ঢাকার পথে মোদি, বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়ানো ছবি শেয়ার

আগের সংবাদ

বন্ধু‌ত্বের বারতা নি‌য়ে ঢাকায় মোদী

পরের সংবাদ

৫০-এ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২১ , ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২৬, ২০২১ , ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে আজ বাংলাদেশ। ৫০ পূর্ণ করা এক রাষ্ট্র- দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক সংকট আর জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ, এই দেশ কোনো দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কিনা সেই আশঙ্কা ছিল বহু বিশেষজ্ঞের। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, সবার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বীরদর্পে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ আর ২০২১ সালের বাংলাদেশের মধ্যে যে পার্থক্য- তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ৫০ বছরের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ বারবার মুখ থুবড়ে পড়েনি তা কিন্তু নয়। কিন্তু এত সংকটের পরও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এক বিস্ময়কর অগ্রগতির নজির আজ বাংলাদেশ- তা স্বীকার করতে কারো দ্বিধা নেই।

১৯৭১ সাল, বাংলাদেশের জন্মের বছর। স্নায়ুযুদ্ধের দামামা তখন বিশ্বজুড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পক্ষে থাকলে বিপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোভিয়েত কমিউনিস্ট বলয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি পাকিস্তানি জান্তার পক্ষে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর-পাল্টা সোভিয়েত ফ্লিট হাজির বাংলাদেশের পক্ষে। এরকম একটি অবস্থার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে যে কটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তরুণ মুসলিম লীগের কর্মী শেখ মুজিব তা মেনে নিতে পারেননি। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ১৯৪৭ সালের পূর্বে আমরা যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান করেছিলাম, তখন আমাদের স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হব। কিন্তু সাতচল্লিশ সালে বুঝতে পেরেছিলাম আমরা নতুন করে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি শাসন কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে বাঙালির জন্য একটি জাতিরাষ্ট্র গঠন কখনো সম্ভব হবে না। ব্রিটিশদের তড়িঘড়ি করে উপনিবেশ ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা এবং রেডক্লিফের অবদানে যে রাষ্ট্রের জন্ম হলো- সেটা বঙ্গবন্ধুর কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র ছিল না। যে কারণে বাঙালির নিজস্বতা নিয়ে একটি জাতিরাষ্ট্রের সংগ্রাম শুরু পাকিস্তান শুরুর পর থেকেই। দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রাম-আন্দোলনে এই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নকে তিনি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন ধাপে ধাপে। ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ, ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৮ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ সালে ৬ দফা দিয়ে বাঙালির স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার প্রতীক ও অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন শেখ মুজিব। আস্তে আস্তে পুরো জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে গেছেন এক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায়, যার মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১৯ আগস্ট ছাত্রলীগের সম্মেলনে বলেছেন, আমাদের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে ১৯৪৮-৪৯ সালের ধর্মঘট, ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও সত্তরের নির্বাচনে গিয়ে ধাপে ধাপে বাংলার মানুষকে এগিয়ে নিতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু কে ছিলেন? তিনি কি শুধু এই জনপথের একজন রাজনৈতিক নেতা? বাঙালির রাষ্ট্রপিতা? রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী? না বাংলার কোটি শ্রমিক, কৃষক, মুক্তিসংগ্রামী মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতীক? ঢোলা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট পরিহিত আপাদমস্তক এক বাঙালি- যাকে ঘিরে এই বঙ্গের মানুষ স্বপ্ন দেখতে থাকে একটি নিজস্ব ভূখণ্ড পাওয়ার। তাই কোনো সীমারেখায় তাকে কি আবদ্ধ করা যায়?

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন উদার রাজনৈতিক নেতা। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যেমন অনুপ্রাণিত তেমনি চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে নেতাজী সুভাষ বোসের সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তার এই প্রস্তুতিও তিনি নিয়ে রেখেছিলেন। চূড়ান্ত বিবেচনায় লিবারেল এই নেতা সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় অগ্রসর হয়েছিলেন এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্নে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীন রাষ্ট্রে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাকে জীবন দিতে হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রে।

সেই রাষ্ট্রের ৫০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ এই আত্মবিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি যে, একটি রাষ্ট্রহীন জাতিকে যে রাষ্ট্র তিনি দিয়েছেন তা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে। ৫০ বছরের বাংলাদেশ হয়তো হাজার বছরের দিকে এগিয়ে যাবে ইতিহাসের পথপরিক্রমায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ কাউন্সিলে বলেছিলেন, যে চারটি স্তম্ভের ওপর বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন হয়েছে, সেই চারটি স্তম্ভের ওপরই বাংলাদেশ চলবে। এই চার স্তম্ভ হলো- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর সেই আকাক্সক্ষার জায়গায় কতখানি দাঁড়িয়ে আছে, সেই প্রশ্ন আজ ৫০ বছর পর উঠতেই পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিস্ময়কর, কিন্তু ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও কম বিস্ময়কর নয়। সামাজিক সম্প্রীতি লোপ পেয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। সংস্কৃতি আর রাজনীতির এক মিশ্রণই বাঙালির আত্মশক্তি। সেই শক্তি হারিয়ে গেছে রাজনীতির অঙ্গন থেকে। যে দ্বিজাতির তত্ত্বের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম, সেই দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছে। সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন আজ নেই বললেই চলে। মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা যদি না থাকে, তাহলে তো সেটি আর বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হয় না। দারিদ্র্য আর বৈষম্য যদি প্রকট হয় তাহলে তো সেটা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ নয়। সমাজে সমাজে, ধর্মে ধর্মে দ্বন্দ্ব যদি প্রকট হয় তাহলে বলতে হবে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ গঠন করতে পারেনি। তাই বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমাদের আজ এই শপথ নিতে হবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য হয়তো আমাদের আরো একটি সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন হবে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়