প্রতিটি অপরাধের বিচার হোক

আগের সংবাদ

দেশ ত্যাগ ও আমাদের স্বাধীনতা

পরের সংবাদ

ফক্স বাটারফিল্ডের ‘শেখ মুজিবের বাড়ি ফেরা’

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: মার্চ ২০, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২০, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

‘নয় মাস আগে গ্রেপ্তারের পর শেখ মুজিবুর রহমান এই প্রথম বিজয়ীর বেশে তার নিজের দেশে প্রত্যাবর্তন করলে উপস্থিত ৫ লাখ মানুষ আনন্দ-কোলাহলে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।’
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে ফক্স বাটারফিল্ড নিউইয়র্ক টাইমসের জন্য যে প্রতিবেদন রচনা করেন তার শুরুটা ছিল এমনই। ১১ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের জন্ম ও শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানো বিবেকবান আমেরিকান জনগণ উল্লসিত হয়, যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরকার দাপ্তরিকভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কেবল বিরোধিতাই করেনি, পাকিস্তানের সামরিক যন্ত্রের অমানবিক নিপীড়নকে সমর্থন করেছে, সমর-সম্ভার পাঠিয়েছে, সপ্তম নৌবহরের হুমকি দিয়েছে। যদি সে দেশে শান্তিকামী জনতা ও জাগ্রত গণমাধ্যমের প্রতিরোধ সৃষ্টি না হতো যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম আচরণের পূর্ণ প্রতিফলনই ঘটত বাংলাদেশ নামের রক্তাক্ত প্রান্তরে।
হার্ভার্ডের মেধাবী ছাত্র ফক্স বাটারফিল্ড তার পরিবার ও স্বজনদের প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষকতা ও গবেষণার দিকে না গিয়ে বেছে নিলেন সাংবাদিকতা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন; ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে পেন্টাগনের গোপনীয় দলিল ফাঁস করেছেন, রাষ্ট্রীয় মামলা মোকাবিলা করেছেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন। চীন নিয়ে বই লিখে পেয়েছেন নন-ফিকশনের ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড। একাত্তরে তার বয়স ছিল ৩১ বছর; এখন একাশি। তার ১১ জানুয়ারি প্রতিবেদনের বাকি অংশ ভাষান্তরিত হলো :
শেখ মুজিব যখন ব্রিটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের কমেট জেট থেকে নেমে এলেন, উৎফুল্ল জনতা তার ওপর ফুল ছিটিয়ে দিল; জয় বাংলা ধ্বনি মুখরিত হয়ে উঠল। কমেট জেট তাকে দিল্লি থেকে নিয়ে এসেছে।
শেখ মুজিব ক্লান্ত কিন্তু সংবর্ধনায় তাকে উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল। পরে ঢাকা রেসকোর্সে বিশাল জনসমাবেশে বললেন, ‘আমার জীবনের লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলা আজ স্বাধীন।’ কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো একটি বন্ধন রাখার জন্য তাদের অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ঐক্যের দিন শেষ হয়ে গেছে।

