প্রধানমন্ত্রী মোদীর নামে স্টেডিয়াম উদ্বোধন

আগের সংবাদ

ঢাকা দক্ষিণ আ.লীগ: সভাপতি-সম্পাদক পদ পাবেন না কাউন্সিলররা

পরের সংবাদ

মানবতাবাদী নেতা আলী আহাম্মদ চুনকা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১ , ৯:৪৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১ , ৯:৪৫ অপরাহ্ণ

বাঙালি জাতি যেসব কীর্তিমান সন্তানদের নিয়ে গর্ব করতে পারেন আলী আহাম্মদ চুনকা তাদের মধ্যে অন্যতম। সব্যসাচী ঘরানার এই কর্মবীর মানুষটি জীবনের প্রতিটি কাজে রেখেছেন অসাধারণ অবদান। জীবনের প্রথম দিক থেকেই তিনি রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ঢাকা শহরের কাছের নগরী হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন সংগ্রাম ছিল প্রতিদিনের কাজ। ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতিতে কার্যক্রম শুরু করেন। তার রাজনীতির মূল অঙ্গন ছিল আওয়ামী লীগের অধীনে। একপর্যায়ে শ্রমিক সমাজের দাবি আদায়ের সংগ্রামে যোগ দেন। নারায়ণগঞ্জের শিল্প, বন্দর, শিল্পকারখানা, খেটে খাওয়া শ্রমিক, দিনমজুর, অল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে নিয়ে জেলার সর্বত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। তার জন্ম শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জে ১৯৩৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর, একটি কৃষক পরিবারে। মেধাবী ও সাহসী চুনকা খুব অল্প বয়স থেকেই সমাজকর্ম ও রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। ছাত্রজীবনেই পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য রাজপথের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কর্মগুণে খুব সহজেই তিনি নিজ এলাকার সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রিয়জন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। নিজ এলাকা নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন সাহসী কর্মী হিসেবে তার রাজনীতিতে আগমন। রাজনীতি কর্মে শুরু থেকেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচার্য ও সাহস তার জন্য পাথেয় হয়ে কাজ করেছে। ছোটবেলা থেকেই নিজ এলাকায় দরিদ্র, অসহায়, গরিব, দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করে যে ভালোবাসা অর্জন করেন, রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করার পর নিজ শহর ও জেলার জনগণ তাকে অন্তরে ঠাঁই করে দিয়ে আন্তরিকভাব মূল্যায়ন করেছেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন ছাত্রজীবন থেকেই।

১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশ এলাকায় প্রচণ্ড মহামারি দেখা দেয়। বসন্ত রোগে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। চুনকা তার সহকর্মীদের নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ১৯৬৩ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করতে তিনি তার কর্মীদের নিয়ে রাত-দিন পরিশ্রম করেন। ১৯৬৯ সালে ডেমরায় ভয়াবহ টর্নেডোর পর, ১৯৭০ সালে হাতিয়া স্বন্দ্বীপের জলোচ্ছ্বাসের পর এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি দলের নেতকর্মীদের নিয়ে বিপুলভাবে কাজ করে দেশের মানুষের, নিজ দলের নেতাকর্মী ও বঙ্গবন্ধুর প্রশংসায় সিক্ত হন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি এলাকার যুবক, তরুণদের নিয়ে ও দলীয় নেতাকর্মীদের সহযোগে মুক্তি বাহিনী গঠন করে কাজ করেন। তার নেতৃত্বে শহরের থানার অস্ত্রাগার লুট হয় এবং এসব অস্ত্র ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধের কাজে ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেন। স্বাধীনতার পরপর নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন অরাজকতা বন্ধ করতে তিনি বিশেষভাবে কাজ করেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে চুনকা দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করেন। ১৯৪৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর আহŸানে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নারায়ণগঞ্জে সফল করার কাজে তিনি মাঠের কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে অংশ নেন।
১৯৬২ সালে ২৬ বছর বয়সি চুনকা এলাকায় বিডি মেম্বার নির্বাচিত হন। শুরু হয় তার রাজনীতিতে নবতর অধ্যায়। ষাটের দশকের প্রতিটি বছর গেছে তার স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা কর্মকাণ্ডে। ঢাকার লাগোয়া শহর নারায়ণগঞ্জে দলের কেন্দ্রীয় সব কর্মসূচি সফল করার কাজে রাত-দিন মাঠের আন্দোলনে ছিলেন সরব। তার নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা সামাজিক জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ ও ১৯৭৮ সালে দুবার তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পৌরসভায় বিপুল উন্নয়নমূলক কাজ করেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশের উন্নয়নে কাজ করার সুযোগকে চুনকা ব্যাপকভাবে কাজে আত্মনিয়োগ করেন। চুনকা ছিলেন গণমানুষের নেতা। দৈনন্দিন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করে তিনি তার প্রমাণ করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অবহেলিত মানুষের দাবি আদায়ের আন্দোলনে থেকেছেন সাব্যস্ত। তিনি রাজ ওস্তাগার সমিতি, নরসুন্দর সমিতি, নৌকা মাঝি সমিতি, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, নারায়ণগঞ্জ পাট শ্রমিক সমিতি, জাহাজী শ্রমিক ইউনিয়নসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। এসব সংগঠনের অগণিত খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ে তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। এসব সংগঠনের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সারা বছর ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। সব সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবি আদায়ে ছিলেন তিনি আপসহীন। রাজপথই ছিল তার ঠিকানা।

তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকদের অধিকার বাস্তবায়নের বেলায় ছিলেন সোচ্চার। নিজ এলাকার বঞ্চিত, অবহেলিত, শোষিত, পেছনে পড়ে থাকা শ্রমিক, কুলি, মজুর, উঁচুস্তর, নিম্নস্তর, মধ্যবিত্তসহ আপামর মানুষের সঙ্গে একাত্ত হয়ে কাজ করেছেন। তার দিনের কাজ শুরু হতো ভোরে রাজপথে কাজ করা কুলি মজুরদের কাজের তদারকির মাধ্যমে। তাদের সঙ্গে আন্তরিক ও প্রাণবন্ত ব্যবহার করতেন। ওদের সুখ-দুঃখের খবরাখবর রাখতেন। ফলে এসব খেটে মানুষই হয়ে উঠে তার পরম শক্তি ও এগিয়ে চলার সাহস।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দলের সব নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। প্রকাশ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়, কিন্তু আলী আহাম্মদ চুনকা আত্মগোপন করেননি। সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রকাশ্যে রাজপথে প্রতিবাদী অনুষ্ঠানমালা পরিচালনায় কাজ করেন। এক পর্যায়ে তাকেও জেলে যেতে হয়। কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীদের সাহস দিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে জাতির পিতার হত্যার বিচারের দাবি জানানোর কাজে সহায়তা করেন।

তিনি আজীবন সংস্কৃতি অঙ্গনের কর্মীদের সহায়তা করতেন বিভিন্নভাবে। তার বাড়ি ছিল সর্বস্তরের মানুষের জন্য এক প্রিয় ঠিকানা। দিনের শুরু থেকে অনেক রাত পর্যন্ত তার বাসভবন এলাকার মানুষের সমাগম ঘটত। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন জননেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। রাজনীতিতে তার কোনো উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল না। কাজ করার মাঝে তার ছিল বিপুল জনসেবার আনন্দ। রাজনীতির কাজের পাশাপাশি তিনি জনকল্যাণমূলক কাজের একজন অগ্রসেনানি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব, সুধীজন পাঠাগার, নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের জায়গা বরাদ্দ দেন। শহরের জামতলা ঈদগাহ মাঠ, লাঙ্গলবন্দ স্নানাগার, নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল, সোনারগাঁও জাদুঘর, জিমখানা মাঠ, পৌর পাঠাগার, চাষাঢ়া স্টেডিয়াম তিনিই সংস্কার করেন। তারই বহু পরিশ্রমে শহরের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে।
১৯৮৪ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি তিনি মারা যান। তার কন্যা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী পিতাকে নিয়ে লেখা ‘বাবা, তুমি আমার অহংকার’ শীর্ষক লেখাটিতে বলেছেন, ‘বাবার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি চলমান যে কোনো ঘটনাকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে আলাদাভাবে চিন্তা করতেন এবং সেই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেছেন। পৌরসভার প্রথম পাঁচ বছরের সাফল্য তাঁকে দ্বিতীয় দফা ১৯৭৮ সালে আবার বিজয়ী করল। তিনি রাজনীতিতে একজন সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী ঘরানার এবং তার বিশিষ্ট বন্ধু খাজা মহিউদ্দিন ও খোকা মহিউদ্দিনের প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে নির্বাচন করলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোদের মধ্যে যে জয়ী হয়ে আসবে, সেই আমার লোক’ বাবা অনেক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। বঙ্গবন্ধু বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আমি জানতাম চুনকা তুই জয়ী হবি, আমার কালো মানিক আয় আমার বুকে আয়’। এভাবে বাবাকে আলিঙ্গন করলেন বঙ্গবন্ধু।

হালিম আজাদ : কবি ও সাংবাদিক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়