নির্বাচনে দলীয় মনোনীত বনাম বিদ্রোহী প্রার্থী, সংঘর্ষ ও বিরোধ

আগের সংবাদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা নেই, উৎসবে ভাটা

পরের সংবাদ

প্রশ্নবিদ্ধ করতেই ভোটে বিএনপি

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১ , ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১ , ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

মাঠে থাকেন না নেতা-প্রার্থীরা।

কেন্দ্রের মনোনয়ন বাণিজ্যই মুখ্য।

ভোটের মাঠে লড়াইয়ের মানসিকতা অনুপস্থিত।

সরকার-ইসিকে দোষারোপ করাই লক্ষ্য।

জাতীয় সংসদ, ঢাকা সিটি করপোরেশন, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা নির্বাচনসহ কোনো ভোটেই সুখকর ফল নেই বিএনপিতে। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি শক্তিশালী জনভিত্তিসম্পন্ন দল হিসেবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিএনপির যে ভূমিকা থাকার কথা; তা দৃশ্যমান নয় মোটেও। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের চেয়ে দলটির নীতিনির্ধারকদের কাছে মনোনয়ন বাণিজ্যই হয়ে উঠে মুখ্য। যারা মনোনয়ন পান তাদেরও ভোটের মাঠে দেখা যায় না বললেই চলে। প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়ে না। নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার কোনো উদ্যোগ থাকে না। ভোটের দিন কেন্দ্রে এজেন্ট থাকে না। দুপুরের আগেই প্রার্থীরা ‘বর্জনের’ ঘোষণা দিয়ে ঘরে বসে থাকেন। ভোটের মাঠে লড়াইয়ের মানসিকতাই থাকে না বিএনপি প্রার্থীদের। এমন পরিস্থিতিতে পরাজয় ছাড়া ভিন্ন ফলাফল আশা করা যায় না। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে একই অবস্থা দেখা গেছে।

সর্বশেষ চলমান পৌরসভা নির্বাচনের চতুর্থ ধাপ শেষে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র হয়েছেন মাত্র ৭ জন। এই ফল বিপর্যয়ের জন্য আত্মসমালোচনা না করে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দোষারোপ করেই দায় শেষ করেছেন দলীয় প্রার্থী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে নির্বাচনে অংশ নেয় কেন বিএনপি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নানা অভিযোগ তুলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই বারবার ভোটে যায় বিএনপি।

দলীয় সূত্র মতে, স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখতে প্রার্থী হওয়া, ভোটের মাঠ মনিটরিংয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের উদাসীনতা, মামলা-হামলার ভয়ে মাঠ থেকে প্রার্থীর পালিয়ে থাকা এবং ভোটের আগেই হেরে যাওয়ার মনোভাবের কারণেই সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে পরাজিত হচ্ছে ‘ধানের শীষ’। দৃশ্যত ফলাফল কী হবে তা জেনেও সব নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, সরকার প্রহসনের রাজনীতির মাধ্যমে ভোটের ফল ছিনিয়ে নেয় এবং নির্বাচন কমিশন এ কাজে সহায়তা করে। এদের মুখোশ উন্মোচন করতেই মূলত দল ভোটে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া মাঠের রাজনীতিকে সচল রাখা এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের অংশ হিসেবেই নির্বাচনের অংশ নেয় বিএনপি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, হবে না। এটা প্রমাণ করতেই বারবার নির্বাচনে যায় বিএনপি। তিনি বলেন, নির্বাচনের নামে যে তামাশা হচ্ছে তা দেশের জনগণ দেখছে। নির্বাচনে সরকারের মুখোশ বারবার উন্মোচন হচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নেই বলা চলে, গণতন্ত্র চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে।

ভোটের মাঠে দেখা যায়, প্রতিটি নির্বাচনেই বিএনপি ভোটের অনাস্থা প্রকাশ ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছে। কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপি, জালিয়াতি, এজেন্টদের বের করে দেয়াসহ নানা অভিযোগ করে আসছে। নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ চাইছেন। তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ফের ঝাঁপিয়ে পড়ছেন নির্বাচনী প্রচারণায়। নমিনেশন জমা দেয়ার পরই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন প্রার্থীরা।