কূটনীতিবিদদের সম্ভাষণ
মাথার ওপর থেকে ফুলের পাপড়ি ঝেড়ে শেখ মুজিব বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর গার্ড অব অনার পরিদর্শন করলেন। পূর্ব পাকিস্তানে তার অনুসারীরা যে দেশকে বাংলাদেশ ঘোষণা করেছিলেন, ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যদিও কেবল দুটি দেশ ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাদের প্রতিনিধি উপস্থিত রয়েছেন শেখ মুজিব ঢাকার কূটনৈতিক কোরের সব সদস্যকে সম্ভাষণ জানিয়েছেন।
আমেরিকার কনসাল জেনারেল হার্বার্ট ডি স্পিভাক কিছুটা মাথা নুইয়ে বাংলাদেশি নেতার সঙ্গে করমর্দন করলেন, বললেন, ‘ঢাকায় ফিরে আসায় আপনাকে স্বাগতম’, শেখ মুজিব সহাস্যে জবাব দিলেন আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। স্পিভাক জানালেন তিনি তার ব্যক্তিগত পরিচিতির কারণে আমন্ত্রিত হয়েছেন, তার আগমনের কোনো রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। বাঙালি-আমেরিকান সম্পর্ক ভালো নয়।
শেখ মুজিবের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা আজকের উৎসবে যোগ দেননি কারণ আবেগ ও স্নায়ুচাপে তিনি বিচলিত ছিলেন এবং কথা বলতে পারছিলেন না। গত শনিবার মুক্তির আগ পর্যন্ত শেখ মুজিব দেশদ্রোহিতার অভিযোগ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। আজকের উজ্জ্বল সূর্যালোকে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব তার বিশাল শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে অনুরোধ রাখলেন, বাঙালিদের স্বাধীনতা আন্দোলন রুখে দাঁড়াতে গত ৯ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, তারা যেন এর প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা না করে।
তিনি উচ্চস্বরে জনতার উদ্দেশে বললেন, ‘তাদের ক্ষমা করে দিন।’ আজ আমি কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ চাই না। আর হত্যাকাণ্ড ঘটানো যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাংলায় বাঙালিরা খাবে, হাসবে, গাইবে এবং সুখে থাকবে। বাংলায় যারা বাস করেন তাদের সবাই এখন থেকে বাঙালি, আমরা এক সঙ্গে বসবাস করব।’
তার আপিলে কুড়ি লাখ বিহারি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়েছে। ভারত থেকে আসা এই অবাঙালিরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনুকূলে কাজ করেছে।
বাঙালি কর্মকর্তারা অনুমান করে বলেছেন ৫ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল রেসকোর্সে এবং এয়ারপোর্ট থেকে দেড় মাইল রাস্তায় আরো ১ লাখ মানুষ। তবে শেখ মুজিব আগে একাধিক সভায় যখন ভাষণ দিয়েছেন সে তুলনায় উপস্থিতি কম।

এখনো অনেকেই গ্রামে, শহরে ফেরেনি
অনেক বাঙালি বিশ্বাস করেন জনসমাগম কম হবার কারণ যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং যুদ্ধের সময় যারা পালিয়ে নিজ গ্রামে চলে গিয়েছিল তাদের ফিরে না আসা।
ফুল বিছানো যে ট্রাকে শেখ মুজিব উঠেছিলেন এবং এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে জনতার মধ্য দিয়ে তা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছে এবং তারা স্লোগান দিয়েছে : শেখ মুজিব জিন্দাবাদ। হাজার হাজার কণ্ঠস্বর গেয়ে উঠেছে : পৃথিবীতে একটি নতুন দেশ এসেছে- বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! নতুন এক বাদ এসেছে মুজিববাদ! মুজিববাদ!
উদ্দীপিত অনেক দর্শক তাদের নেতাকে স্পর্শ করতে চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ পুলিশ বেষ্টনী ভেঙে তার কাছে পৌঁছে তাকে দীর্ঘ আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে।
শেখ মুজিব দীর্ঘদিন ধরে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত প্রিয় নেতা। তিনি যে পার্টির প্রধান সেই আওয়ামী লীগ ১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতে বিজয়ী হয়েছে। শেখ মুজিব যখন পাকিস্তানের পূর্বাংশের জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান প্রথমে পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলেন এবং বাঙালির আন্দোলন দমন করতে ২৫ মার্চ তার সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিলেন। এক কোটি মানুষ ভারতে পালিয়ে গেল, গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

বাঙালির বন্ধু
৫১ বছর বয়স্ক শেখ মুজিব বাঙালির তুলনায় লম্বা, পুরু গোফ, মাথা ভরা পাকতে শুরু করা চুল, তাকে সাদরে আজ বলা হলো বঙ্গবন্ধুÑ বাঙালির বন্ধু। বোতামবন্ধ উঁচু গলার কালো স্যুট ছিল তার পরনে ১টা ৪৫ মিনিটে উড়োজাহাজ ঢাকায় অবতরণ করার পর তাকে প্রথম যিনি সম্ভাষণ দিলেন তিনি গেরিলা লিডার খসরু নামে পরিচিত, তার পরনে সেনা কমব্যাট ড্রেস কোমরের নিচে ঝুলানো পিস্তল। সহস্র মানুষ প্রহরা ভেঙে উড়োজাহাজের দিকে ছুটে গিয়ে শেখ মুজিবকে ঘিরে ফেলল। তিনি ১০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন, নামতে পারলেন না।
রেসকোর্সে শেখ মুজিব বিশাল জনসমাবেশকে জানালেন পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর কারাগার থেকে মুক্তির আগে তাকে অনুরোধ করেছেন, যে কোনোভাবেই হোক পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখতে যেন চেষ্টা করেন।
শেখ মুজিব সে কথা স্মরণ করে বললেন, ‘আমি কিছু বলিনি’। কিন্তু এখন আমি আপনাদের বলি বাংলাদেশ স্বাধীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণকে সুখে থাকতে দিন। দেশের (পাকিস্তানের) ঐক্যের দিন ফুরিয়ে গেছে।

কথাই আইন
শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা এমনই পর্যায়ের যে তার কথাই বহু বাঙালির কাছে আইন। মন্ত্রিসভায় তার অনুসারীদের কারোই তার জনপ্রিয়তা ও মর্যাদার একাংশ না থাকার কারণে সব সিদ্ধান্ত তার প্রত্যাবর্তনের জন্য রেখে দেয়া হয়েছে। তার ফিরে আসার জন্য রেখে দেয়া এমন বিষয়গুলো একটি হচ্ছে ১ লাখ বা তার বেশি গেরিলা যোদ্ধাকে কেমন করে নিরস্ত্র করা এবং কেমন করে কুড়ি লাখ বিহারিকে রক্ষা করা। তাকে দিয়ে আশা করা হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে দেবেন, ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় অংকের বিদেশি সাহায্য আনতে পারবেন। দাপ্তরিকভাবে হিসাব করা হয়েছে পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন হবে, যা এই অঞ্চলের বার্ষিক উৎপাদন ৪ বিলিয়ন ডলারের তিন-চতুর্থাংশ।
পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে তিনি অসীম আনন্দ লাভের কথা বলেন, এন্থনি লুইস লিখেছেন সে কথা: ‘গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ, আমার দেশবাসীর সঙ্গে স্বাধীনতার অসীম আনন্দ ভোগ করার জন্য আজ আমি মুক্ত’- এই বলে তিনি লন্ডনের সংবাদ সম্মেলন শুরু করলেন। আমরা এক মহাকাব্যিক স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের সংগ্রামের চূড়ান্ত অর্জন স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ যে দেশের জনগণ আমাকে তাদের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে।

ফক্স বাটারফিল্ডের জন্ম ৮ জুলাই ১৯৩৯, যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ল্যাঙ্কাস্টার শহরে। তার বাবা লাইম্যান হেনরি বাটারফিল্ড ছিলেন একজন ঐতিহাসিক। তিনি তিন দশকের বেশি সময় নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সায়গন, টোকিও, হংকং, বেইজিং বস্টনে পত্রিকার ব্যুরো চিফ ছিলেন। ১৯৯০ সালে হার্ভার্ড ল’ রিভিও জার্নালে তিনি লিখেছেন প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হবে বারাক ওবামা। মার্কিন সাংবাদিকতার ‘দ্য বাটারফিল্ড এফেক্ট’ একটি পরিচিত বিশ্লেষণ। এটি তার নামেই আরোপিত। তিনি অপরাধের কঠোর সাজার পক্ষে গিয়ে অনেক লিখেছেন। সাজা বেশি হলে অপরাধীরা জেলে থাকে। জেলের কয়েদি সংখ্যা বাড়তে থাকে, তবে অপরাধ কমে- এটাই বাটারফিল্ড এফেক্ট। ফক্স বাটারফিল্ড নিউইয়র্ক টাইমস এবং ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনে একাত্তর ও বাহাত্তরে বাংলাদেশ প্রাসঙ্গিক কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়