সামরিক শাসন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গ

আগের সংবাদ

বাসায় ঢুকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত, মা-মেয়েসহ আহত ৩

পরের সংবাদ

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে চাওয়া-পাওয়া

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১ , ১০:১৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১ , ১০:১৩ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর। অনেক বছর কেটে গেছে। এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনাকে মজবুত ও টেকসই করতে দুর্নীতি থেকে শুরু করে সর্বপ্রকার দূষণের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা এবং দীর্ঘস্থায়ী যথাযথ অভিযানের মাধ্যমে দুর্নীতি-দূষণ-অনৈতিকতার অবসান ঘটানো, যাতে শাসনযন্ত্র দায়িত্বমুক্ত, ভারমুক্ত হতে পারে। সমাজে পচন ধরার আগেই অভিযানের কাজটি শুরু করা উচিত। গণপ্রজাতন্ত্রের সুনাম রক্ষা সুশাসন অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য যাতে সমাজের নেতিবাচক উপাদানগুলো আর বাড়তে না পারে।

‘ভোরের কাগজ’-এর জন্য বিশেষ লেখাটায় হাত দিতে গিয়ে হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল প্রথম শহীদ দিবসের (১৯৫৩) আবছা ভোরে উত্তেজক প্রভাতফেরিটির কথা। নগ্নপদে নিজ নিজ ছাত্রাবাস থেকে ভোরের হালকা হাওয়ায় মিছিল করে গানে-স্লোগানে আজিমপুর কবরস্থানের দিকে যাত্রা, শহীদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। ছবিটা এখনো স্পষ্ট।
পুলিশের চোখ এড়িয়ে রাতে কাগজে-কাপড়ে তৈরি শহীদ মিনারের মিনিয়াচার থেকে যাত্রা শুরু- যেমন মেডিকেল হোস্টেল, তেমনি কার্জন হল প্রাঙ্গণ থেকে যথাক্রমে আমাদের ও এফএইচ হলের ছাত্রদের।
এফএইচ হল, ঢাকা হলের ছাত্রদের কণ্ঠে রাজনৈতিক স্লোগান- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এর সঙ্গে গাজিউল হকের ‘ভুলবো না, ভুলবো না’ গানটি- যেটি বিখ্যাত ভারতীয় রাজনৈতিক স্লোগানধর্মী গান ‘ভুলো মাৎ, ভুলো মাৎ’-এর কথা ও সুরের অনুসরণে রচিত। মেডিকেল ছাত্রদের কণ্ঠে ভিন্নগান ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে’। পলাশীর মোড়ে তিনটি প্রভাতফেরি প্রায় মুখোমুখি- তৃতীয়টি মিটফোর্ড স্কুলের। সামনের মোটাসোটা ছাত্রটির মুখে টিনের চোঙ্গা- ওরা ‘ভুলবো না’ গানটিই গাইছে।
আজিমপুর কলোনির ঘুম ভেঙে গেছে গান ও স্লোগানের সুরে সুরে। তরুণ-তরুণীরা নিচে নেমে এসেছে, ঘুমকাতর গৃহিণীরা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে; মিছিলের দিকে তাদের দৃষ্টি। একুশের টানে তাদের ঘুমের সুখশয্যা ছেড়ে উঠে আসা। সেই রৌদ্রহীন হালকা কুয়াশা জমা ভোরে সারা ঢাকা শহর জাগ্রত একুশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে বলে। বিকালে মিছিলসহ আর্মানিটোলা ময়দানে জনসভা। এমনটাই ছিল প্রথম পর্বের শহীদ দিবসের কর্মসূচি। বাঙালি জাতীয়বাদ একুশের মহিমায় জাগ্রত।
ভাষা আন্দোলনের পরিণত বিস্ফোরক রূপ একুশের প্রভাব এতই প্রবল ছিল যে, তা রাজধানী ঢাকা ও শহর ছাড়িয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ও চাটমোহর থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত গ্রামাঞ্চল প্লাবিত করেছিল, ভাষা সচেতন হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতা। ফলে ১৯৫৪-এর প্রাদেশিক নির্বাচনে একুশ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের ধস নামানো বিজয় ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে, যুক্তফ্রন্টের হক-মন্ত্রিসভা গঠন যা কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্রে বানচাল হয়ে যায়।
