দোষীদের দণ্ড দ্রুত কার্যকর হোক

আগের সংবাদ

আশালতা

পরের সংবাদ

বইপাঠ

রশীদ করীমের ছোটগল্প ‘প্রথম প্রেম’

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ , ১০:০২ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ , ১০:২১ অপরাহ্ণ

রশীদ করীম বাংলাসাহিত্যের এক নিবেদিত প্রাণের নাম, চল্লিশের দিকে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করেন, মূলত ছোটগল্প দিয়েই, ছোটগল্প রচনায় সিদ্ধহস্ত তিনি, দীর্ঘ সময় বাংলাসাহিত্যে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন, অর্থাৎ ছোটগল্পে তিনি যেমন উজ্জ্বল নক্ষত্র, তেমনি সমালোচনা সাহিত্যে বা প্রবন্ধ সাহিত্যে এবং উপন্যাসেও তার প্রবল ঝোঁক লক্ষ্য করার মতো, যদিও তাকে নিয়ে তেমনভাবে কেউই আলোচনা-পর্যালোচনা বা সমালোচনাও করে না, বিস্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে গেছেন অনেকটা মনে হয়। তার বিশাল প্রবন্ধ সংকলন যেমন প্রমাণ দেয়, তিনি কতটা বেগবান ছিলেন জীবদ্দশায়, তেমনি উপন্যাসের দিকে তাকালে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় বৈকি!
রশীদ করীম সর্বমোট বারোখানা উপন্যাস লিখেছেন আর এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত একটি মাত্র ছোটগল্পগ্রন্থ ‘প্রথম প্রেম’ (১৯৮৪)। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর রশীদ করীম এদেশে আসেন, তার লেখার পাঠক চাহিদা তেমন না হলেও নিজের রচনার প্রতি আস্থাশীলতা তাকে উচ্চস্তরে উপনীত করেছে বলা অপেক্ষা রাখে না।
গ্রন্থের প্রথম গল্পের নাম ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ গল্পটি নিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকায় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক পৃষ্ঠাব্যাপী লিখেছিলেন, যা রশীদ করীমকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যায় অথবা তাকে প্রেরণা জোগায়, ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ পরকীয়ার গল্প, যা দেহ ছাড়া, তারপরও দেখা অনুভ‚তি কাজ করেছে, প্রেম আসলে কি লাল গোলাপ! যদি সার্থক হয় তাহলে হয়তো লাল, কিন্তু যদি ব্যর্থ হয়, তবে কি নীল গোলাপ অথবা কালো গোলাপ বলা হবে? মানব দুনিয়ায় সবাইকে ভালোবাসতে পারে কিন্তু ভালোবাসতে চাওয়া তো অপরাধ, তারপর ঘরে স্ত্রী-পুত্র সংসার ফেলেও তো মানুষ কিসের এক মোহ টানে প্রেমের সাগরে ডুবে মরে, ডুবতে বাধ্য হয়, অথচ প্রেমের মরা জলে ডোবে না বলে যে একটা কথা আছে, তারপরও প্রেম একটা লাল গোলাপ হয়ে যায়। মাঝে-সাঝে দেখা, একটু চোখের ইশারা একটু মুচকি হাসি, তাতেই কি প্রেম জানান দেয় নশ্বর পৃথিবীতে, হয়তো দেয় নয়তো সবই ফাঁকি আর ফাঁকির কারসাজি।
রশীদ করীম গল্পটিকে সার্থক রূপ দিতে গিয়ে প্রেমকে অনিবার্য বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, কারণ তারও সংসার আছে এবং সে সংসারে পুতুলের মতো একটা স্ত্রী আছে, আর আছে রাজপুত্রের মতো সন্তান… সেটাই হয়তো বাঁধা, মানুষকে এভাবেই পেছনে ফিরে আসতে হয়, নিজের প্রয়োজনে নয়তো প্রকৃতির বাধ্যবাধকতায়। গল্পের নাম দেখেই আন্দাজ করা একটা রহস্যময় বিষয়াদি আছে, সত্যিই অন্যরকমের কাহিনী যায়, ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্প’, এখানে উত্তমপুরুষে লেখক তার আত্মজৈবনিক কাহিনী বয়ান করেছেন, সে সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতা-ভ্রমণকাহিনীর একটা আবহ সৃষ্টি করেছেন গল্পের পরতে পরতে, রশীদ করীমের গদ্যে যে জাদু যে মুগ্ধতা সৃষ্টি করে তার রূপ এ’ গল্পে শতভাগই পাওয়া যায়। না, তিনি কোনো ভনিতা বা ভন্ডামির প্রশ্রয় দেন না, সোজা সাপটা ভাষায় একের পর এক গল্প বলে যেতে বেশি পছন্দ করেন। কলিকাতার জীবন আর বাংলাদেশের জীবন এবং বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক এবং অভিনেতাদের সঙ্গে তার যে কথোপকথন-ভ্রমণ এবং আলাপচারিতা তার পূর্ণাঙ্গ একটা দলিল ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্প’ এ তা ফুটে উঠেছে, শব্দ চয়ন-ভাষা ব্যবহারে তিনি বরাবরই বড় বেশি সংযমী বলা যায়। প্লেনের যাত্রা বাসের যাত্রা, রাজশাহী-নাটোরের মতো শহরগুলো তার কলমে অন্য এক মাত্রায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে, তার ভেতরে আছে ভালোবাসা-ভালোলাগা, হয়তো সবই তা প্রেমের হাতছানি। সব কিছু মিলিয়ে গল্পটিকে শুধু গল্প না বলে আরেকটু বেশি বলাও যায়। রশীদ করীম ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক ধরে সামনে এগিয়ে গেছেন, আবার কখনো বা পেছনেই থেকে গেছেন নিজের অগোচরে, আর ইতিহাসে ওই প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসাসের মতো মুখ ডুবিয়েই থাকেননি, নিজের আপন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন বাস্তবে।
‘প্রথম প্রেম’ গল্পটিকে রশীদ গ্রন্থের নামকরণ করেছেন, গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুকে ঘিরে, অসাধারণ একটি পাঠযোগ্য গল্প, হৃদয় ছুঁয়ে যায়, ঘটনা পরম্পরা বেশ সহজ সরল তবে গাম্ভীর্যময়, উনিশ’শত একচল্লিশ সালের সাতই আগস্ট, গল্পকারের বয়স নেহাতই অল্প, ক্লান টেনের ছাত্র, স্কুল ফাঁকি দিয়ে ম্যাটানি শো’ তে রূপম সিনেমায় যায়, কিন্তু সেখানে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক, গেটের ওপরে লেখা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে আজ সব শো বন্ধ। তার মানে রবীন্দ্রনাথ মারা গেছে, সে সময় গল্পকথক রবীন্দ্রনাথের লেখা সম্পর্কে খুব একটা বেশি ধারণা ছিল না, যদিও শরৎচন্দ্রের ওপর তার বেশ আসক্ত ছিলেন, তারপর রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রা আসছে দেখে গল্পকথক সেদিকে একবার দেখবার জন্য যেতে থাকে, তার গান মোহিত করেছে সব বয়সের মানুষকে, আজ তার মৃত্যুতে সে শবযাত্রার সঙ্গী হতে সবাই মিলেছে লোকে-লোকারণ্য, কাজী নজরুল ইসলাম ও ফজলুল হক সাহেবও আছেন, প্রচণ্ড ভিড়, সেখানে একটা খুব ফর্সা মেয়ে, গায়ে কালো রঙের সিল্কের হাতাকাটা ব্লাউজ, চেহারায় আভিজাত্যের অনেক ছটা গল্পকথক দেখতে দেখতে বিমোহিত হয়ে যায়, ভুলে যায় রবীন্দ্রনাথকে, পরমসুন্দরী শব্দটা যেন ওর জন্যই একমাত্র, সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই কিন্তু একসময় ওই মেয়েটি উজ্জ্বল দৃষ্টি কাড়া নক্ষত্রের মতো চোখ যার, গল্পকথকের দিকে তাকিয়ে সুইজ ডোরটি এক মুহূর্তের জন্য খুলে ধরল মেয়েটি, ‘চলে এসো’। কাকে ডাকছে, বুঝতে দেরি না হলেও গল্পকথক মেয়েটিকে একবার দেখে নিয়ে হারিয়ে ফেলে ভিড়ের মধ্যে, ‘প্রথম প্রেম’ গল্পের একটাই জিজ্ঞাসা, মেয়েটি কে ছিল, তুমি মেয়ে আমাকে জায়গা দিয়েছিলে, হয়তো সেই তার প্রথম প্রেম।
আর মানুষ তো বাল্যপ্রেমকে জীবনভর ভুলতে পারে না, ভোলা যায় না, সে চিরজাগুরূক হয়ে অস্থিমজ্জায় স্মৃতির ক্যানভাসে মিশে থাকে। এভাবেই মানুষ প্রেমের তাছে পরাজিত হয়, প্রেম হয় বলীয়ান মহৎ থেকে মহত্বর।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়