রাজধানীর যেসব সড়ক নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধ থাকতে পারে

আগের সংবাদ

বাংলাদেশের কষ্টার্জিত সাফল্য কোনো ‘মিরাকল’ নয়

পরের সংবাদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর

প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২১ , ১২:৩১ অপরাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২৬, ২০২১ , ১২:৩৩ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হলো ২০২১ সালে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উদ্ভাসিত দেশ। একই সঙ্গে জাতির পিতা স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের একশতম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। এ এক অবিস্মরণীয় মিলনমেলা।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণকারী শিশুটির জন্মশতবর্ষ উদযাপন বাঙালির জীবনে দিগন্তবিস্তারী একদিন। এই শিশুর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না এবং একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হতো না। বাঙালির সামনে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী চেতনার বিস্তার হতো না। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মানুষ বীরদর্পে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছিল সাহসী চেতনায়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তিরিশ লাখ শহীদের জীবন উৎসর্গকারী যুদ্ধ নিয়ে এসেছিল গৌরবময় বিজয় অর্জন। এই বিজয় উদ্ভাসিত হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ সঙ্গে করে। হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীনতার স্থপতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ১০১তম জন্মবাষির্কীতে পৌঁছেছেন। দুটো বিশাল ঘটনা নিয়ে এই নান্দনিক উদযাপন বাঙালির গৌরব ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। দুটো ঘটনাই আগামীর বাংলাদেশে ঐতিহ্যের সম্পদ হয়ে চিরজাগরূক থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়াবে অগ্নিশিখার আলো।
১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে তরুণ সমাজের নেতৃত্বে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তান- ‘শেখ মুজিব এসেছে, বাঙালি জেগেছে’। এই স্লোগানে জেগে উঠেছিল বাঙালি-বাংলাদেশ। বাঙালির চেতনায় ফুল ফুটিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই ফুলের সৌরভ ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে।
স্বাধীনতার স্বপ্নে গণমানুষকে উদ্দীপিত করে বাঙালিকে লড়াকু জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে সরকারের দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশ পুনর্গঠনের নানামুখী কর্মকাণ্ড গ্রহণ করতে শুরু করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ভৌত কাঠামো ভেঙে পড়েছে, শরণার্থীরা ফিরে আসতে শুরু করেছে, স্বজন হারানো মানুষের কান্না থামেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে তিনি অস্ত্র জমা নিতে থাকেন। যুদ্ধের সময় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সাহায্য দানের ব্যবস্থা করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করার জন্য রাস্তাঘাট, সেতু, রেললাইন ইত্যাদি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরুর নির্দেশ দেন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হয়। ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করেন। পল্লী বিদ্যুৎ চালু করেন। শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিচালনার ব্যবস্থা করেন। নতুন দেশের যাত্রা শুরুর কাজটি তিনি সুচিন্তিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯৭২ সালের মধ্যে একটি সংবিধান প্রণীত হয়। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল এই সংবিধানের মূলনীতি।
ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল তাঁর জীবন দর্শনের একটি অন্যতম দিক। ছাত্রজীবন থেকে তিনি সাম্প্রদায়িতকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। যে কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় এটি একটি মৌলিক শর্ত। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধলে তিনি দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় রিলিফের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। বিপন্ন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারতের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত। তিনি ১৯৪৩ সাল থেকে ইসলামিয়া কলেজে শিক্ষকতা করতেন। তার ‘ষাট দশক’ শিরোনামের বইয়ে তিনি দাঙ্গার সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন : ‘ইসলামিয়ার ছাত্ররা যে আমাদের জন্য কতটা করতে পারত তার প্রমাণ পেলাম ১৯৪৬-এর রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়। বালিগঞ্জ থেকে ইসলামিয়া কলেজের রাস্তায় পদে পদে বিপদ। এই রাস্তা আমাদের ছাত্ররা পার করে দিত। ওরা বালিগঞ্জের কাছে অপেক্ষা করত আর সেখান থেকে ওয়েলেসলি স্ট্রিটে কলেজে নিয়ে যেত। আবার সেভাবেই ফিরিয়ে দিতে যেত। এখানে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি ইসলামিয়া কলেজের সেসব মুসলমান ছাত্রদের, যারা আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে বিপজ্জনক এলাকাটা পার করে দিতেন। এসব ছাত্রদের একজনের নাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান।’
কিশোর বয়স থেকেই তিনি মানুষের কথা ভেবেছেন। তাদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই বঞ্চিত মানুষদের কথা মনে রেখেই শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করেন। এই লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গঠন করেন নতুন রাজনৈতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’। এই সংগঠনের ছোট নাম হয় ‘বাকশাল’। এর জন্য আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। ‘বাকশাল’কে দ্বিতীয় বিপ্লব বলে উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধু। ‘বাকশাল’-এর মূল লক্ষ্য ছিল চারটি : ক) গণমুখী প্রশাসন খ) গণমুখী বিচার ব্যবস্থা গ) বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম সমবায় ঘ) শোষিতের গণতন্ত্র। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের দারিদ্র্য বিমোচনে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ^যুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর।’ সাধারণ মানুষের জীবনে সমতার জায়গা তৈরিতে তাঁর কত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ছিল। এভাবে তিনি নিজ দর্শনের আলোকে রাষ্ট্রের মৌলিকতায় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা তাঁকে হারালাম।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্বে থাকায় দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যার কর্মযজ্ঞে মহামিলনের যোগসূত্র। বাবা ও মেয়ে দুজনই দেশের জন্য, মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। বাঙালির জন্য উৎসর্গ করা বঙ্গবন্ধুর জীবনের মহিরুহকে ধারণ করেছেন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী তার সামনে আলোকদীপ্ত উৎসব। তিনি নিজে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কর্মযজ্ঞে এগিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। তার শাসনের এক যুগের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি পিতার মহতী চেতনা আত্মস্থ করেছেন জনগণের কল্যাণে, দেশের উন্নয়নে। তার শাসন ব্যবস্থার নানাদিক গণমানুষকে স্বস্তির-শান্তির জীবনযাপন দিচ্ছে।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হয়েছে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ঐতিহ্যিক প্রামাণিক দলিলে সংরক্ষিত হয়েছে। বিশ্বের মানুষের সামনে এ এক গৌরবময় অর্জন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনেকগুলো পুরস্কার লাভ করেছেন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে উজ্জ্বল করেছে। আমরা দেখতে পাই পিতা থেকে কন্যাকে- দেখতে পাই শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনাকে, এভাবে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। অপেক্ষা আগামী দিনের।
পঞ্চাশ বছরের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা পরিবারসহ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু। স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতা গ্রহণ। অন্যদিকে পঞ্চাশ বছর গণমানুষের জীবনে আলোর ঝলক তৈরিতে উন্নয়নের ধারায় অনেক এগিয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী গণজীবনের উজ্জ্বল সমারোহ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়