সেই প্রতিক্রিয়ায় ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে ৬ দফা, ১১ দফার ভিত্তিতে সারাদেশ উত্তাল প্রাদেশিক স্বশাসনের চাবিতে। জাতীয়তাবাদী-প্রগতিবাদী এককাতারে রাজপথে জন্ম দেয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের। সেই পথ ধরে ইয়াহিয়ার বাঙালি গণহত্যার বিরুদ্ধে একাত্তরের রণাঙ্গনে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। সেই সঙ্গে প্রাপ্তি একটি নতুন মানচিত্র, আর একটি নতুন পতাকা, বিশেষ করে একটি গণতন্ত্রী সংবিধান, যার মূল সূত্র জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। নতুন রাষ্ট্রটির সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। এ সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে দুই শাসক জেনারেল; কিন্তু ক্ষত পূরণ করা হয়নি। অথচ ইতোমধ্যে পঞ্চাশ বছর ঘণ্টা বাজাচ্ছে।
\ দুই \
‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’, আটপৌরে বাংলায় স্বাধীন বাংলা। যে স্বর অন্তরে ধারণ করে ‘স্বাধীন বাংলার জন্য লড়াই’ পাকিস্তানের পূর্ব-পশ্চিমের আর্থ-সামাজিক ব্যবধান ও বৈষম্য দূর করতে, তার শ্রেণিগত সমাধান ঘটলেও (সমাজ ও রাজনীতিতে) গোটা জাতি, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত শ্রেণি ও নিম্নবর্গীয় জনতা সে অমৃতের ভোগী হয়নি।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান নিতে গেলে স্বীকার করতে হয় উন্নয়ন ঠিকই ঘটেছে, তবে তা শ্রেণিবিশেষকে ঘিরে। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’-এর ‘গণ’ তার খুদকুঁড়ো পেয়েই মনে হয় সন্তুষ্ট থাকছে বা সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হচ্ছে। রাষ্ট্রটির বয়স এখন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। অর্থাৎ মধ্য বয়স। সময়টা নেহাত কম নয়।
তবু গর্বভরে বলতে পারছি না (কবির ভাষায়) ‘মধ্য বয়সী, তবু তনু তোমার আশি্বন আলো ছড়ায় আমার মনে।’ এর কারণ একটাই। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি তথা ইতি ও নেতির তুলনায় নেতির ভার বেশি। সন্দেহ নেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, নানা খাতে এর প্রকাশ। যেমন- পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ খাত, স্বাস্থ্যের প্রতিষেধক দিক, সর্বোপরি উচ্চবিত্ত ও বিত্তবান শ্রেণির একটি ‘ভাটিকাল’ উন্নতি ঘটেছে, যা পাকিস্তানের কথিত বাইশ পরিবারকে ছাড়িয়ে গেছে। এ সূত্রে জরিপ হয়নি বলে সঠিক পরিসংখ্যানজাত হিসাবটি বলা কঠিন। কিন্তু দৃশ্যমান পরিস্থিতি থেকে অনুমান সম্ভব, যা বড় একটা ভুল হওয়ার নয়। এমনটি তো একাত্তরে প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু তীক্ষ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে ঠিকই ধরা পড়েছিল, যে শ্রেণির অস্বাভাবিক স্ফীতি-সমৃদ্ধি ও অভ্যুত্থান ঘিরে বাংলাদেশের পথচলা তা সমাজবিজ্ঞানের বিচারের সর্বজনীন চরিত্রের নয়। উন্নয়নের চাবিকাঠি যতটা ক্ষমতাসীন শাসকের হাতে, তার চেয়ে অনেক বেশি (অথবা সবটাই) বৃহৎ ব্যবসায়ীকুলের ভাড়া সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি। ক্ষমতাসীন সরকার সেখানে অনেকটাই অসহায় বা দুর্বল। একটি ছোট উদাহরণ, হঠাৎ করে যুক্তিহীন, তথ্যহীনভাবে বাঙালির প্রধান খাদ্য চালের দাম কেজিপ্রতি ৮ টাকা বাড়াল অটোমিল মালিক সিন্ডিকেট- বলতে হয় ভয়াবহ ঘটনা নিম্নবিত্ত ও নিম্নবর্গীয়দের জন্য। বিস্ময়কর, শাসন ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সরকার এ অস্বাভাবিক মুনাফাবাজির সমাধান করতে পারেনি। জয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নেপথ্য নায়ক বৃহৎ ব্যবসায়ীকুল ও শিল্পপতিদের। একাধিক খাদ্যপণ্য নিয়ে প্রতি বছর নিয়মিত এ জাতীয় ঘটনা ঘটছে প্রতিকারহীনভাবে। রাজনৈতিক শাসন পরিবেশ এসব অন্যায়ের ফয়সালা করতে পারেনি। এটা কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিচায়ক?
\ তিন \
