সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্তির উপায়

আগের সংবাদ

মডার্নার শেয়ার বিক্রি করে দিল অ্যাস্ট্রাজ়েনেকা

পরের সংবাদ

মানসিক সুস্থতা কেন প্রয়োজন?

নীতুল জান্নাত নীতি

শিক্ষার্থী, সেন্ট্রাল ওমেন্স ইউনিভার্সিটি

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২১ , ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ২, ২০২১ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ

কখনো ঘুম ভাঙার পর মনে হয়েছে যে হয়তো তখনই আপনি দমবন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন? নিঃশ্বাস নিতে প্রবল কষ্ট হচ্ছে কিংবা চারদিকে গাঢ় অন্ধকার? তারপর হয়তো আপনি পরদিন ডাক্তারের কাছে গেলেন, একে একে ব্লাডটেস্ট, ইসিজিসহ অন্যান্য যাবতীয় সব পরীক্ষা করালেন এবং এটাও জেনে অবাক হলেন যে রিপোর্টে সবই নরমাল। তাহলে সমস্যাটা কোথায়, এটাই হয়ে ওঠে চিন্তার কারণ।
আমরা মূলত যা দেখি সেটুকুকেই আগলে রাখতে চাই। তার বিশাল উদাহরণ হচ্ছে আমাদের শরীর। সামান্য জ্বরের কাঁপুনিকে আমরা যতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিই, মানসিক সমস্যা ঠিক তার চেয়েও বেশি গুরুতর হলেও আমরা উদাসীন থাকি। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় যে মানসিক আবার রোগ আবার কী অথবা সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। কেউ কেউ আবার বলেই বসেন পুরনো কিছু যুক্তিকে পুঁজি করে, ‘তুমি এর চেয়েও খারাপ থাকতে পারতে, তোমার অবস্থান এর চেয়েও নিচে থাকতে পারত।’
কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সবার গ্রহণ ক্ষমতা, সহ্য ক্ষমতা কখনো এক হয় না। আপনি যদি কাউকে শারীরিকভাবে ভালো রাখার জন্য সবটুকু করতে পারেন এবং এটাও বিশ্বাস করতে পারেন যে তার কোনো দুঃখবোধ, ক্লান্তিবোধ থাকতে পারে না তাহলে আপনি ভুল। মানসিকভাবে ভালো রাখার প্রয়াসটা এখনো অবহেলিত আমাদের দেশে। আমি আমার যুক্তিগুলো উপস্থাপন করার আগে কয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই।
উদাহরণ ১ : পারিজাত একটি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। মা-বাবার একমাত্র মেয়ে বিধায় আদর-যত্নের কমতি নেই। যখন যা চায়, নিমিষেই তার সামনে এনে দেয়া হয়। পারিজাত পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো ছবি আঁকে, গান গায়। কিন্তু একদিন এই মেয়েটি চুপচাপ হয়ে যায়। স্কুলে যাওয়ার প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। কারণ জানা যায় যে মেয়েটি অন্য স্টুডেন্টদের কাছে বুলিংয়ের শিকার। টিচাররাও ব্যাপারটা হালকাভাবেই নিচ্ছেন, এমনকি পরিবারও। ‘একই স্কুলে পড়তে গেলে এমন হয়ই। তোমার তো কোনো কিছুর অভাব নেই, তুমি তোমার মতো পড়াশোনায় মন দিলেই পারো।’
এই বাক্যটিও পারিজাতের মানসিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলাফল, রেজাল্ট খারাপ এবং প্যারেন্টস টিচার মিটিংয়ে আবারো হেনস্তা। পারিজাত যাবে কোথায়?
উদাহরণ ২ : ভার্সিটিতে ইদানীং প্রায়ই উদাসীন থাকে লিলিয়ান। বন্ধু সংখ্যা এমনিতেই কম তার, সেক্ষেত্রে উদাসীনতায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়ায় হাতেগোনা থাকা বন্ধুরাও কেটে পড়তে শুরু করে। আড়ালে ফিসফাস চলে, ‘কত ঢং রে ভাই। পোষা বিড়াল মরে যাওয়ায় এত কাহিনী। ব্রেকাপ হইলেও বুঝতাম। ওর তো কয়দিন আগেই ব্রেকাপ হইসে, কই তখন তো চুপ ছিল। কিসের কান্না কোথায় কাঁদে।’
লিলিয়ানের কানেও টুকটাক কথা ভেসে আসে। তবুও তার থমকে যাওয়া পৃথিবীতে কোনো স্পন্দন আসে না। কেউ জানেও না, ছোটবেলা থেকে চারদেয়ালের মাঝে বড় হয়ে ওঠা এই মেয়েটির জীবনে একটি পোষা বিড়ালের নিঃস্বার্থ সঙ্গ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যে বিশাল কিছুতে ভাঙে না, তাকে অল্প কিছুতে ভেঙে পড়তে দেখলে আমরা এত অবাক হই কেন?
