বদলে যাওয়া বাংলাদেশ

আগের সংবাদ

মানসিক সুস্থতা কেন প্রয়োজন?

পরের সংবাদ

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্তির উপায়

মযহারুল ইসলাম বাবলা

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২১ , ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২, ২০২১ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ

ভারতীয় টিভি মিডিয়ায় হিন্দি নাটক-সিরিয়াল এমনকি হিন্দি চলচ্চিত্র পর্যন্ত ভারতীয় সমাজ-জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন। সিরিয়ালগুলোর নারী চরিত্র মাত্রই চটকদার-বাহারি সাজে সর্বক্ষণ সেজে থাকে। এমনকি ঘুম থেকে ওঠার দৃশ্যে পর্যন্ত তাদের একই সাজে দেখা যায়। তাদের কোনো কাজ নেই। কাজ একটাই, সর্বদা পরনিন্দা-পরচর্চা এবং একে-অন্যের বিরুদ্ধে কূটকৌশল এঁটে ঘায়েল করা। সামাজিক এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি অতিমাত্রায় পরকীয়া চর্চা প্রায় সিরিয়ালের প্রধান উপজীব্য বিষয়। যার প্রভাব আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ক্রমেই বিস্তার ঘটলে অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না। হিন্দি ছবির সহিংসতার অনুকরণে নানা নৃশংস ঘটনা আমাদের দেশে ঘটছে। এ ধরনের ঘটনাই প্রমাণ করে হিন্দি ছবি ও সিরিয়ালের নৃশংস প্রভাব মুক্ত আমরা নই।
আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোয় বিশেষ করে বিয়ে-গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে হিন্দি গান এবং হিন্দি ছবির নাচের অনুকরণে নাচানাচি এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কেবল শহরে নয়, গ্রামে-গঞ্জে পর্যন্ত এ ধরনের হিন্দি নাচ-গানের অনুকরণে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আমাদের পোশাকেও হিন্দি ছবি-সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের বাহারি পোশাকের আদলে পোশাক পরিধানের হিড়িক লক্ষ করা যায়। ঈদ-পার্বণে দেশের বৃহৎ শপিংমলগুলোতে আমদানিকৃত উচ্চ মূল্যের ভারতীয় পোশাকে সয়লাব হয়ে যায়, যা দেশের বিত্তবান এবং মধ্যবিত্তদের চাহিদা পূরণ করে। হিন্দি বাণিজ্যিক ছবি মাত্রই স্থূল-অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণরূপে বাস্তব বিবর্জিত। দর্শকদের বাস্তব থেকে কল্পলোকে আচ্ছন্ন করে দেয়। চেতনানাশক এসব হিন্দি ছবি মানুষের স্বাভাবিক মানসিকতাকে বিকৃত করে তোলে। যার নানা নমুনা আমরা আমাদের সমাজে দেখছি বটে, তবে প্রতিকারের লক্ষণ খুঁজে পাচ্ছি না।
হিন্দি বাণিজ্যিক ছবির বিনিয়োগ অস্বাভাবিক, যা কল্পনা করা যায় না। এত অধিক অর্থের বিনিয়োগকারীরা থাকে পর্দার অন্তরালে। যাদের অনেককে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া ডন বলা হয়। মুম্বাইর এক সময়কার মাফিয়া ডন হাজি মাস্তান মির্জাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পরক্ষণে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছিল। ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের পুঁজির লগ্নিকারকরা মাফিয়া ডন রূপেই খ্যাত এবং তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার নানা কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র পর্যন্ত নির্মিত হয়। ভারতের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ মানুষ দরিদ্র হলেও সংখ্যালঘু ভারতীয় বিত্তবানরা বিশ্বমানের বিত্তশালী। ভারতের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ব্যবসা, বেসরকারি চ্যানেল এদেরই নিয়ন্ত্রণে। ভারতীয়দের বিনোদন মাত্রই চলচ্চিত্র। চেতনানাশক হিন্দি ছবি তাদের ওপর আফিমের মতো প্রভাব ফেলেছে এবং তাদের অধিকার সচেতনতাকে বিনষ্ট করে চলেছে। আফিমের নেশার অনুরূপ হিন্দি ছবি-সিরিয়াল আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে আমাদেরও একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভারতীয় হাতেগোনা কয়েকটি বাংলা চ্যানেল আমরা দেখে থাকি। জি-বাংলা, ইটিভি, স্টার জলসা, জলসা সিনেমা, জি-বাংলা সিনেমা। আকাশ বাংলা নামক চ্যানেলটি পূর্বে দেখা যেত কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য ক্ষমতা গ্রহণের পর তা আমাদের এখানে বন্ধ হয়ে যায়। বাংলা চ্যানেলে নাটক, চলচ্চিত্র, সিরিজ নাটক সম্প্রচারিত হয়ে থাকে। বাংলা ছবি সম্প্রচারে হাল আমলের ছবি সর্বাধিক হলেও, মাঝে মধ্যে পুরনো সাদা-কালো বাংলা ছবিও সম্প্রচারিত হয়। সিরিজ নাটকগুলোতে হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিকতা এবং ঐশ্বরিক শক্তির বিষয়গুলো অধিক গুরুত্বসহকারে দেখানো হয়। ভারতীয় পৌরাণিকের ঐশী শক্তির নানা বিষয় সনাতন ধর্মের প্রচারণা রূপেই বিবেচনার দাবি রাখে। অর্থাৎ জাগতিকতা থেকে দর্শকদের পারলৌকিকতায় ধর্মান্ধতায় আকৃষ্ট করতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। যাকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ধর্মযোগ বললে অত্যুক্তি হবে না। কলকাতার বাংলা নাটক-সিরিয়াল বা চলচ্চিত্রে মুসলিম পুরুষ চরিত্রমাত্রই মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি হাতে তসবিহ থাকবেই। নারী মাত্রই হিজাব-বোরকা পরবেই। মুসলিম চরিত্রগুলোর মুখের ভাষাÑ হয় পূর্ববঙ্গীয় গ্রাম্য ভাষা নয়তো উর্দু ভাষা। বিশুদ্ধ বাংলায় মুসলমানরা কথা বলতে পারেÑ এই বিবেচনা কলকাতার নির্মাতারা বোধকরি ভাবতেই পারে না। