প্রতিকূলতা জয়ের দৃষ্টান্ত হলেন শিশির ও মৌ

আগের সংবাদ

করোনার এক বছর: আবারও সংক্রমণ বাড়ায় চিন্তিত সবাই

পরের সংবাদ

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

বিবৃতি ও মানববন্ধনেই কি দায় শেষ

প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২১ , ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ৮, ২০২১ , ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নারী আন্দোলনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও প্রাচীন। র সূচনা হিসেবে অবশ্য কোনো সুনির্দিষ্ট দিন তারিখ বা সাল উল্লেখ করা প্রায় অসম্ভব। সারা পৃথিবীর নারী আন্দোলনের বাতাস এ অঞ্চলেও প্রবাহিত হয়েছে। বই-পুস্তক ঘেঁটে এবং বিশিষ্টজনের লেখায় যা জানা যায়, তা হলো ‘নারী আন্দোলন’ বৈষম্যমূলক সামাজিক বিকাশ পরিস্থিতিতে অনিবার্য। এ আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট ধরন নেই। বাংলার সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিতে নারীর দ্রোহ, আন্দোলন আর সাহসিকতার মূর্ত প্রকাশ ঘটেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও নারীর ভূমিকা অতুলনীয়। সারা বিশ্বে নারী আন্দোলনের যে ধারা, তার স্রোত সে-ই ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলের নারীদের মাঝে সঞ্চারিত হয়। আঠারো থেকে বিশ শতক পর্যন্ত বাঙালি নারীর অধিকার সচেতনতা ও আন্দোলনের ইতিহাস এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। নারী আন্দোলনের পিছনে প্রাথমিক যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কাজ করেছে, তা হলো দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্খা। আবার নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টি সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও আলোচিত হয়েছে।

নারী নেত্রীরা বলছেন, সারা পৃথিবীতেই নারী আন্দোলনের বিষয়ে অনেক কাজ হয়েছে। বাংলাদেশেও নারী আন্দোলনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী আন্দোলন ও নারীর অগ্রযাত্রা অনেকটা দৃশ্যমান। তবে বর্তমান সময়ে নারী আন্দোলন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। অধিকার আদায় ও সংগ্রামে নারী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল দিকটি এখন অনেকটাই স্তিমিত। ঘটা করে দিবস পালন কেন্দ্রীক আয়োজনেই যেনো সীমিত হয়ে পড়েছে।

তবে এর ভিন্ন মতও আছে। যারা ভিন্ন মত পোষণ করছেন তাদের যুক্তি হলো; নারী আন্দোলন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি এখনো চলমান। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের নারী আন্দোলনের যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই নারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর সাবেক এবং একমাত্র নারী ভিপি অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ১৯৭১ সালের আগে এবং দেশ স্বাধীন হবার পর কিন্তু দু’টি ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। সেই সময় দেশের স্বাধীনতার জন্য নারী-পুরুষ সবাই এক কাতারে এসে আন্দোলন, সংগ্রাম করেছে। দেশ স্বাধীন হবার পর নারী আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা নেয়। দেশ স্বাধীন হবার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত নারী আন্দোলন নিয়ে দেশে খুবই ভালো কাজ হয়েছে। এর পর থেকেই যেনো একটা ধীর লয় চলে আসে আন্দোলনে। দেশের উন্নয়নে বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে এ কথা সত্য। তবে এনজিওগুলো যত বিস্তৃত হতে লাগলো নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোও ধীরে ধীরে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ফান্ড নিয়ে কাজ করতে লাগলো। তখন থেকেই ভেতরের আগুন নিয়ন্ত্রিত হয়ে যেতে লাগলো। আমি বলতে চাই, ভেতর থেকে বিপ্লব করার স্পৃহা অর্থের বিনিময়ে হয় না। আগে কোন ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক মাঠে নেমে যেতাম। এখন এত সংগঠন কত শত ঘটনা ঘটছে, কিন্তু আমরা কি তাদের মাঠে দেখছি?

নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহারও মনে করেন নারী আন্দোলন এখন শক্তি হারিয়েছে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ১৮৯০ সালে বেগম রোকেয়া যে কথা বলেছেন আমরা এ যুগেও তা বলতে পারছি না। বলছি না। সেগুলো বলার সাহসও আমাদের নেই। নারী আন্দোলন একন আসলেই হয় না। একটি ব্যানার নিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া আমরাদের শক্তি নাই। এই শক্তিটাকে আরো কত মাত্রায় বাড়াতে হবে তা আমরা জানি না। আমরা টোকা দেয়ার চেষ্টা করছি। যা আরো জোরে দিতে হবে। বাংলাদেশে নারী আন্দোলন সাফল্য মন্ডিত ছিলো, এখন তা ইতিহাস। তাতে আরো বেশি জোর দিতে হবে। আমরা যে শক্তি অর্জন করেছি তার প্রকাশ করতে হবে। প্রকাশ করার জন্য আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সাথে নিয়ে আরো বেশি সংগঠিত হতে হবে।

তবে নারী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেছে একথা মানতে রাজি নয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, নারী আন্দোলন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের নারী আন্দোলনও এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আগেও মাঠে ছিলাম এখনো আছি। আগে আমরা সমস্যার প্রতিকার চাইতাম। এখন সমস্যার গভীরে গিয়ে তার সমাধান খোঁজার চেষ্টাও করছে নারী আন্দোলনে যুক্ত সংগঠনগুলো। স্তিমিত হয়ে গেছে এটি কোন অর্থে বলা হচ্ছে? নারী আন্দোলন কখনই ভাঙচুর করেনি এখনো করছে না। আমিতো বলবো এখন নারী আন্দোলনের গন্ডি বেড়েছে। কাজের ডাইমেনশন বেড়েছে। নতুন নতুন পদ্ধতিতে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। তাই নারী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেছে এ কথাটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখা দরকার বলে মনে করেন এই নারী নেত্রী।

আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের নির্বাহী সমন্বয়কারী জিনাত আরা হকও মনে করেন নারী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়নি বরং এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। যারা বলেন নারী আন্দোলন এখন বেগবান নয় তারা আসলে ঠিক বলছেন না। রাস্তায়, প্রেসক্লাবে কর্মসূচি ঘোষণা করাই আন্দোলন নয়। যে লক্ষ্যে কাজ করছি সেগুলো বাস্তবে রূপ দেয়াটাই আন্দোলন। এ কথা সত্য প্রকল্প দিয়ে নারী আন্দোলন হয় না। তবে এটিও ঠিক নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিওগুলো অনেক কাজ করেছে। অক্সফার্মের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ মনে করে এনজিওগুলো দুর্যোগে, নারী ইস্যুতে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে খুব ভালো কাজ করেছে।

নারী আন্দোলন নিয়ে হতাশ নন এই মানবাধিকারকর্মী। তিনি বলেন, সময়ের সাথে সাথে আন্দোলনের ধরন বদলায় এবং উদ্দেশ্যটা বদলে যায়। নারী নির্যাতনের ধরন আগে ছিল এক রকম। যা এখন বহুমাত্রিক হয়েছে। আগে যেমন আমরা বলতাম ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়। এখন এমন চিন্তা করা হচ্ছে যে নারীর জীবনী বিয়ে করাটা দরকার কিনা। তাই সময় এবং চাহিদার ভিত্তিতে আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়