বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম চিরকাল বাঙালি জাতিকে পথ দেখাবে

আগের সংবাদ

যুদ্ধের ছাই-ভস্ম থেকে সমৃদ্ধির পথে

পরের সংবাদ

অভিবাদন জাতির পিতা

হারুন হাবীব

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও চিন্তাবিদ

প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২১ , ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ১৭, ২০২১ , ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ রাষ্ট্র যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে, ঠিক একই সময়ে আমরা উদযাপন করছি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মজয়ন্তীর শেষ অনুষ্ঠান। এই দুটি মহালগ্ন এসেছে জাতীয় আশীর্বাদ হয়ে। স্বীকার করতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডটি ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফসল। সেদিনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম প্রধান দেশগুলোর বেশির ভাগ পাকিস্তানের বিভক্তি সমর্থন করেনি। সমর্থন করেনি গণচীনও। এরা প্রায় সবাই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে নির্বিচার গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতন সমর্থন করেছে, তথাকথিত রাষ্ট্রস্বার্থ ও ধর্মরক্ষার নামে! অতএব দেশি-বিদেশি চক্রান্তের ফসল হিসেবে, বিশ্বাসঘাতক কিছু রাজনীতিকের যোগসাজশে, সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটে নিহত হতে হয় বঙ্গবন্ধুকে। প্রাণ হারাতে হয় তাঁর পরিবারের নিকটতম সদস্য ও আত্মীয়দের।
বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন শুদ্ধতম জাতীয়তাবাদী, একদিকে খাঁটি বাঙালি অন্যদিকে আধুনিক মানুষ, যিঁনি পাকিস্তানি স্বৈরতন্ত্রের ২৩ বছরে মধ্যে ১৩ বছরেরও বেশি সময় কারারুদ্ধ থেকেছেন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসককুলের চরম নির্যাতনী আচরণেও তিনি ভাঙেননি, মোচড়াননি, পরাজিত হননি। নেতাজি সুভাষ বসুর পর তাই তিনি হয়ে ওঠেছিলেন বাংলার অবিভাজিত নিষ্কলুষ যৌবন-শক্তির প্রতীক; মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানের প্রাণের মানুষ, মনের মানুষ; সব ধর্ম, সব বর্ণের অধিকার বঞ্চিত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও সাহসের প্রতীক। আমার উপলব্ধিতে শেখ মুজিব ধারণ করেছিলেন তিতুমীরের অমিত বিক্রম, মহাত্মা গান্ধীর সহিষ্ণু শান্তিবাদ, রবীন্দ্রনাথের প্রেম এবং সর্বভারতীয় সেনাপতি নেতাজি সুভাষের অসামান্য সাহস।
বঙ্গবন্ধু সব সময়েই বলতেন, বাংলাদেশ এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে, কেউ তাকে ধ্বংস করতে পারবে না। কারণ ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। লাখো নারীর সম্ভ্রম বৃথা যেতে পারে না। এর পরও কথা থাকে। বঙ্গবন্ধু কখনো কি ভেবেছিলেন কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারে তাঁরই সৃষ্ট বাংলাদেশে? কখনোই কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর এই বাংলাদেশে আবারো পাকিস্তানি ভাবধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস দানা বাঁধবে?
অতএব বাস্তবতা হচ্ছে এই, বাংলাদেশবিরোধীরা বসে নেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৫০ বছরে পদার্পণ একটি বড় ঘটনা। যারা মনে করেন রাষ্ট্রের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিপদের মাত্রা কমতে শুরু করেছে, আমি তাদের সঙ্গে সহমত নই। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিপদের সত্যিকার স্বরূপ বুঝতে হলে একদিকে যেতে হবে বঙ্গবন্ধুর কাছে, একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কাছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম পুরুষ, যাঁর অতুলনীয় নেতৃত্ব পরাধীন জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল, যাঁর অসীম প্রেরণা বাঙালির জাতীয় শক্তি ও সাহসের উৎস হয়েছিল, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে, মৃত্যুর এতকাল পরও, কেন আঘাত করার চেষ্টা হয়?
স্মরণযোগ্য, পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র-কাঠামো ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব এক ঐতিহাসিক এবং সফল জনবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন- যা জন্ম দিয়েছে স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্রের। সেই গণবিদ্রোহ এতটাই সার্থক ছিল যে, একদিকে তা শোষণ-বঞ্চনা ও স্বৈরতন্ত্রী পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙেছে, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক আধুনিক একটি রাষ্ট্রকে সাংবিধানিকভাবে ভিত্তি দান করেছে। ভুললে চলবে না, ১৯৭২-এর রাষ্ট্রীয় সংবিধান অনুযায়ী বিশ্বের গোটা মুসলিম প্রধান জনপদের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