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে যেমন তিনি লিখেছিলেন, ‘আজ এ পাড়ার বাঙালিদের সঙ্গে ওই পাড়ার মুসলমানদের ফুটবল ম্যাচ।’ পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা আজ অবধি শরৎচন্দ্রের সেই লেখাকে অতিক্রম করতে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে প্রায় যে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে থাকেÑ ‘দাদা আপনি কি বাঙালি, না মুছলমান?’ মুসলমানরা যে বাঙালি হতে পারে এবং তাদের থেকেও অধিক মাত্রায়, এই সত্যটি তাদের ধারণার মধ্যে নেই। যার প্রভাব আমরা কলকাতার বাংলা চ্যানেলের নাটক-চলচ্চিত্রে হরহামেশা দেখে থাকি।
হিন্দির প্রভাব আমাদের চলচ্চিত্রে-টিভি নাটকে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কলকাতার বাংলা চ্যানেলগুলোর হিন্দি নির্ভরতার মূলে হিন্দি ভারতের সরাকারি ভাষা। হিন্দি ভাষাকে তারা অস্বীকার-অবজ্ঞা করতে পারবে না। যদিও দক্ষিণ ভারতের চার রাজ্য হিন্দি ভাষাকে পরিত্যাগ করে নিজ নিজ ভাষার প্রতি অধিক আনুগত্য প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছে। কলকাতা তা পারেনি। পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা নিজেদের জাতীয়তা ভুলে ভারতীয় জাতীয়তায় অধিক আকৃষ্ট হলেও সর্বভারতীয় পরিমণ্ডলে আশানুরূপ ঠাঁই কিন্তু তাদের নেই। ভারতে হিন্দু ভারতীয়তাবাদের এখন রমরমা অবস্থা। হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভাষাও হিন্দি। শাসক দল হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি পর্যন্ত করেছে। অর্থনৈতিক এবং ভাষাগত কারণে অপরাপর প্রদেশের তুলনায় পশ্চিমবাংলা মোটেও সম্মানজনক অবস্থান পায়নি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবাংলা, ত্রিপুরা এবং আসাম রাজ্যের পরিবর্তে ভিন্ন ভাষী রাজ্য থাকলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কোটি শরণার্থীর ভাগ্যে কি ঘটত বলা কঠিন। ওই তিন রাজ্যের বাংলাভাষীদের অকৃত্রিম সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছিল কোটি মানুষের ঠাঁই। দেশভাগে পূর্ববাংলা থেকে প্রত্যাগত বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা ভোলার নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের অবদানকে আমরা অবশ্যই সম্মান করি। যদিও পাকিস্তান ভাঙনে রাজনৈতিক ফায়দা হয়েছে ভারতের। তবে পাকিস্তান খণ্ডনের মূলে স্বয়ং পাকিস্তানি শাসকরাই দায়ী। তারাই অন্যায় যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে ছিল। ভারত মওকার সুযোগ নিয়েছিল সফলভাবে। স্বাধীন বাংলাদেশ ভারতের পণ্য বাজারে পরিণত হয়েছে। ভারত এবং বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ভয়ানক মাত্রায় বৈষম্যপূর্ণ। ভারত একচেটিয়া পণ্য রপ্তানি করে থাকে অথচ বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ কেবল ভারতের পণ্য বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। সংস্কৃতির বাজারে ক্রমেই পরিণত হয়ে চলেছে। উর্দু ভাষা-সংস্কৃতির আপদ স্থায়ীরূপে দূর হয়েছে কিন্তু হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির বিপদ ক্রমেই তেড়ে আসছে। হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন রুখতে ব্যর্থ হলে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার উপায় থাকবে না। আমরা বাঙালির স্থলে সংকর জাতিসত্তায় পরিণত হবো। আমাদের জাতীয়তার সংকরীকরণে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য একে একে বিলীন হয়ে যাবে। পৃথিবীর খুব কম জাতিই ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত রেখেছে। আমরা সেই জাতিরূপে অহংকার-গর্ব করি অথচ ভাষা-সংস্কৃতির বর্তমান বিপদ থেকে রক্ষায় যদি ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের সকল অর্জন বিফলে যাবে। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে এখনই এ বিষয়ে মনোযোগী না হলে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আর উপায় থাকবে না। উর্দু সাংস্কৃতিক আগ্রাসন অধিকতর বাংলা সাংস্কৃতিক চর্চায় আমরা রুখে ছিলাম। আজো অনুরূপ অধিকতর বাংলা সাংস্কৃতিক চর্চা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের রুচি-বিকৃতি ঠেকাতে আমাদের সাংস্কৃতিক সব মাধ্যমের অধিকতর চর্চা ব্যতীত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই বিপদ থেকে আমাদের মুক্তির উপায় নেই।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়