যোগ্যরা যেন সবাই ভর্তির সুযোগ পায়

আগের সংবাদ

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে চাওয়া-পাওয়া

পরের সংবাদ

সামরিক শাসন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১ , ১০:০৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১ , ১০:০৫ অপরাহ্ণ

দীর্ঘ সংগ্রাম আর লড়াই করে সু কি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু আসলে ক্ষমতা তার হাতে কখনো তেমনভাবে ছিল না। বলতে গেলে গত পাঁচ বছরে দুই ধরনের সরকার ছিল। এর একটি সু কি দ্বারা পরিচালিত বেসামরিক প্রশাসনের কিছু অংশ আর পেছন থেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল সামরিক বাহিনীর হাতে।

সম্প্রতি সেনাবাহিনী দ্বারা অং সান সু কি আটক হওয়া এবং মিয়ানমারে এক বছরের জন্য সামরিক আইন জারি করাকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের গণমাধ্যমে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এটা কম-বেশি আমাদের সবারই জানা যে, মিয়ানমারে আসলে কার্যত একটি বেসামরিক সরকারের মোড়কে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বেই সবকিছু ছিল। তাই আদৌ এ ঘটনাপ্রবাহকে সামরিক অভ্যুত্থান বলা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ আছে। যেখানে আইনিভাবে ও বাস্তবে সেনাবাহিনীর মিয়ানমারের শাসনক্ষমতায় যথেষ্ট আধিপত্য ছিল, সেখানে তাদের নতুন করে এ সরাসরি ক্ষমতা দখল কেন ঘটল, তার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হতে পারে, সামরিক শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা উপভোগ করছিল, তারা বেসামরিক সরকারের সঙ্গে কোনোভাবেই ক্ষমতার কোনো আংশিক ভাগাভাগিও সহ্য করতে পারছিল না। আবার হতে পারে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে সামরিক বাহিনী সমর্থিত দলের অত্যন্ত খারাপ ফলাফলের ফলে সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে তাদের ক্ষমতার ওপর কর্তৃত্ব আরো কমে যাবে, এ আশঙ্কা থেকেও অভ্যুত্থানটি করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্লিপ্ততা পরোক্ষভাবে হলেও সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দখলে আশকারা দিয়েছে, এটা ভাবাও অমূলক নয়।
মিয়ানমারে এখনো আটকে পড়া ৫ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি আরো কোনো নির্যাতন-নিপীড়ন নেমে আসবে কি না সেই আশঙ্কাও অনেকেই করছেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে রয়েছে। তাই এ পটপরিবর্তনের ফলে রোহিঙ্গারা আরো নির্যাতনের শিকার হবে বা রোহিঙ্গাদের প্রতি কোনো মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসবে, এটা ভাবা অযৌক্তিক। আবার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে হলেও মিয়ানমারে যে প্রতিবাদ হচ্ছে বা মিয়ানমারের প্রবাসী নাগরিকরা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন তা থেকেও রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কিছু আছে বলে বলা যায় না। মিয়ানমারের তথাকথিত গণতন্ত্রকামীদের গণতন্ত্রের ধারণা আধুনিককালের গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গাদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের বর্বর নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের পরোক্ষ সহযোগিতা বা নির্লিপ্ততা থেকে বোঝা যায়, তাদের গণতন্ত্র হচ্ছে এক ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের কোনো সহমর্মিতা বা তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।
মিয়ানমারে আবার সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেই বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন। এক বছর যেহেতু জরুরি অবস্থা চলবে, তাই বলা যায়, এই এক বছরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে সামরিক সরকার কথা বলতে চাইবে না। সামরিক বাহিনীর লোকজন সব প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়গুলো দখলে নিতে আর বুঝতেই এক বছর চলে যাবে। অং সান সু কি যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সবই তারা পাল্টেও ফেলতে পারেন।
এগুলো সবই ধারণা। কী করবে সেটা সেনা কর্তারাই জানেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে নির্বাহী বিভাগ, বিচার ও আইন বিভাগ। তিনি এবং তার সেনাবাহিনী নিজেদের ঘটানো হত্যা, নিধনের সমাধান চাইবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এগোচ্ছিল না, এখন আরো বড় ধরনের হোঁচট খেল কি না সেটা সময়ই বলবে। ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে যৌথ পরামর্শ সভা হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত হয়ে গেছে।