একাত্তরের সহমর্মিতার কালে আমরা কি ভাবতে পেরেছিলাম, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে ব্যাপক দুর্নীতি, মাদক-বাণিজ্য, মানব-পাচার-মুদ্রাপাচার এবং সামাজিক সন্ত্রাস সর্বত্র জাঁকিয়ে বসবে; ভাইবোনকে খুন করবে, সহপাঠী সামান্য কারণে বা কখনো অকারণে অপর সহপাঠীকে খুন করবে, অপরিণত বয়সী কিশোর গ্যাং খুনি ও নির্যাতক হয়ে উঠবে, শিক্ষাদর্শ বুড়িগঙ্গাসহ জলস্রোতে ভেসে যাবে? এসব ভয়ঙ্কর সামাজিক অপরাধের অবসান ঘটানো কি অসম্ভব ছিল? উন্নয়ন ও ইতিবাচক ঘটনা যতটা ঘটেছে একাধিক খাতে, তুলনায় অনেক বেশি সামাজিক বিষঝাড় জন্ম নিয়েছে সামাজিক সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের পথ ধরে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে হরদম রক্তপাত, অবৈধ কর্মকাণ্ড, নীতিনৈতিকতার বিসর্জন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচার শব্দটি বুড়িগঙ্গার দূষিত জলে ভেসে গেছে।
সন্ত্রাস, দুর্নীতির মতোই এতটা ব্যাপক যে, তা শিক্ষায়তন থেকে প্রশাসনকে পর্যন্ত স্পর্শ করে চলেছে। ব্যক্তিগত লোভ, প্রতিহিংসা, দ্বন্দ্ব পাহাড় সমান। তাই বহু ঘটনা উল্লেখের বদলে সাম্প্রতিক একটা ঘটনা তার ধারভাবে উদ্ধৃতির জন্য যথেষ্ট। ওসি প্রদীপ-এস সাহ লিয়াকতের ব্যাপক দুর্নীতির প্রয়োজনে এন্তার খুনের (এনকাউন্টারে) শেষ পরিণতি মেজর সিনহা হত্যা তাদের অন্যায়-অপরাধ ঢাকতে। অবিশ্বাস্য ঘটনা- রক্ষক হলো ভক্ষক। বিচার অবশ্য চলছে, তবে বিলম্বিত। আর বিলম্বিত বিচার যে বিচারহীনতার সমান্তরাল, এটা সবারই জানা। তার আগে একটা কথা বলে নেই- বহু ঘটনায় প্রতীয়মান যে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের দুর্নীতি ক্রমশ ব্যাপক হয়ে উঠেছে। অবস্থাদৃষ্টে কিছুদিন আগে পুলিশ বাহিনীপ্রধান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে করণীয় কিছু পরামর্শ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তারা ভাবছেন বিসিএস ক্যাডার থেকে ওসি নিয়োগের কথা, যা যুক্তিসঙ্গত চিন্তা বলে মনে হয়। দরকার আশু প্রয়োগ।
\ চার \
একটু আগে বলেছিলাম বিলম্বিত বিচার ও বিচারহীনতার কথা, যা একটি গণতন্ত্রী রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে মেলে না। ৯ বছর হয়ে গেল সাগর-রুনি দম্পতি হত্যার বিচারহীনতা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী ছাত্রী তনু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা, নারায়ণগঞ্জে মেধাবী কিশোর ত্বকী হত্যার মতো অনেক ঘটনায় বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে, এদের সুরাহা রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নির্বিকার। সর্বোপরি নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের পরিচায়ক। এই যে অবিচার ও অন্যায়ের প্রতিকারে উদাসীনতা, পুলিশের তদন্তে গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতা, পুলিশের প্রশ্রয়ে-আশ্রয়ে নীতিহীন ক্যাসিনো পরিচালনা- এসবই গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের জন্য দুষ্টক্ষত মূল্যবোধ এবং বিষঝাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমটির চিকিৎসা এবং র‌্যাবের অভিযানে দ্বিতীয়টির সমূলে উৎপাটন সমাজের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে দরকার শাসনযন্ত্রের যথাযথ সদিচ্ছা। প্রশাসনের স্ট্রিমলাইন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর। অনেক বছর কেটে গেছে। এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনাকে মজবুত ও টেকসই করতে দুর্নীতি থেকে শুরু করে সর্বপ্রকার দূষণের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা এবং দীর্ঘস্থায়ী যথাযথ অভিযানের মাধ্যমে দুর্নীতি-দূষণ-অনৈতিকতার অবসান ঘটানো, যাতে শাসনযন্ত্র দায়িত্বমুক্ত, ভারমুক্ত হতে পারে। সমাজে পচন ধরার আগেই অভিযানের কাজটি শুরু করা উচিত।
গণপ্রজাতন্ত্রের সুনাম রক্ষা সুশাসন অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য যাতে সমাজের নেতিবাচক উপাদানগুলো আর বাড়তে না পারে। সর্বাধিক বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতিরোধ, সুবিচার শতভাগ নিশ্চিত করা, ঝুলে থাকা বিচারগুলো সম্পাদন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের বড় দাবি। তা না হলে দুর্নীতিও দূষণ ও অনাচার সব উন্নয়নের মহিমা গ্রাস করবে।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়