এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

আগের সংবাদ

রমজানকে সামনে রেখে সক্রিয় বাজার সিন্ডিকেট

পরের সংবাদ

বিশ্ব মঞ্চের প্রতিপাদ্য হোক

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন

এম আতহার নূর

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: মার্চ ১৮, ২০২১ , ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ১৮, ২০২১ , ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

এম আতহার নূর
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বিংশ শতাব্দীর নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে যিনি বিশ্বনন্দিত হয়ে বিশ্ববন্ধুর স্বীকৃতি পেয়েছেন, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রতি বছরের মতো বাঙালি জাতি যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তার জন্মদিন উদযাপন করলেও এবারে দিবসের প্রতিপাদ্য রূপে বাঙালি জনগণের চাহিদা একটু ভিন্ন ও বিশ্লেষিত। কারণ ১৭ মার্চ ২০২০ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকার মুজিববর্ষের যে ডাক দিয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বনেতাদের হাত ধরে শেষ হতে যাচ্ছে। শিশুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপার ভালোবাসা ও অপূর্ব মমত্ববোধের কারণে ১৭ মার্চ ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। শিশুকালে ‘খোকা’ নামে পরিচিত এই শিশুটি পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেন বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি। যার কাছে ছিল আকাশচুম্বী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ ও জনগণের প্রতি অসাধারণ মমত্ববোধ। ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।
১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বাবা তাঁকে বাধা দেননি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, তাঁর বাবা বলেছিলেন, ‘বাবা রাজনীতি করো, আপত্তি করব না। পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ, এ তো সুখের কথা; তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ ‘sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ.-২৯) পরবর্তীতে এই ‘খোকা’ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা ও পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের সেই ভাষণ সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৭ মার্চের সে ভাষণ ছিল আমাদের পাথেয়, যা আজ ইউনেস্কোর ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের কথা। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৪৫ মিনিট বক্তৃতার শেষে সভাপতি নিজেই যখন দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছেন, তখন স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক ও প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বিপুলভাবে করতালি দিয়ে আলিঙ্গন করে অভিনন্দিত করেছেন বঙ্গবন্ধুকে। অভাবনীয় ছিল সেই দৃশ্য! বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেছিলেন, ‘সত্যি তোমরা গর্বিত জাতি।’ এখন কি এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, বিশ্বের ৩০ কোটি মানুষের বাংলা ভাষা জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে? নিশ্চয় বঙ্গবন্ধুর এটি অপ্রকাশিত স্বপ্ন ছিল।
বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল, রুচিশীল, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আঁকতে চেয়েছিলেন, যেখানে থাকবে না ঘুষ-দুর্নীতি, অনাচার, কুসংস্কার ও ধর্মীয় মতভেদ। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাঙালিকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি সর্বত্রই একটি কথা বলি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, মাটি থেকেও গজাবে না। গড়তে হবে নিজকে, দেশের জন্যে, দশের জন্যে।’ ৭১-এর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো ভেঙে পড়া একটি রাষ্ট্রের করুণ অবস্থা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সেই সময় যখন সমস্যার কোনো অন্ত ছিল না, অর্থনীতির অবস্থাও ছিল ভঙ্গুর। এমতাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্বে বিভিন্নমুখী কার্যক্রম নিয়ে দাঁড়িয়েছিল একটি সুন্দর গন্তব্য অভিমুখে। এক টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। দারিদ্র্য যেন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেধাবীদের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’ এ উপলব্ধিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য তিনি ১৯৭২ সালে শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন এবং ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন পাস করেন। ব্যাপক সংখ্যায় প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, নতুন বিদ্যালয় স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে তিনি সামরিক খাতের থেকেও শিক্ষা খাতে ৭ শতাংশ বেশি বরাদ্দ দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মত প্রকাশের অধিকার এবং প্রেস মিডিয়ার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। মূলত তিনি আত্মনির্ভরশীল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন- মানুষ দুবেলা আহার পাবে, মাথার ওপর চাল থাকবে, শিক্ষিত হবে, সব মানুষের কর্মসংস্থান ও সুস্বাস্থ্য থাকবে এবং সমাজে সংহতি থাকবে। স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কার্যত উপেক্ষিতই রয়ে গেছে, আর তা হলো বাংলাদেশের গ্রাম। গ্রামই বাংলাদেশ, দেশের অধিকাংশ মানুষের বাস গ্রামেই, অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি। বঙ্গবন্ধু কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্যঘাটতি দূরীকরণে সৃজনশীল বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এ জন্যই ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষিকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এভাবে তিনি একটি ধ্বংসস্তূপকে প্রত্যেকটি খাতে উন্নয়ন সাধন করার মাধ্যমে একটি ফুল বাগানে রূপান্তর করতে চেয়েছিলে। এবং এই কৃষি ও গ্রামকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত; এখনো পারে। কীভাবে? বিখ্যাত গ্রন্থ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও বাংলাদেশের গ্রাম (ইস্টার্ন একাডেমিক, ঢাকা ২০১৭) গ্রন্থে এ কথা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলাম।
সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায়Ñ যেখানে ঘুমিয়ে আছো, শুয়ে থাকো বাঙালির মহান জনক তোমার সৌরভ দাও, দাও শুধু প্রিয়কণ্ঠ শৌর্য আর অমিত সাহস টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামগুলো তোমার সাহস নেবে নেবে ফের বিপ্লবের দুরন্ত প্রেরণা। সুতরাং বঙ্গবন্ধু কেবল একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। এই মানবপ্রিয় ব্যক্তির বর্ণাঢ্য জীবন, ইশতেহার ও তাঁর স্বপ্নের প্রতিটা বিন্দু বাঙালি জাতির সম্পদ।
অতএব বঙ্গবন্ধুকে দলীয়করণের সংস্কৃতি ও দল পরিচয়ে তুলে ধরার প্রয়াস বন্ধ করতে হবে। কোন দলের হয়ে তিনি সরকারে ছিলেন, এমনটি বিবেচনা করা যাবে না। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে এই সত্যটি মেনে নিয়েই এগোতে হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারে এসেও বঙ্গবন্ধুর পরিচয় তুলে ধরতে হচ্ছে বারবার, কেন এই ইতিহাস বিস্মৃতি? বঙ্গবন্ধু সবার। এই বাংলার প্রতিটি অণুতেই বঙ্গবন্ধু জেগে আছেন।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়