সুরক্ষার জন্য টিকা নেয়া জরুরি

আগের সংবাদ

মাতৃভাষার শক্তিতে জাতি ও জাতি-রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়

পরের সংবাদ

ভিপি নূরের নতুন জোট এবং বাম বলয়

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১ , ১০:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১ , ১০:১৫ অপরাহ্ণ

টকশোতে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর বিপ্লবীদের মতো কথা বলেন। ভালো লাগে তাকে, এখনো তাকে পছন্দ করি, যখন তিনি জনবান্ধব ইস্যু নিয়ে থাকেন সোচ্চার। কিন্তু তার ছাত্র অধিকার পরিষদ দেশের আপামর জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারেনি এখনো, এটাই সত্য। তবে তার একটা ইমেজ তিনি তৈরি করতে পেরেছেন ইতোমধ্যে, বিশেষত তরুণদের মাঝে। কিন্তু তারও সংগঠনের বিভক্তির খবর দেখেছে মানুষ। বাংলাদেশে চলছে রাজনীতির বন্ধ্যত্ব, তারপরও একটা অবস্থান ভিপি নূরের আছেই। যদিও আপামর জনগণের কাছে পৌঁছাতে তিনি কতটুকু এগিয়ে সে প্রশ্নটা আছে।
তার রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে তিনি হয়তো একাধিক ডানা (উইং) খোঁজছিলেন, কিন্তু কোনো সংগঠনই তাকে এই হিসেবে নির্ভর করতে পারছে না, ছাত্রত্ব থেকে সদ্য বেরিয়ে বাংলাদেশে চটজলদি নেতা হওয়ার মতো অবস্থা এখন নেই। যদিও একটা নিষ্প্রাণ সময়ে নূর রাজনীতিতে একটা প্রাণ দিয়েছিলেন অন্তত তরুণদের মাঝে। বিশেষত বারবার তার ওপর আক্রমণ-নির্যাতন হওয়ার পরও তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন, দাপিয়ে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। মাঠে ছিলেন তিনি এবং অবিসংবাদিত নেতা হয়ে গিয়েছিলেন। ডাকসু নেতা হতে যে ত্যাগ কিংবা বিসর্জনের প্রয়োজন অতীতের ছাত্রনেতাদের মাঝে আমরা দেখেছি, তার প্রায় পুরোটাই ছিল তার ছাত্ররাজনীতির ক্যারিয়ারে। প্রচলিত ধারার ছাত্ররাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কিংবা তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়েই এগিয়ে এসেছিল এবং খুব অল্প সময়েই তিনি নিস্তরঙ্গ রাজনীতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন। এবং দুই যুগেরও বেশি সময় পরে ছাত্ররাজনীতিতে তথা বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হয়ে।
খুব স্বাভাবিকভাবে সেজন্যই হয়তো নিজেকে নিয়ে অর্থাৎ নূর তার কনফিডেন্স নিয়ে অতি আশাবাদী এবং সবকিছুর নেতৃত্বেই থাকতে চাইছেন তিনি। যা সরকারবিরোধী মাঠের রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই মেনে নিচ্ছে না কিংবা নেবেও না। সে হিসেবে টকশোনির্ভর আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আড়ালে-আবডালে বিএনপির মতো প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও নূরের কার্যক্রমকে পছন্দই করছে। কারণ নূর এখন যা করছেন, তা প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলও পারছে না। সরকারের রোষানলের কারণে হোক কিংবা জনগণ বিএনপির ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণেই হোক বিএনপি এখন বিবৃতিনির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। যদিও সরকার এখনো বিএনপিকেই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মাঠে কিংবা বক্তৃতায় ওই খোঁড়া অশ্বের বিরুদ্ধেই কথা বলছে। সত্যি কথা হলো, নূরের একটা বিশাল দর্শক-শ্রোতা আছে বিশ্বব্যাপী। এবং জনপ্রিয়তার এই জায়গাটাই তিনি ধরে রাখতে চাইছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক কিংবা সামজিক অবস্থা এখন যে পর্যায়ে আছে, সে জায়গায় লাখো ডিজিটাল দর্শক-শ্রোতা দিয়ে আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার মতো পরিবেশ নেই। এই যখন তার অবস্থা তখন যোগ হয়েছেন জোনায়েদ সাকী। সাকী-নূরের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয়েছে ৪টি সংগঠন। সংগঠন হিসেবে জোনায়েদ সাকীর সংগঠনে (গণসংহতি আন্দোলন) ক’জন মানুষ আছে তা রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট মানুষদের অজানা নয়। কিন্তু তবুও তিনি বাম গণতান্ত্রিক জোট নামক জোটের শরিক। সিপিবি-বাসদের সঙ্গে তার সংগঠনের নাম যতটুকু উচ্চারিত, তার চেয়ে অধিকভাবে উচ্চারিত সাকীর নাম বাম গণতান্ত্রিক জোটে। এমনকি দেশের একটা ক্ষুদ্র অংশের মাঝেও তার একটা ইমেজ আছেই। কারণ তিনি বলতে পারেন। বিশেষত যারা টকশো দেখেন, তারা তাকে চেনেন।