কেউ কেউ দলীয় নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে নমিনেশন কিনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ফলাফল আগাম বিক্রি করে ভোটের মাঠ থেকে পালিয়ে বেড়ান। শুধু তাই নয় তৃণমূল নেতাদের ভোটের মাঠে নামিয়ে খোঁজ রাখছেন না কেন্দ্রীয় নেতারা। নির্বাচনী মনিটরিং টিমের নেতারা ঢাকায় থেকেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে খুঁজে পাচ্ছেন না এজেন্ট। উদাহরণ হিসেবে এক নেতা বলেন, শরীয়তপুর পৌরসভার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর কোনো তৎপরতা ছিল না। বিএনপি এজেন্টদের তালিকা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিলেও বেশির ভাগ কেন্দ্রে এজেন্ট দেখা যায়নি। তাদের কোনো অভিযোগও ছিল না।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলটি ঘোষণা দিয়েছিল, এই সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না। তবে এরপর গত দুই বছরে সংসদের প্রায় সবগুলো উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছে দলটি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করেও নির্বাচনে অংশ নেন অনেকে। এরই জেরে দুইশ নেতাকে বহিষ্কার করা হয় বিএনপি থেকে। পরে বাধ্য হয়ে দল শেষ দুই ধাপের নির্বাচনে প্রার্থী দেয়।

সূত্র জানায়, ময়মনসিংহের ফুলবাড়ী পৌরসভায় মেয়র পদে জোর চেষ্টা-তদবির করে দলীয় মনোনয়ন পান চাঁন মাহমুদ। ভোটে তিনি তৃতীয় হয়েছেন। সেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে। এ দুজনের অর্ধেক ভোটও পাননি চাঁন মাহমুদ। সেখানে নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার খবরও পাওয়া যায়নি। একইভাবে কুষ্টিয়া, কুমারখালী, নলডাঙ্গা, গোপালপুর, কেন্দুয়াসহ অনেক পৌরসভায় বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই ছিল না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বলেন, ভোট জালিয়াতি এখন আওয়ামী লীগের রুটিন ওয়ার্ক। তবে আমাদের যেসব প্রার্থী পৌর নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তারা যে সবাই শেষ পর্যন্ত মাঠে থেকেছেন সেটিও বলা যাবে না। যারা শেষ পর্যন্ত থেকেছেন তাদের কেউ কেউ জয়ী হয়েছেন। সব বিষয়ই কেন্দ্র থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার টার্গেটে নয়; স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখতেই চলমান পৌর নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বিএনপির নেতারা। দলে শক্ত অবস্থান ধরে রাখা এবং নিজের পরিচিতি বাড়াতেই ভোটের মাঠে নামছেন তারা। এ কারণেই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে মরিয়া ভাব দেখালেও পরে তারা সরব থাবেন না। এছাড়া স্থানীয় নেতারা মনে করেন, সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় নেতাদেরই যেখানে আস্থা নেই সেখানে হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে মাঠে থেকে নতুন করে ঝামেলায় জড়ানো অর্থহীন। এসব কারণে নির্বাচনে টাকা-পয়সাও খরচ করতে আগ্রহী হন না কোনো কোনো প্রার্থী।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ভোটের চিত্রে দেখা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন, বিভিন্ন উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কেন্দ্রে কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। যার সর্বশেষটি দেখা গেছে সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে। বিএনপি এজেন্টদের তালিকা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিলেও বেশির ভাগ কেন্দ্রে এজেন্ট দেখা যায়নি। তবে যেসব পৌরসভায় ভোটের দিন পর্যন্ত প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন- সেসব জায়গায় ফল এসেছে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে। অন্তত মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতায় ছিলেন ধানের শীষের প্রার্থী। তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা, হামলা-মামলা দেয়ার বিষয়টি সত্য। তবে ভোটের দিন কেন্দ্রে শক্ত অবস্থান নেয়া, এজেন্ট রাখা এবং কেন্দ্রে ভোটার আনার ক্ষেত্রে তাদের ততটা সক্রিয় দেখা যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌর নির্বাচনে বিএনপির যোগ্য, ত্যাগী ও স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নেতাদের তুলে আনতে তৃণমূল শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ফল ভালো করতে ঢাকার শীর্ষনেতা ও সংশ্লিষ্ট জেলার কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের বলা হয়েছিল নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে কাজ করতে। সেটি অনেকেই করেননি। কেন্দ্রীয় নেতারা স্থানীয় পর্যায়ে গেলে ফল কিছুটা হলেও ভালো হয়। দিনাজপুর সদরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিনভর বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম চালিয়েছেন। ফলে সেখানে অনিয়ম কমেছে এবং দল ঘোষিত প্রার্থী সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম জয়ী হন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান এ সম্পর্কে বলেন, যেসব প্রার্থী মাঠে থাকেননি কিন্তু মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের তো অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। বিশেষ করে তৃণমূলের সুপারিশের ভিত্তিতেই এই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সুপারিশ করা নেতাদের কাছেও নির্বাচনের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হবে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়