এক টেবিলে আবাসন খাতের সব সেবা দিতেই বিটিআই ব্রোকারেজ

আগের সংবাদ

সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ, ভেতরে ও বাইরে

পরের সংবাদ

ফল চাষে বিপ্লব ঘটাবে বারোমাসি আম

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ , ৯:৪০ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ , ৯:৪১ অপরাহ্ণ

পৃথিবীর বহু দেশে বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়াতে বছরের বারো মাসেই আম উৎপাদিত হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ফল বিজ্ঞানীরাও বসে নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পাহাড়তলী কেন্দ্র সম্প্রতি বারি ১১ জাতের একটি বারোমাসি আমের জাত উদ্ভাবন করে সারাদেশের আমচাষিদের মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ জাতের আম বছরে তিনবার উৎপাদিত হয়।

এক সময় আমের চাষ শুধু দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কয়েকটি জেলায়ই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আম্রপালি ও মল্লিকার মতো দুটি জাতের প্রবর্তনের ফলে আমের চাষ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কাপ্তাই, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, পঞ্চগড় ও বরিশালেও দেখা যায় সুমিষ্ট আমের চাষ। যে ময়মনসিংহ, সিলেট, বগুড়া, রংপুরের মতো বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় মোটেই আম চাষ হতো না সেসব জেলাতেও এখন ফলের রাজা আম দেখা যায় বসতবাড়ির আঙিনায়। আমাদের দেশে আম প্রাপ্তি জ্যেষ্ঠ-ভাদ্র মাসেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ভোজনরসিক বাঙালি বারো মাসই আমের স্বাদ উপভোগ করতে চায়। পৃথিবীর বহু দেশে বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়াতে বছরের বারো মাসেই আম উৎপাদিত হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ফল বিজ্ঞানীরাও বসে নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পাহাড়তলী কেন্দ্র সম্প্রতি বারি ১১ জাতের একটি বারোমাসি আমের জাত উদ্ভাবন করে সারাদেশের আমচাষিদের মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ জাতের আম বছরে তিনবার উৎপাদিত হয়। জাতটি বসতবাড়ির আঙিনা, ছাদবাগানের ড্রাম, রাস্তার ধার, অফিস-আদালত এবং শিক্ষাঙ্গনের অব্যবহৃত জায়গায়ও রোপণ করা যায়। গাছের আকৃতি ছোট। আম খেতে সুস্বাদু। একই গাছে মুকুল, গুটি ও পাকা আমের নজরকাড়া দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া থাইল্যান্ডের বারোমাসি আম, কাটিমন সারাদেশের শৌখিন বাগানিদের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার আবুল কাশেম নামের এক ফলচাষি ও নার্সারি মালিক এ জাতের ২২ বিঘা জমিতে আমের চাষ করেন। তার সফলতার কাহিনী দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষ করে চ্যানেল আইয়ের মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হলে সারাদেশের মানুষের মধ্যে কাটিমন জাতের আম চাষে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বৃক্ষমেলায় দেখা যায় কাটিমন জাতের আমের ব্যাপক চাহিদা। চুয়াডাঙ্গা জেলার বাঁদা গ্রামের আবুল কাশেম প্রথম ৬ বিঘা জমিতে ৬০০টি কাটিমন জাতের আমের চারা রোপণ করেন। চারা রোপণের দেড় বছর থেকেই গাছে আম ধরতে শুরু করে। সাড়ে চার বছরের একটি আম গাছে ১০০টির মতো আম পাওয়া যায়। চারটি আমের ওজন এক কেজি। মৌসুমে প্রতি কেজি আম বিক্রি হয় ২৫০ টাকা দরে। অমৌসুমে আরো বেশি দামে এই বারোমাসি আম বিক্রি হয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে রয়েছে আমটির ব্যাপক চাহিদা। আমটিতে আঁশ নেই। পাকলে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। খেতে খুব মিষ্টি ও সুস্বাদু। আমের চামড়া কাগজের মতো পাতলা। ১০ থেকে ১৫ দিন স্বাভাবিক অবস্থায় সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এই আম কাঁচা অবস্থায় খেলেও মিষ্টি লাগে। প্রোনিং বা অঙ্গজ ছাঁটাই এই আমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রোনিং করলে বেশি ডালপালা বের হয়। গাছ খাটো ও ঝোপালো হয়। এক ডালে ৪-৫টি আম ধরে। একবার প্রোনিং করে ৫টি এবং দুবার প্রোনিং করে এই জাতের গাছে ১৩টি পর্যন্ত ডাল পাওয়া গেছে। জাতটির বড় বৈশিষ্ট্য হলো- ১. বছরে তিনবার আম ধরে এবং প্রতি গাছে আমের সংখ্যাও বেশি। ২. প্রতিটি আমের ওজন গড়ে ২৫০ গ্রাম। লম্বাটে জাতের এই আম পাকলে হলুদাভ সবুজ রং ধারণ করে। ৪. আমে কোনো আঁশ থাকে না। ৫. রোগবালাই নেই বললেই