উদাহরণ ৩ : নীরার কিছুদিন হলো এক্সিডেন্ট হয়েছে একটা। হসপিটালে কিছুদিন কাটানোর পর বাসায় এসে লক্ষ্য করল তার নিজের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অল্পতেই রেগে যাওয়া, ভয়ে অস্থির হয়ে ওঠা ইত্যাদি রোগ। ঠিক এই সেনসিটিভ সময়ে তারই এক আত্মীয় ক্রমাগত প্রতিহিংসাবশত মেন্টালি বুলি করতে থাকে এবং সুযোগ পেলেই ঝগড়াঝাঁটি, ঝামেলা সৃষ্টি করতে থাকে। নীরা হাঁপিয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে সহ্য ক্ষমতা কোথায় গিয়ে ঠেকছে তার ধীরে ধীরে। অথচ তাকে বোঝানো হয়, ‘কেন গায়ে মাখো এগুলো? তুমি তোমার মতো থাকো। শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠ।’
অথচ মানসিক সুস্থতাটাও যে জরুরি তা নীরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে থাকে।
ওপরের ঘটনাগুলো প্রতিটিই বাস্তব। হয়তো মিলে যাবে কারো কারো জীবনের সঙ্গেও। মেন্টালি ট্রমা কিন্তু প্রায়ই পেয়ে যাচ্ছি আমরা বিভিন্ন ঘটনাবলিতে, কিন্তু গুরুত্ব দিচ্ছি কতটুকু? কেন দিনশেষে অনেকেই ডিপ্রেশন নামক ব্যাধিতে ভুগছি আমরা?
কনসাস মাইন্ড কিংবা প্রত্যক্ষভাবে মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তা কয়েক সেশনেই আপনাকে মুক্তি দিতে পারে। আমরা বাহ্যিকভাবে যা গ্রহণ করি, বাহ্যিক দিক থেকে প্রয়োজনীয় যুক্তি পেলে তা ত্যাগও করতে পারি। এ ধরনের টেম্পোরারি ট্রমায় প্রতিদিন হাজার মানুষ মুখোমুখি হচ্ছে এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে তা কাটিয়েও উঠতে পারছে।
এবার আসি সাবকনসাস ট্রমার কথায়।
আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে কিছু কিছু গল্প বা আকস্মিক ঘটনা থাকবেই, যা আমাদের সচেতনভাবে কিংবা অবচেতন মনকে আঘাত করবেই। কারো মৃত্যু, হঠাৎ অপহরণ বা ধর্ষণ হওয়ার মতো ঘটনা কিংবা অপ্রত্যাশিত এক্সিডেন্টে শারীরিক বড় কোনো আঘাত আমাদের জীবনের চিরাচরিত রুটিনকে এলোমেলো করে ফেলে। ব্রেইন তার রেগুলার রিদমকে হারায়। আপনার সাবকনসাস মাইন্ড আঘাতপ্রাপ্ত হলে আপনি বুঝতেও পারবেন না। ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাবেন, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাবে, রাতে ঘুম কমে যাবে, কানে অদ্ভুত তীক্ষè আওয়াজ পেতে শুরু করবেন। আমি যেহেতু এই স্টেজটা কিছুদিন আগে পার করেছি, সুতরাং আমি অনুভব করি হয়তো এটাও এক ধরনের ভয়ঙ্কর স্তর। এ সময় প্রাথমিকভাবে বড়জোর আপনি নিয়ন্ত্রণ না হারানোর চেষ্টা করতে পারেন। যতটুকু পারেন, নির্বিঘ্নে ঘুমাবেন। প্রয়োজনে মেডিটেশন, যোগাসন, হালকা ব্যায়ামকেও প্রতিদিনের রুটিনের তালিকায় রাখবেন। আর একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে বস্তু বা যাদের জন্য আপনি ট্রমার শিকার, তাদের এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে বয়কট করা। জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো ভাবুন। নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে সময় দিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাও সার্ভাইভ করতে না পারলে মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। মানসিক সুস্থতায় মনোযোগী হোন।
আমাদের শরীরের বয়স বাড়ে, জানেন তো? কালো চুলগুলো ধূসর হবে, চামড়া কুঁচকে যেতে থাকবে, সময় ফুরিয়ে যাবে। অথচ পুরোপুরি নিঃশেষ হওয়ার আগে যে চেতনাটুকুও আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না, জীবদ্দশায় তারই যত্ন নিতে আমরা ভুলে যাই। প্রয়োজনের সময় নিজের মনকে ব্রেক দিন, নিজেকে বুঝুন, কেঁদে হালকা হতে চাইলে কাঁদুন, প্রিয় গান শুনুন, প্রিয়জনের সান্নিধ্যে থাকুন। জীবন একটাই, মনটাকে চিরযৌবনা রাখুন।

শিক্ষার্থী, সেন্ট্রাল ওমেন্স ইউনিভার্সিটি।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়