বঙ্গবন্ধু যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন ধর্ম ব্যক্তি জীবনের বড় অবলম্বন; কিন্তু রাষ্ট্র ধর্ম-বর্ণ, ছোট-বড় নির্বিশেষ সকলের সমান অধিকার ক্ষেত্র। রাষ্ট্রপিতা এটিও উপলব্ধি করেছিলেন, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি ধর্মের ঔদার্যকেই কেবল খর্ব করে না, রাষ্ট্রকেও সীমিত করে। তাই একজন খাঁটি ধর্মানুসারী হয়েও ধর্মের রাজনীতিকে সমর্থনের কারণ তিনি খুঁজে পাননি। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে স্বদেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক-হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’
এই ঘোষণা বাস্তবায়নের পথে তিনি যখন মনোনিবেশ করেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন নতুন করে গড়ে তুলতে আরেক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে হত্যা করা হয়।
আরো একটি বিষয় অনুধাবন করা সঙ্গত হবে। দ্বিজাতিতত্ত্বের অনুসারীরা কখনোই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা গ্রহণ করেনি। বাঙালি যখনই অসাম্প্রদায়িক জাতীয় গৌরব নিয়ে সামনে এগিয়েছে, বিরোধীরা তখনই ‘ধর্ম গেল’ বলে চেঁচিয়েছে। তাদের শোরগোলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী কমবেশি বিভ্রান্ত হয়েছে। অথচ পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাঙালি কখনো ধর্মচ্যুত হয়নি, বরং ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করেই তার অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার গৌরবকে দৃঢ় করেছে। হোক সে ধর্মগতভাবে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ, বাঙালি ধর্মকে কখনো জাতি বিভাজনের অস্ত্র বানায়নি।
ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তি ও উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক হানাহানির আলোকে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিব যথার্থই বুঝেছিলেন, ধর্ম কিংবা সামরিক বাহিনীকেন্দ্রিক রাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রতারিত করবে, কাজেই এর বিরুদ্ধে লড়াই করা ছিল তাঁর যোগ্যতম রাজনীতি। এই উপলব্ধিতে তিনি যখন বাংলাদেশ সৃষ্টির নেতৃত্ব দিলেন, তখন ধর্ম ও বর্মবাদী রাজনীতির কুশীলবরা ভীত হলো। তারা নিজেদের আদর্শ নিয়ে অগ্রসর হলো না, তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কৌশল আঁটল। সফলও হলো।
কিন্তু হত্যাকারীদের দুর্ভাগ্য যে, ১৯৭৫-এর রক্তপাতের পর থেকেই হত্যাকারীদের মুখোশ উন্মোচন হতে থাকল। সদ্য-স্বাধীন দেশে তারা পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে স্বচেষ্ট হলো। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাসিক্ত রাষ্ট্রীয় সংবিধানকে কাটছাঁট করা হলো, রাষ্ট্রকে আবারো সাম্প্রদায়িক বানানো হলো। সেই থেকে শুরু হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পেছন যাত্রা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক অগ্রসরতার শুরু ১৯৭৫-এর রক্তপাতের পর তা পেছনযাত্রা শুরু করল! ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশকে একটি নতুন পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা চলল! বাংলাদেশ, পূর্বেকার পূর্ববাংলা এমন এক জনপদ যেখানে জাতি-ধর্মের সম্মিলিত প্রয়াসেই কেবল মৌল জাতীয় অর্জন সাধিত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি মাথা তুলেছে তখনই বিপন্নতা গ্রাস করেছে। আজ যখন মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বাতাস দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে শুভবুদ্ধি ও স্বাধীন সংস্কৃতিচর্চাকে ধ্বংস করতে উদ্যত, তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি বক্তব্য খুব বেশি মনে পড়ে। এই মনীষী উচ্চারণ করেছিলেন, সেই ১৯৪৮ সালে : ‘এই অঞ্চল যেমন বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমানের স্মারকলিপি হয়ে আছে, প্রার্থনা করি তেমনই এ যেন নতুন রাষ্ট্রে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের মিলনভূমি হয়। আমিন। আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনি রাজনীতিকে মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক আবর্ত থেকে উদ্ধার করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ধারায় প্রবাহিত করেছিলেন। ১৯৭০-এর দশকের বাঙালি মানসে যে অভূতপূর্ব দেশপ্রেম, তা ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে অভাবিত উজ্জীবিত করার; আগে যা সম্ভব হয়নি এবং যেটা সম্ভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিপদের স্বরূপ বুঝতে হলে প্রভাবশালী কিছু আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এই মহল পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে নীরব ভূমিকা পালন করেছিল। তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনকের হত্যাকারীদেরও সুরক্ষা দিয়েছিল; সামরিক ও আধাসামরিক শাসকরাও এই আন্তর্জাতিক মহলের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল!
বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ওপর আঘাত চলতে থাকে প্রায় দুই যুগ। ধারাবাহিক এবং পরিকল্পিত এই আগ্রাসনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র অনেকটাই পথভ্রষ্ট হয়েছিল, বিভাজিত হয়েছিল, নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রতারিত হয়েছিল, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের গৌরব খণ্ডিত করা হয়েছিল। কিন্তু সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চৈতন্যের ব্যাপ্তি বা অন্তর্নিহিত শক্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়। কাজেই তাদের সাফল্য স্থায়ী হয়নি। ইতিহাসের ঘাতকদের প্রতিরোধ করতে ইতিহাসেরই নিজের শক্তি থাকে, যা ইতিহাসশূন্যরা উপলব্ধি করে না। অতএব ইতিহাস আপন শক্তি নিয়ে মাটি খুুঁড়ে বিকশিত হয়েছে; বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ আবারো স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বা তাদের সমর্থক-অনুসারীদের আলাদা করে দেখার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। যে নামেই আবির্ভূত হোক না কেন, এরা যে কোনো না কোনো উপায়ে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে উৎখাত বা আঘাত করতে বদ্ধপরিকর। সে কারণেই জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এখন প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় শক্তির সম্মিলন। কারণ এ উদযাপন কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এ উদযাপন বাংলাদেশের স্বাধীনতাপন্থি সকলের।
অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে তার জনকের হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি যেমন জাতীয় দায়মুক্তির, তেমনি দায়মুক্তির মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতার দোসর হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্যতম অপরাধ করেছে, নির্বিচার গণহত্যা ও নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে, অপহরণ ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে লাখো নিরস্ত্র মানুষকে, সেই সব শীর্ষ অপরাধীর বিচার সম্পন্ন করা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই বড় কাজ দুটির সম্পাদনই কি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে সুরক্ষা দান করবে?
আমার বিশ্বাস- না। এই দুই কাজের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সামনে এগোবার সিঁড়ি ফিরে পেয়েছে মাত্র, যে সিঁড়ি সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। অতএব আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। সে কারণেই আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের যাত্রাপথ অবারিত করতে প্রয়োজন একটি রেনেসাঁ, একটি নবজাগৃতি, একটি সাংস্কৃতিক নবজাগরণ, যা সাম্প্রদায়িকতার গ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করবে, মানবিক করবে, সেøাগানের রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে যুবতারুণ্যকে মানুষ করবে, বাঙালি করবে।
উনিশ শতকের বাংলায় রেনেসাঁর সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন রাজা রামমোহন, বিশ শতকের প্রথমার্ধে যা শেষ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। সময়ের বিচেনায় সংস্কার হয়েছে বোধ ও বুদ্ধির, জেগে উঠেছে মানুষ কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে, নবযাত্রা শুরু হয়েছে মঙ্গলের পথে। নবজাগৃতির সেই অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী, বিজ্ঞানীসহ প্রায় সকল শ্রেণির সাহসী মানুষ। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশেও একটি নবজাগরণ প্রয়োজন, যা এগিয়ে নেবে সব শ্রেণির মানুষ, যারা এগোবে সত্যের পথে, এগোবে কল্যাণের পথে।