চলে। ৬. বাগান পর্যায়ে আমের জাতটির পাইকারি দাম ২৫০ টাকারও বেশি। ৭. স্বাভাবিক কক্ষ তাপমাত্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত অনায়াসে সংরক্ষণ করে রাখা যায় এ জাতের আম। এই আমের চাষ পদ্ধতিও সহজ। তেমন পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। প্রতি বিঘা জমিতে আম চাষের জন্য ১০০টি চারার প্রয়োজন হয়। সারি থেকে সারি দূরত্ব দিতে হয় ১২ ফুট। প্রতি বিঘা জমিতে আম চাষের জন্য খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আম রোপণের প্রথম বছর ১ বিঘা জমি থেকে ১ লাখ টাকার এবং দ্বিতীয় বছরে ২-৩ লাখ টাকা এবং চতুর্থ বছর থেকে পুরোদমে ফলন পাওয়া যায়। প্রতি গাছে ১০০টি করে আম হলে ১০০টি গাছে ১০ হাজার এবং প্রতিটি আমের ওজন হয় ২০০ গ্রাম। প্রতি কেজি আম ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়।
আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে নামা ত্রিশাল গ্রামে আব্দুর রহমানের বাড়ি। আব্দুর রহমান আজ থেকে ৩০ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। যেখানে দীর্ঘ ১০ বছর চাকরি করার পর বাড়ি ফিরে আসেন। দুই একর জমি কিনে মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি করেন। পুকুরে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, রুই-কাতলাসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের চাষ করেন। অন্যদিকে পুকুরপাড়ে চাষ করেন বিভিন্ন জাতের ফল, শাকসবজি ও চিবিয়ে খাওয়া রংবিলাস জাতের আখ। বর্তমানে দেশে বছরে ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। বারোমাসি আমের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমের উৎপাদন দেড় থেকে দুই গুণ বাড়ানো সম্ভব।
আব্দুর রহমানের এক বন্ধু ছিলেন। তার বাড়ি ছিল সাতক্ষীরায়। তার সাতক্ষীরার বন্ধু চাকরি শেষে মালয়েশিয়া থেকে স্বদেশে আসার পথে ৪-৫টি কাটিমন আমের কচি ঢাল বা সায়ন নিয়ে আসেন। সায়নগুলো এক নার্সারিতে দিয়ে সেগুলো থেকে বারোমাসি জাতের আমের চারা তৈরি করেন। প্রতি বছরই বাড়াতে থাকে আমের চারা সংখ্যা। এই খবরটি আসে আব্দুর রহমানের কাছে। তিনি সাতক্ষীরায় বেড়াতে গিয়ে সেখান থেকে ২টি বারোমাসি জাতের আমের চারা নিয়ে আসেন এবং সেই চারা রোপণ করে পরের বছর থেকে কলমের চারা তৈরি করেন। প্রতি বছরই চারা সংখ্যা বাড়াতে থাকেন। পুকুরের চার পাশে লাগাতে থাকেন। পুকুরের উত্তর-দক্ষিণ পাড়ে ১৫টি বড় আম গাছ আছে। এসব গাছে সারা বছরই ফল ধরে। তিনি অমৌসুমে ফল বিক্রি করেন। চারা তৈরি করে বিক্রি করেন। গত বছর চারা ও আম বিক্রি করে তিনি ৭ লাখ টাকা আয় করেন। তার আম চাষের এই খবর আশপাশের গ্রাম ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়লে বারোমাসি আম চাষে মানুষের মধ্যে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তাই বছরব্যাপী আম উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হলো- ১. দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি নার্সারিগুলোতে বারোমাসি বারি আম ১১, কাটিমন ও কিউজাই জাতের চারা কলম সুলভমূল্যে ফলচাষিদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। ২. প্রতিটি জেলার সরকারি হর্টিকালচার নার্সারিগুলোতে বারোমাসি জাতের আমের চারা ভর্তুকি মূল্যে জনসাধারণের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। ৩. বারোমাসি আমের চাষ পদ্ধতি, পরিচর্যা পোকা ও রোগ দমন সম্পর্কে আমচাষি ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ৪. বর্তমান সরকার গৃহীত বাড়ির আঙ্গিনায় পুষ্টি বাগান প্রকল্পে বারো মাসের আমের চারা বিনামূল্যে কৃষকদের মধ্যে প্রদান করতে হবে। ৫. দেশের প্রতিটি গ্রামে এবং শহরের পাড়া-মহল্লার ছাদবাগানে বারোমাসি আমের প্রদর্শনী স্থাপন করতে হবে। ৬. নার্সারি মালিকদের মধ্যে সরকারিভাবে বিনামূল্যে বিভিন্ন জাতের বারোমাসি আমের মাতৃগাছ সরবরাহ করতে হবে। ৭. থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া থেকে অধিক সংখ্যক বারোমাসি আমের জাত সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বারোমাসি আমের ওপর গবেষণা জোরদার করতে হবে। ৮. বারোমাসি আমের চাষ পদ্ধতি ও লাভ-লোকসান সংবলিত পোস্টার, লিফলেট, ফোল্ডার কৃষকের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। ৯. বারোমাসি আম চাষ সম্প্রসারণের জন্য প্রতিটি উপজেলায় ফলাফল প্রদর্শনী ও মাঠ দিবসের ব্যবস্থা করতে হবে।

নিতাই চন্দ্র রায় : কৃষিবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়