বিজেপিতে যোগ দেওয়া নিয়ে যা বললেন সৌরভ গাঙ্গুলি

আগের সংবাদ

নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হচ্ছেন মমতা

পরের সংবাদ

অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিশ্বস্বীকৃতি

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২১ , ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মার্চ ৩, ২০২১ , ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ

পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ গুণ আর জিডিপি বেড়েছে ৩০ গুণ। ১৯৭০ সালে এই অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১৪০ ডলার, ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে- গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার এন্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘আ লুক অ্যাট বাংলাদেশ’স ৫০ ইয়ার জার্নি : টার্নিং পয়েন্টস অব দ্য ইকোনমি’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য এটি। শুধু তাই নয়, ১৯৭২-১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি এবং ২০২০-২০২১ সালের বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ১৯৭২-১৯৭৩ সালের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৭২২ গুণ। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে উন্নয়ন বাজেটের আকার ছিল ৫০১ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২০১৮-২০১৯ সালে হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি, যা ৩৪৫ গুণ বেশি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ঘরে ঘরে বিজলি বাতির চমক, শিল্পায়ন, গৃহায়ণ, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ প্রশমনে বদলে গেছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ঘটেছে উন্নয়নশীল দেশে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ- যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার লড়াই সংগ্রামের সুবিশাল ইতিহাস।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ৫০ বছরের অগ্রগতি স্বস্তিদায়ক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, রপ্তানি আয় বেড়ে যাওয়াসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে অগ্রগতি, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রো

রেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পে অগ্রগতি পাল্টে দিয়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন ভোরের কাগজকে বলেন, জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আর ২০১৮ সালে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা দেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত মর্যাদাশীল অর্জন। তিনি বলেন, নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বৈশি^ক করোনা ভাইরাসের ঝড়-ঝাপটা পেরিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে। চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে কঠিন নয়।

বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার যুবক শ্রেণি কাজ না পায়।’ গবেষকদের মতে, জাতির পিতার উত্তরসূরির নেতৃত্বেই এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লড়াই। ইতোমধ্যেই প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পথ-নকশা তৈরি করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২১-২০২৫ মেয়াদি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে। ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই পরিকল্পনায় ১ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে দারিদ্র্যের হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে। শেষ বছর ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ১০টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে যা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষ পূর্তিতে দেশের সব নাগরিকের একটিই চাওয়া সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়ন একটি বড় অর্জন। এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশলের ফলে। অন্যদিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ পল্লী উন্নয়নের এক কার্যকর মডেল। ইতোমধ্যে প্রায় ৩ কোটি মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে। পল্লী সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে রয়েছে বহুমুখী প্রকল্প, যা পল্লী জনপদের মানুষকে দরিদ্রতার বেড়াজাল থেকে উত্তরণের পথ সুগম করে দিয়েছে। যুব উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ’ সম্মাননায় ভ‚ষিত হওয়াও উন্নয়নের স্বীকৃতি। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ভোরের কাগজকে বলেন, পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অসামান্য। স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো করে দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই দেখানো পথে বঙ্গবন্ধু কন্যা অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে দারিদ্র্যপীড়িত দেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করেছেন। আমাদের টার্গেট ২০৪১ সালের মধ্যেই উন্নত, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যপূরণে কাজ করছে সরকার।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার আগে যেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল ৮৮ শতাংশ লোক, আজ সেই সংখ্যা ২০ শতাংশের কম। বিগত ৫০ বছরে ধান-চালের উৎপাদন প্রায় চারগুণ হয়েছে। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশ। বর্তমানে ৮ শতাংশের ওপর। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার ৪৯ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে তৈরি পোশাক ছাড়াও রুপালি ইলিশ, হিমায়িত চিংড়ি, রাজশাহীর ফজলি, সিলেটের শীতলপাটি, নারায়ণগঞ্জের জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, কুমিল্লার খাদি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশের ওষুধ যাচ্ছে বিশে^র ১৬৬টি দেশে। এসব অগ্রগতির স্বীকৃতিও মিলছে। লন্ডনভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ ভবিষ্যতের যে ১০টি উদীয়মান বাজারকে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গার্মেন্ট ও কৃষিভিত্তিক পণ্য রপ্তানি করে দেশটি ক্রমেই জোরালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা ব মবার্গ বলছে, বাংলাদেশ হতে পারে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনই তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ভোরের কাগজকে বলেন, পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে চিহ্নিত, বৈদেশিক ঋণকারক দেশ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি, উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতের বিকাশ বিশেষ করে গার্মেন্টসের বাইরে ফার্মাসিউটিক্যাল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিতে বহুমুখীকরণ, মৎস্যে রুপালি বিপ্লব, পশুসম্পদের উন্নয়ন- আর এসব উন্নয়নের ফলস্বরূপ উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর বাংলাদেশের বড় অর্জন। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। গত ৫০ বছরে সম্পদ ও ভোগে বৈষম্য বেড়েছে, শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, সামাজিক খাতে দুর্নীতির বিস্তার লাভ, পরিবেশ বিপর্যয়, মানবাধিকারের যথেষ্ট উন্নতি না হওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়