিক ক্ষতির অঙ্কও কম নয়। তাই আমাদের নিজস্ব আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা বা কলকারখানা এবং অফিস অর্ধেক জনবল দিয়ে পরিচালনা করাও কোনো সমাধান নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি খোলা রেখে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং সর্বাত্মক মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাত ধোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে সুফল আসবে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়