আইপিএল শুরু ৯ এপ্রিল, খেলার সূচি প্রকাশ

আগের সংবাদ

সম্পত্তিতে সমান অধিকার কবে পাবে নারী?

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর ‘ভাষণ’ ও ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’র সুবর্ণজয়ন্তী

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২১ , ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ১৫, ২০২১ , ৯:২১ অপরাহ্ণ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

ইতিহাস আয়োজন করে ‘বানানো’ যায় না। সাজিয়ে-গুছিয়ে আটপৌরে পাটাতন তৈরি করে ইতিহাসের আঁতুড়ঘর তৈরি হয় না। কেননা ইতিহাস হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা কোনো কলা-বৃক্ষ নয়, বরঞ্চ তিলে তিলে তৈরি হওয়া কালজয়ী বটবৃক্ষ। কিংবা ইতিহাস আকাশ থেকে পড়া কোনো বাতিল তারা নয়, বরঞ্চ মানুষের ভেতর থেকে তৈরি হওয়া চতুর্পাশ্বকে আলোকিত করা উজ্জ্বল নক্ষত্র। ইতিহাস নিজেই একটু একটু করে তার সৃষ্টির আয়োজন তৈরি করে। ঘটনার পরম্পরায় নানান পরিপ্রেক্ষিত ইতিহাসের মঞ্চ তৈরি করে। ইতিহাস সময়ের হাত ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় তার অমর সৃষ্টির দিকে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে রেসকোর্সের ময়দানে লাখো মানুষের সামনে সৃষ্টি হওয়া যে অমর মহাকাব্যিক ইতিহাস, সেটা ইতিহাস সম্পর্কিত এসব তাত্তি¡ক বাক্যাবলির সত্যতা এবং ন্যায্যতা দেয়। মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করে না, বরঞ্চ মানুষ ইতিহাসের সৃষ্টি।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু মার্টিং লুথার কিংকে মিথ্যা প্রমাণ করেছিলেন কেননা তিনি নিজেই এক অমর এবং কালজয়ী ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন যে, ইতিহাসের কারিগর এবং নির্মাতা শেষ বিচারে মানুষ। মানুষই ইতিহাসের স্রষ্টা এবং পথনির্দেশক। যুগে যুগে সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের বাঁকে বাঁকে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এ ধরনের মানুষের আবির্ভাব হয়। আর তারাই কালের ঘটনাকে কালান্তরের ইতিহাস বানিয়ে দেন স্বীয় কর্ম, কীর্তি এবং অনুকরণীয় ও অনুস্মরণীয় অবদানের ভেতর দিয়ে। ফলে কোনো এক বিশেষ কালের কোলে জন্ম নিয়ে কোনো এক বিশেষ ঘটনা কালান্তরের জাহাজে চড়ে হয়ে উঠে ঐতিহাসিক। আর মানুষই সে কালের স্রষ্টা আর কালান্তরের বোরাক। বিশেষ করে কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাষণ কীভাবে কালের কোলে জন্ম নিয়ে কালান্তরে ছুটে চলে ইতিহাসের অমর ঝাÐা নিয়ে, তার সাক্ষ্য আছে ইতিহাসে মোটা দাগে তিনটি। যেসব ভাষণ নিজেই এক একটা জ্বলন্ত ইতিহাস হয়ে মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষের মুক্তির দিশা হিসেবে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে খোদাই হয়ে আছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম তিনটি অমর, অক্ষয়, কালোত্তীর্ণ ও ঐতিহাসিক ভাষণ হচ্ছে মার্কিন গণতন্ত্রের আলোর দিশারি আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ, ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিলের (চার্চিল যদিও তীব্র ভারতবিরোধী ছিলেন!) একটি বেতার ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ। লিংকনের ভাষণের একটা অংশ এখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হিসেবে সর্বাধিক প্রচলিত এবং বহুল উদ্ধৃত : গণতন্ত্র হচ্ছে হয়ে বাই দ্য পিপল, অব দ্য পিপল এন্ড ফর দ্য পিপল। চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের আক্রমণ থেকে ব্রিটিশদের রক্ষা করার জন্য তার অত্যন্ত উদ্দীপ্তকারী ভাষণে বলেছিলেন, ‘শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করব। … কিন্তু যে মূল্যই হোক না কেন, আমরা হিটলারকে প্রতিহত করব।’ আর ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’ এভাবেই বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার বীজ বপনকারী, মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকারী এবং ইতিহাসের বিশেষ প্রেক্ষাপটে মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারি হিসেবে আব্রাহাম লিংকন, উইনস্টিল চার্চিল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজির হয়েছিলেন মানব মুক্তির ইতিহাসের নতুন নক্ষত্র হিসেবে, যা অদ্যাবধি দেদিপ্যমান। বরঞ্চ আমি বলব, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সার্বিক বিবেচনায়, ইতিহাসের জটিল পথপরিক্রমায় এবং স্থানিক ইতিহাসের জটিল ঘটনা প্রবাহের নানান বিবেচনায় আব্রাহাম লিংকন এবং উইনস্টিল চার্চিলের চেয়ে বহুগুণে আবেদনময়ী, সময়োপযোগী, প্রেরণাদায়ী, দিকনির্দেশনাকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকারী। তাই ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সে রকম এক কালোত্তীর্ণ ইতিহাসের জন্ম হয়েছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের যে শব্দ চয়ন, যে বাক্য বিন্যাস, যে চরণ আলেখ্য, যে রাজনৈতিক উত্তেজনা, কালের যে যন্ত্রণা, সুচিন্তিত যে দিকনির্দেশনা, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার যে প্রণোদনা এবং স্বাধীনতার যে প্রতীকী ঘোষণা তা নিয়ে বিগত ৫০ বছরে বিস্তর আলোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ, কনটেন্ট অ্যানালাইসিস এবং ব্যাখ্যা-গবেষণা হয়েছে। হয়তো হবে আরো। কেননা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর মুখের ভাষা এবং শরীরের ভাষার সংমিশ্রণে যে অভিনব ইতিহাসের জন্ম নিয়েছিল, আজ সেই দিন, সেই মুহূর্ত, সেই মুখের ভাষা, সে শরীরের ভাষা, সে অমর বাণী, সে বিপ্লবী অনুপ্রেরণা, সে স্বাধীনতার ডাক, সে মুক্তির নির্দেশনা এবং জ্বালাময়ী মহাকাব্যের সুবর্ণজয়ন্তী। আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যে ইতিহাস জন্ম নিয়েছিল ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর বিপ্লবী তর্জনীর তালে তালে, রাজনীতির কবির যে অমর কবিতা এদেশের মানুষকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যে অবিস্মরণীয় মুহূর্তের অবতারণা হয়েছিল লাখো মানুষের উত্তাল সেøাগানে, স্বাধীনতার ও মুক্তির সদন বঙ্গবন্ধুর সে কবিতার (ভাষণের) আজ সুবর্ণজয়ন্তী।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে, অকুতোভয় চিত্তে এবং তুমুল আত্মবিশ্বাসে উচ্চারণ করেছিলেন, আমাদেরকে ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বঙ্গবন্ধুর সেই দৃঢ়কণ্ঠের আত্মবিশ্বাস অনূদিত হয়েছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে, যা চ‚ড়ান্ত পরিণতি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি এক খÐ জায়গা করে নেয়া সেই ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’র ফসল। এবং সত্যিকার অর্থেই বাঙালিকে ‘দাবায়ে রাখা’ যায়নি।

