পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা

আগের সংবাদ

মুশতাকের মৃত্যু: মশাল মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, আহত ১৬

পরের সংবাদ

গোবিন্দগঞ্জ আ.লীগে দ্বন্দ্ব: সাবেক এমপিসহ ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১ , ৭:১৪ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১ , ৮:১৯ অপরাহ্ণ

আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে চলমান বিবাদ-দ্বন্দ্ব যে কোন মুহুর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রুপ নিতে পারে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদ এর সাথে প্রতিপক্ষ বর্তমান সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ প্রধানের দলীয় কোন্দল এই অবস্থার জন্য দায়ি বলে অনেকে মনে করেন। এরই অংশ হিসেবে গোবিন্দগঞ্জে উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুর এবং ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারে নিহদের ছবি সম্বলিত ব্যানারসহ আসবাপত্র ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনায় আজ ২৬ ফেব্রুয়ারী গোবিন্দগঞ্জ থানায় সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, সাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুলসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে প্রায় ১৫০ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা আলতামাসুল ইসলাম প্রধান শিল্পী বাদি হয়ে এই মামলা(৫৩/২১) দায়ের করেন বলে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি তদন্ত) মো. আফজাল হোসেন আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সরেজমিন গত দুইদিন গোবিন্দগঞ্জ থানা, উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে জানা গেছে, মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষকে আতংক আরও শংকার মধ্যে ফেলেছে। বিশেষ করে ভোট কেন্দ্র দখল, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলার ওয়ারেন্ট ভুক্ত(জিআর ৫৫২/১৬ ও ২২৮/১৬) আসামী তৌকির হাসান রচিকে(+৬টি বিচারাধীন মামলা রয়েছে) ১৯ ফেব্রুয়ারী রাতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদ তার দলবল নিয়ে থানায় গিয়ে আসামীকে ছাড়াতে না পেরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে অবস্থান নেন। ওই দিন রাত তিনটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত গোবিন্দগঞ্জ শহরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। পরের দিন ২০ ফেব্রুয়ারী শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদের সমর্থকরা উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে নিহদের ছবি সম্বলিত ব্যানারসহ আসবাপত্র ভাংচুরের ঘটনায়। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি টক অব দা গাইবান্ধায় পরিনত হয়।

গোবিন্দগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব চরমে/ছবি : ভোরের কাগজ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার একাধিক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জানান, বর্তমান সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক পৌর মেয়র আতাউর রহমান ও উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ প্রধানের সাথে সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদের মধ্যে বিরোধ চরম পর্যায়ে। যে কোন মুহুর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধ দাঙ্গা-হাঙ্গামায় রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন তারা। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য দলীয় উর্দ্ধতন নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ প্রধান বলেন, আওয়ামী লীগ এখানে মুখোমুখি নাই। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুধে ধারণ করে আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব গতিতে চলছে। তবে আজকে যারা জননেত্রী শেখ হাসিনার সমস্ত নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে যারা সব সময় নৌকার বিপক্ষে ভোট করে তাদের একটা বলয় সাবেক সতন্ত্র এমপি তার নেতৃত্বে কিছু লোককে বিভ্রান্ত করে তারা দলের বাইরে ধীর্ঘদিন ধরে বিপথে পরিচালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এবং পৌরসভা নির্বাচনে জননেত্রী শেষ হাসিনার প্রতীক নৌকার বাইরে তারা নির্বাচন করেছে।

গোবিন্দগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব চরমে

আব্দুল লতিফ আরও প্রধান বলেন, ২০১৪ সালে সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করে নিজের বাহিনী দিয়ে লুটপাট করে তিনি নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ দখল করে কিছু লোককে আলাদা করে তিনি আওয়ামী লীগের বিপক্ষে সব সময় অবস্থান নিচ্ছেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ৩০ জানুয়ারী পৌরসভার নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে আর শ্যালককে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাড় করিয়ে কালোটাকার প্রভাব ও বিএনপি-জামায়াতের সাথে আঁতাত করে তার শ্যালক রাফিকে মেয়র নির্বাচিত করে। এর পর থেকে তারা গোবিন্দগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায় অতীতের মতো। যে সময় তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তার বহিঃ প্রকাশ ঘটে গত ২০ ফেব্রুয়ারী গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ ভোট কেন্দ্র দখল, ভাংচুর ও লুটপাটের মামলার ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামী তৌকির হাসান রচিকে গ্রেফতারের ঘটনায় সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে থানায় অসদাচরণ, রাত ৩টা থেকে ভোর ৬টা ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। এসময় আওয়ামী লীগ, প্রশাসন, সরকারসহ বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নামে বিভিন্ন অশ্লীল ও হুমকি দিয়ে শ্লোগান দেয়ায় জনগণের মধ্যে ভীতি ও আতংক সৃষ্টি হয়েছে। পরের দিন ২০ ফেব্রুয়ারী এমপি আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে তার ক্যাডার বাহিনী দুপুর সাড়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসে ভাংচুর করে। তারা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ভাংচুর করেছে। সেই সাথে ১৫ আগষ্টে শহীদ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ জাতীয় নেতাদের ছবি ভাংচুর ও ছিড়ে ফেলে দুস্কৃতিকারিরা। এই ঘটনায় উপজেলা আওয়ামীলীগের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অভিযোগটি থানা পুলিশ মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে। তিনি আশা করেন দোষি ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাবে পুলিশ।

আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মুখোমুখি অবস্থান নয় বলে দাবি করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, আমরা বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন চৌধুরীরসহ আমরা যারা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দলকে পরিচালিত করছি। আমরা আশা করবো এ ধরণের অপকর্মের সাথে জড়িত, যারা দলের নাম ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি যারা ভাংচুর করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং চিরতরে এই সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হবে।

তবে যত অভিযোগ সেই সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, শনিবার সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতা স্বপন কুমার রায়, যুবলীগ নেতা শাহীন আকন্দসহ আমরা বেশ কিছু নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ অফিসের অদুরে গরু হাটির পাশে তামান্না হোটেলের সামনে অবস্থান করছিলাম। এসময় দেখতে পাই আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে উত্তেজিত কিছু নেতাকর্মী বিভিন্ন শ্লোগানসহ হৈচৈ করছে। তখন সেখানে আমরা ছুটে যাই। আমরা উত্তেজিত নেতাকর্মীদের শান্ত করি এবং আওয়ামীলীগ অফিস থেকে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসি। তিনি আরও বলেন, উপজেলা আওয়ামীলীগের কোন অফিস গোবিন্দগঞ্জে ছিল না। আমি ২০১৪ সালে এমপি নির্বাচিত হয়ে প্রায় ৭৯ লাখ টাকা দিয়ে বর্তমানে আওয়ামী লীগ অফিসটি নির্মাণ করি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে দিয়ে আমি ভবনটির উদ্বোধন করি।

যারা আমার বিপক্ষ নিয়েছেন আওয়ামীলীগ অফিসটি নির্মাণ করার সময় এসব নেতাকর্মীর কোন সহযোগিতা আমি পাই নাই। তারা আজকে আমাকে আওয়ামীলীগ থেকে বহিস্কার করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। তারই ধারাবাহিকতায় আমার বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগ অফিস ভাংচুর, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ভাংচুরসহ না অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন। থানায় মামলা দিয়ে আমাকে এবং আমার নেতাকর্মীদের হয়রানী করা হচ্ছে।

আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, কোন পিতা একটি শিশুকে জন্ম দিয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করতে পারে না। তাই আমি আওয়ামীলীগ অফিসের যে ভবনটি গড়েছি তা আমি ভাঙ্গতে পারি না। বর্তমান সাংসদ মনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে নির্বাচনে জয়ী করতে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কাজ করি। কিন্তু তিনি নির্বাচিত হবার পর থেকে আমার বিরুদ্ধে তিনি সড়যন্ত্র করে আসছেন। আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই পার্টি অফিসে দোতলায় আমার ছোট্ট একটি বসার কক্ষ ছিল। সেই কক্ষের একটি চেয়ার ছাড়া সমস্ত আসবাবপত্র তারা ভেঙে ফেলেছে। তারা ওই কক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার ছবি অপসারণ করে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। তাই আমি দীর্ঘ দুই বছর ধরে পার্টি অফিসে যাওয়া ছেড়ে দেই।

আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্তমান এমপি মনোয়ার হোসেন চৌধুরী তার বাসায় বসে নেতাকর্মীদের নিয়ে আমাকে পার্টি থেকে বহিস্কারের ষড়যন্ত্র করছেন এবং জনগণের মাঝে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০ ফেব্রুয়ারীর ঘটনাটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। তারা দলের কাছে এবং জনগণের কাছে আমার ভাবমুর্তি বিনষ্ট করার জন্য অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। তিনি থানায় মামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান এবং সাথে সাথে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সুধীসমাজ এবং গোবিন্দগঞ্জবাসির কাছে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়