এই ইমেজের ওপর ভর করে বিভিন্ন সময় জাতীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সাকীর ডাকও আসে। এ রকমই একটা ডাক এসেছিল তার গত জাতীয় নির্বাচনের আগে। ড. কামাল হোসেনের ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জোট বাঁধতে তখন হুড়মুড় করে অনেকেই গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। আওয়ামী লীগ থেকে সিটকে পড়া ডাকসাইটে নেতা থেকে শুরু করে বিএনপি সবাই এই প্রক্রিয়ায় মাঝ দিয়ে একটা কিছু করতে চেয়েছিলেন। সে সময়ও জুনায়েদ সাকী বাম গণতান্ত্রিক জোটে ছিলেন। ক্ষমতার পালাবদল হতেই পারে, এই বিবেচনায় অতি বাম ঘরানার ওই তার্কিক সেদিন বিএনপির কলকাঠিতে ড. কামালের এ ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন। এবং তিনি বাম গণতান্ত্রিক জোটকে অবজ্ঞা করেই সেদিন এমনকি মির্জা ফখরুল যে সভায় উপস্থিত ছিলেন সেই সভায় বক্তৃতা দিয়েছেন এবং ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে সংসদমুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। কোনো প্রক্রিয়াই ধোপে ঠেকেনি। আন্দোলন করতে হলে জনগণকে নিয়েই করতে হয়। শুধু ফেসভ্যালুতে পাইওনিয়ার হওয়া যায় না। সুতরাং জোনায়েদ সাকী তো ছিটকে পড়বেনই। পড়লেনও। সেখানে কোনো বিস্ময় ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী অতি বিপ্লবীরা যেমন কখনো সামরিক শাসকের অংশীদার কখনো উচ্ছিষ্টবিরোধী দলীয় নেতা আর হাল আমলে নেড়া হয়ে মন্ত্রিত্ব থেকে বিদায় এই-ইতো অতি বিপ্লবীদের ক্রমধারা। কিন্তু কেন যে বামজোট সে সময় ব্যাপারটাকে পাত্তাই দিল না, তা এখনো ভেবে পাই না। যে সাকী তাদের জোটের বাইরে গিয়ে এমনকি বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করতে মঞ্চ কাঁপালেন, সেই মানুষটাকে আবারো তারা টেনে নিলেন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন সময়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটিরও কেউ কেউ সাকীর এই উল্লম্ফন নিয়ে কথা তোললে পার্টি তাদের ভালো চোখে দেখেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে লেখায় ভর্ৎসনা শোনতে হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট তো আন্দোলন কম করছে না। মিটিং-মিছিল প্রতিনিয়তই হচ্ছে। কিন্তু বামজোটের বিভিন্ন শরিক দল কিছুটা কৌশলগত কারণেই হয়তো আওয়ামী লীগের এমন বিরুদ্ধাচরণে যাচ্ছে না, যাতে বিএনপি কিংবা জামায়াতিদের উত্থান হয়। এবং সরাসরি ভারতবিরোধী স্ট্যান্ডও নিচ্ছে না। যে ব্যাপারটা হয়তো সাকী ব্যক্তিগতভাবে কিংবা তার সংগঠন (যেটি এখনো রাজনৈতিক দলের মর্যাদাই পায়নি পুরোপুরি) ভালো চোখে দেখছে না। সাকী অতি বিপ্লবী চেতনা নিয়ে একটা ভিন্ন প্লাটফর্ম বানাতে চাইছেন। আর এই জায়গাটাতে নূরও সোচ্চার। সেজন্য ভিপি নুরুল হকের উচ্চারণ বিএনপি ঘরানার সব মানুষকেই টানছে। ভারতবিরোধী যে বলয় বাংলাদেশে আছে তারাও নূরকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বামপন্থিসহ অন্য সবাই এর বিরুদ্ধে কথা বলছে, আন্দোলন করছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এবারো বাম গণতান্ত্রিক জোটে থেকেও নূরের সঙ্গে আরেক জোট করলেন জোনায়েদ সাকী। বাম গণতান্ত্রিক জোট ব্যাপারটাকে কীভাবে নিচ্ছে, তা হয়তো তারাই ভাববে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বামজোটে সাকী যেন অনিবার্য এক নাম। বামজোটে সিপিবি বৃহৎ দল, তারপর বাসদ বা অন্যান্য দলের কর্মী-নেতার কাছে সাকী সাংগঠনিকভাবে অবশ্যই দুর্বল। অথচ সিপিবি-বাসদ তাদের নিজের অস্তিত্ব-ঐতিহ্য-শক্তি নিয়েও সাকীকে লাই দিয়ে যাচ্ছে।
এই-ই হলো আজকের বাম বলয়ের দেউলায়িত্ব। নব্বইর দশকের কমরেড ফরহাদের সিপিবি আজ পথ হারাচ্ছে। দৃঢ়তা নিয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ নেই বলেই সাকীদের মতো পলে পলে লাফ মারাদের আদর করতে হয়। দেশ আর জাতির এই সময়ে যখন বামদের শক্ত ঐক্য প্রয়োজন, সেখানে ওই অতি বিপ্লবীদের আশকারা দিয়ে নিজস্ব পার্টিতে দ্ব›দ্ব সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে শুধু পার্টির অভ্যন্তরেই নয়, বাম বলয়ে যাদের আস্থা-বিশ্বাস আছে তাদের হৃদয়ে চিড় ধরানো হচ্ছে আর বাম আন্দোলন ক্রমেই পথ হারাচ্ছে, ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে বাম দলগুলো, শীর্ণ হচ্ছে বাম শক্তি।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়