সে ৭ মার্চের ভাষণের ৫০ বছর পরে এ ভাষণের সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে এসে যদি আমরা আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তাহলে বঙ্গবন্ধুর সে ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ একটা অসাধারণ প্রতিবিম্ব আমরা দেখতে পাই। ২০২১ সালে এসে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, স্বল্পোন্নত বর্গ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া, দৃশ্যমান ভৌত-অবকাঠামোগত উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পর্ণতা, প্রযুক্তিতে বিপুল বিকাশ, বিশ্বমঞ্চে ক্রিকেটের সগৌরব উপস্থিতি, কৃষকের বাম্পার ফসল, শ্রমিকের অর্থনৈতিক অবদান, মজদুরের মজদুরি দক্ষতা, শিক্ষা-বিজ্ঞানে প্রভ‚ত অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অনির্ভরতা, বিপুল পরিমাণ (৪৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ২ হাজার ডলারের ওপরে মাথাপিছু আয়, এক দশকাধিককাল ধরে ৬-৮ শতাংশ জিডিপি এবং সর্বোপরি সামাজিক ও মানবিক ইনডেক্সে সমীহযোগ্য অগ্রগতিই প্রমাণ করে যে, বাঙালিকে ‘দাবায়ে রাখা’ যায়নি। বঙ্গবন্ধু ৫০ বছর আগে বাঙালির ক্ষমতা, যোগ্যতা, দক্ষতা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং সেক্রিফাইস করার যে গুণাবলি নিজের অন্তরাত্মা দিয়ে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, তারই সফল উপস্থাপন আজকের এ অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস, আস্থা, স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ। আজ ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’র সুবর্ণজয়ন্তীতেই প্রমাণিত হয়, ‘বাঙালিকে দাবায়ে রাখা যায়নি’। আর ‘দাবায়ে রাখা যায়নি’ বলেই, ১৯৭১ সালের হেনরি কিসিঞ্জারের কটাক্ষভরা উক্তি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘ইকোনমিক পাওয়ার’, এশিয়ার উদীয়মান ‘অর্থনৈতিক বাঘ’ (এমার্জিং টাইগার) এবং পৃথিবীর উন্নয়শীল দেশগুলোর জন্য ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ (রোল মডেল অব ডেভেলপমেন্ট)।

আজ সেই ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’রও সুবর্ণজয়ন্তী। বঙ্গবন্ধুর এ অমর বাণী এবং আত্মবিশ্বাস আজো এ দেশের মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুর ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ থেকে তীব্রভাবে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হই এবং গোটা বিশ্বকে জয় করার প্রেরণা পাই।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়