ফক্স বাটারফিল্ডের ‘শেখ মুজিবের বাড়ি ফেরা’

আগের সংবাদ

প্রতিটি অপরাধের বিচার হোক

পরের সংবাদ

দেশ ত্যাগ ও আমাদের স্বাধীনতা

সুধীর বরণ মাঝি

শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়

প্রকাশিত: মার্চ ২১, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২১, ২০২১ , ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

সুধীর বরণ মাঝি

দেশের স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে হিন্দুরা দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছেন। ধর্মীয় কারণে যদি কোনো ধর্মের মানুষ দেশ থেকে বিতাড়িত হয় তখন শুধু ওই মানুষগুলোই বিতাড়িত হয় না, সঙ্গে বিতাড়িত হয় দেশের মেধা এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিনিষ্ট হয় সম্প্রীতির বন্ধন। ধর্মীয় চেতনায় নয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রচিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। কিন্তু ইদানীংকালে যে হারে একটি মহল সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু (হিন্দুদের) বাড়িঘর, জমাজমি দখল করে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও হিন্দু পরিবারের নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন করছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মূর্তি ভাংচুর এবং তারা ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর শুরু হয়েছে নির্যাতন। বাংলাদেশকে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত করার সব রকম অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ঘটনা এখন প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা উপজেলার নাচনী, চণ্ডীপুর, সন্তোষপুর, সরমঙ্গলসহ কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার হেফাজত অনুসারী শাল্লা উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম নোয়াগাঁয়ে গিয়ে হামলা চালিয়েছে। এর আগেও এ রকম মিথ্যা অজুহাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালিয়ে লুটপাট, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণসহ অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো একটি ঘটনারও সঠিক বিচার কিংবা তদন্ত হয়নি। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের ওপর এই নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে। চলে গেলে জমি থাকলে ভোটÑ এই হলো সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বী সম্পর্কে আমাদের দেশের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ধ্যানধারণা। ১৯৫০ সালে ১ লাখ হিন্দু লোক দেশান্তরিত হয় (ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত)। সেই যে শুরু তা এখনো চলমান। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের দেশ ত্যাগের ধারা অব্যাহত আছে। মাঝেমধ্যে দেশ ত্যাগের ধারা কম থাকলেও তবে চলমান। মাঝেমধ্যে হিন্দু নির্যাতন ও দেশ ত্যাগের পরিমাণ বেড়ে যায়। পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন এমন কোনো দিন নেই যেদিন হিন্দুদের বাড়িঘর, জমাজমি দখল ও হিন্দু পরিবারের নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের চিত্র বা খবর আমাদের চোখে পড়ে না। ইদানীংকালে এ সমস্যা মহামারি আকারে দেখা দিচ্ছে। কোনো রাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং সেই দায় রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। সুযোগসন্ধানীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাছ শিকার করার চেষ্টা করে। রাষ্ট্র একটু সজাগ থাকলেই সংখ্যালঘুদের দেশ ত্যাগ রোধ করা যায়। আমাদের দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা নানা কারণে দেশ ত্যাগ করছে। তার মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতা। একটা সময় এদেশে হিন্দু-মুসলমান প্রায় সমান সমান ছিল। কিন্তু নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে বর্তমানে তা ১০ শতাংশে এসে নেমেছে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। একদল কুচক্রী লোক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে নির্যাতন এবং সম্পদ দখলের একধরনের উর্বর পরিবেশ তৈরি করে। এরা বরাবরই বিচারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ভোক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পায় আবার কোথাও মামলা করলে জান ও মাল উভয়ই হুমকির মুখে পড়ে। হিন্দুদের সম্পদ লুট করার ক্ষেত্রে দলীয় কোনো মতভেদ থাকে না, তখন সবাই এক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সুইজারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’ বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হলে আগামী প্রজন্মের মাঝে অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত চেতনার বীজ বপন করতে হবে। যেই দেশের নাগরিক ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, শিক্ষার অধিকারের জন্য জীবন দিতে পারে, সেই দেশের মানুষ আর যাই হোক সাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে পারে না।

শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়

হাইমচর, চাঁদপুর।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়