করোনায় জনসনের এক ডোজ টিকাই যথেষ্ট

আগের সংবাদ

এক টেবিলে আবাসন খাতের সব সেবা দিতেই বিটিআই ব্রোকারেজ

পরের সংবাদ

আমরা হারালাম একজন অভিভাবক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

দেশের এবং গণমানুষের একজন অভিভাবকে হারালাম। এই মানুষটিকে দেখেছি দেশের ক্রান্তিলগ্নে, দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন, তেল, গ্যাস, বন্দর জাতীয়সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমরা আর এই প্রথিতযশা গবেষক, সাংবাদিক, কলাম লেখকের নতুন নতুন সৃজনশীল চিন্তার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারব না ভেবে প্রতি মুহূর্তেই আহত হই, মর্মাহত হই। তিনি ছিলেন খুবই সাবলীল। তার লেখার সাবলীলতায় মুগ্ধ আমাদের পাঠক হৃদয়। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি সুখী-সমৃদ্ধ, শোষণ-বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক সমাজের। তাই আমরা দেখি তার প্রতিটি লেখায় গণমানুষের মুক্তির কথা। তিনি দেখিয়েছেন সত্য সবসময়ই শ্রদ্ধার। তিনি কখনো লোভ এবং লাভের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেননি। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী একজন সত্যিকারের মানুষ। তিনি সব সময় সাহস নিয়ে সত্যিটা বলে দিতেন। এই সত্যি বলার কারণে তাকে হুমকি শুনতে হয়েছে কিন্তু তবুও তিনি কখনো মিথ্যার সঙ্গে আপস করেননি।
রাজপথের নানা গণমুখী প্রতিবাদ ও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসভাপতি ছিলেন তিনি। সুন্দরবন রক্ষা, নদী ও দূষণবিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে থাকতেন। দেশের খনিজসম্পদ রক্ষার আন্দোলন তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য হিসেবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল ও উপকূল রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন আবুল মকসুদ। এছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে পশ্চিমা পোশাক ত্যাগ করে ভিন্নধর্মী এই পোশাক পরা ধরেছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পোশাকই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এই মিথ্যা অজুহাতে মার্কিনিরা ইরাকে হামলা চালায় এবং পুরো পৃথিবীটাকে অশান্ত করে তোলে, সৃষ্টি করে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ও কোটি মানুষের বেদনার কারণ। তারই প্রতিবাদে সৈয়দ আবুল মকসুদ দুই খণ্ড সেলাই ছাড়া সাদা চাদর পরা শুরু করেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ দেশের রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সংবাদপত্রে কলাম লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থায় যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। তিনি সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কলাম লিখতেন। কবিতার পাশাপাশি তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ রয়েছে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার বইয়ের মধ্যে রয়েছে প্রবন্ধ গ্রন্থ- যুদ্ধ ও মানুষের মূর্খতা, গান্ধী, নেহেরু ও নোয়াখালী, ঢাকার বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন, প্রচীত্য প্রতিভা, কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা, অরণ্য বেতার, বাঙালি জাতি বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি ও ধর্মীয় রাজনীতি, রবীন্দ্র রাজনীতি, নির্বাচিত প্রবন্ধ। জীবনী গ্রন্থ- মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন-কর্মকাণ্ড-রাজনীতি ও দর্শন, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য, ভাসানী কাহিনী, স্মৃতিতে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, গান্ধী মিশন ডায়েরি, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, বিশে^র শ্রেষ্ঠ দশ দার্শনিক, পথিকৃৎ নারীবাদী খায়রুন্নেসা খাতুন, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জীবন ও সাহিত্য, হরিশচন্দ্র মিত্র। এছাড়া তৎকালীন সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ এমন এক জাদুকর; যিনি কাগজ-কলমের জাদুতে আলো জে¦লে দিতে পারতেন পাঠকের মনে। আমাদের সংস্কৃতির মূল ধারা বজায় রাখতে তিনি ছিলেন একজন প্রথম সারির যোদ্ধা। বাঙালি জাতির অভিন্ন, সুদীর্ঘ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলেছিলেন তিনি। তার সৃজনশীল কর্ম, চিন্তার মাধ্যমে যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধাভরে।

শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর।
[email protected]

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়