ইতিহাসের সত্য অনুধাবন করা জরুরি যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, যা সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে একাত্ম করে জাতীয় স্বাধীনতার ময়দানে নামিয়েছিল, তা ছিল এই জনপদের মানুষের এক নবজাগৃতি। যদিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথ ধরেই সেদিনের নবজাগৃতি বিকশিত হয়েছিল, তথাপি অনস্বীকার্য যে তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল বাংলার আবহমান সংস্কৃতি শক্তি- যার ভিত্তিমূলে ছিলেন লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও সুকান্ত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের হটিয়ে পূর্ববঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ ছিল না, একই সঙ্গে ছিল ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এই ভূখণ্ডের অধিকারহীন মানুষের মুক্তির যুদ্ধ। কিন্তু সে স্বপ্নপূরণ সম্ভব হয়নি। পাল্টা আঘাত এসেছে। সাতচল্লিশের দৈত্য একাত্তরের চেতনাকে পর্যুদস্ত করেছে, কূপমণ্ডূকতার পুনরাভিযান ঘটেছে, ধর্মব্যবসায়ীদের নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, প্রগতির বিরুদ্ধবাদীদের পুনর্বাসন করা হয়েছে, এমনকি সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রধর্মবাদের পুনরাভিযান সফল করা হয়েছে।
১৯৭১-১৯৭৫ থেকে গেল পাঁচ দশকের ঘটনাপ্রবাহ দেখে আমার মনে হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের পুনরুদ্ধারকৃত চেতনার নবযাত্রাকে নিষ্কণ্টক করতে হলে রাজনীতির কুশীলবদের আদর্শিক বা সাংস্কৃতিকভাবে স্বশস্ত্র হতে হবে। অনুধাবন করতে হবে যে, পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে যে শত্রু ছিল চিহ্নিত এবং দূরের, তারা বেশির ভাগই আজ অচিহ্নিত এবং কাছের। অতএব অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন যাত্রাপথ চিহ্নিত করতে হবে। সে কারণেই প্রয়োজন আদর্শিক ও ত্যাগী কর্মী, যারা বঙ্গবন্ধু ও জয়বাংলাকে কেবল কণ্ঠে নয়, আত্মায় ধারণ করার সামর্থ্য অর্জন করবেন।
আমার মনে হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠান সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ আগের চেয়ে কম নয়। বরং এই চ্যালেঞ্জ আজ নতুন আঙ্গিকে, নতুন মাত্রায় সমাসীন। এই চ্যালেঞ্জ যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক। কারণ স্বাধীনতার প্রতিপক্ষরা কিছুতেই এ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল দেখতে চাইবে না; গজিয়ে ওঠা ‘নব্য পাকিস্তানিরা’ লাখো শহীদের রক্তে গড়া বাংলাদেশকে ব্যর্থ করতে চাইবে; একাত্তরের পরাজয়ের শোধ নিতে চাইবে। কাজেই প্রয়োজন সতর্কতার; প্রয়োজন নবজাগৃতির যে ডাক তাকে এগিয়ে নেয়ার সামর্থ্য।
সকলেই জানি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে সরকারবিরোধীদের অবাধ কার্যক্রম জরুরি। এছাড়া রাষ্ট্র আধুনিক হয় না, মানবিক হয় না। কাজেই নির্বাচনী সততা ও স্বচ্ছতার বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তি সমন্বয়ে যে মোর্চা তারা রাষ্ট্রের মৌলিক ইতিহাস ও চেতনার পরীক্ষিত প্রতিপক্ষ এবং একই সঙ্গে তারা প্রতিপক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের, রাষ্ট্রের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের। কাজেই যে বাংলাদেশ লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত, যে বাংলাদেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার প্রাপ্তিকে ছিনতাই করা হয়, যে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা হয় সাতচল্লিশের চেতনায়, সেই বাংলাদেশের হৃতগৌরব উদ্ধারে সাহসী নেতৃত্ব ইতিহাসের আশীর্বাদ বৈকি।
অতএব চলমান যুদ্ধকে কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে এগিয়ে নিতে হবে; মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে হবে; মনে রাখতে হবে যে, ধর্মান্ধ অপশক্তির সঙ্গে আপস করার মতো ভুল আত্মঘাতী হবে। ভুললে চলবে না, অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার শত্রুরা প্রাথমিকভাবে পরাজিত হলেও নানা কৌশলে তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে নেমেছে। কাজেই এ আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
জাতির জনক চেয়েছিলেন বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক, সমাজতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশকে আবারো মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। অতএব নতুন যুদ্ধে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আর সে কারণে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে চাই এক রেনেসাঁ, একটি নবজাগৃতি, যা কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে, মুক্ত-উদার ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের স্বার্থে জনগোষ্ঠীকে সশস্ত্র করবে, সঙ্ঘবদ্ধ করবে এবং সফল করবে।

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও চিন্তাবিদ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়