এক বছরের কথা বলা হলেও এই সামরিক শাসন আরো দীর্ঘায়িতও হতে পারে। সাধারণত মিয়ানমারে সামরিক শাসক একবার ক্ষমতায় বসলে তারা ছাড়তে চায় না। প্রায় ৪০ বছর মিয়ানমার সামরিক শাসকদের হাতেই ছিল। মিয়ানমারের সংবিধানেই আছে, যে কোনো সময় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে পারে।
দীর্ঘ সংগ্রাম আর লড়াই করে সু কি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু আসলে ক্ষমতা তার হাতে কখনো তেমনভাবে ছিল না। বলতে গেলে গত পাঁচ বছরে দুই ধরনের সরকার ছিল। এর একটি সু কি দ্বারা পরিচালিত বেসামরিক প্রশাসনের কিছু অংশ আর পেছন থেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল সামরিক বাহিনীর হাতে।
চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভ‚কৌশলগত কারণে নিকট প্রতিবেশী মিয়ানমারকে একুশ শতকের ভূকৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাছে টানছে। চীনারা মিয়ানমারকে কাছে টেনে একুশ শতকে তাদের জন্য বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগরে প্রবেশের বাধাহীন পথ নিশ্চিত করছে। এর মধ্যে চকপিউ-কুনমিং গ্যাস এবং তেল পাইপলাইন, মিটশোনে ড্যাম এবং চকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে মেরিটাইম সিল্ক রুট গড়ে তুলে স্বপ্নের বেল্ট এন্ড রোড প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হওয়া ইত্যাদি। বর্তমানে চীন থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের পর মিয়ানমারে তৃতীয় বৃহৎ বিনিয়োগকারী দেশ। বেইজিংভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক লি জির ভাষ্য হলো চীন-মিয়ানমার গভীর সামরিক সম্পর্ক এই অঞ্চলে চীনের স্বার্থরক্ষায় অনুক‚ল ভ‚মিকা পালনে সক্ষম হবে। কারণ ভবিষ্যতে মিয়ানমার চীনের অন্যতম বাণিজ্য পথ হতে যাচ্ছে।
আমেরিকায় নতুন প্রশাসন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে পারে বাংলাদেশ। মিয়ানমারেরর সেনা অভ্যুত্থানের নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্বাহী আদেশকে অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সামরিক নেতারা ছাড়াও তাদের পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে।
চীন ছাড়া প্রায় সব দেশ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাংলাদেশ এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে কি না সেটা ভাবার বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নতুন করে কঠোর চাপ এড়াতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করার একটা উদ্যোগই নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন। দরকার বাংলাদেশের উদ্যোগ এবং সেটা অবশ্যই চীনা ফাঁদের বাইরে গিয়ে। এর আগেও যে দুবার রোহিঙ্গারা এসেছিল তখনো এর পেছনে সামরিক বাহিনীর ভ‚মিকা ছিল। সে সময়ও দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গেই আলোচনা করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। কাজেই এবারো তাদের সঙ্গেই কথা বলতে হবে। বরং বলা যায়, তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়েছে সু কি না থাকায়। বাংলাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা আর এজন্য দেশটিতে যারা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তাদের সঙ্গেই আলোচনাটা ফলপ্রসূ হওয়ার সুযোগ থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী এবং সব সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান করা চীন অনেকটা নরম স্বরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে নিজেদের সহনশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এটা পুরোপুরি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় যাতে ‘মন্ত্রিসভায় রদবদল’ বলে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সেনা অভ্যুত্থানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আনা নিন্দা প্রস্তাব চীন আটকে দিয়েছে। এতে করে বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে জেনারেলদের চীন স্পষ্ট করে না হলেও জোরালো সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থান নিয়ে বিশ্বনেতারা যে যাই বলুন আর বিভিন্ন রাষ্ট্র যে প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করুক না কেন, সমগ্র বিশ্বকেই মিয়ানমার এক ধরনের ভাবনার সংকটে ফেলে দিয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশেষ এক সংকটের মধ্যে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন, সংকটের মধ্যে পড়েছে চীনও। বলার অপেক্ষা রাখে না, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনায় চীন ও আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিশ্ববাসীকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় জারিত করবে। বিশেষ করে চীন ও আমেরিকার ক্ষমতার দাপট ও বাণিজ্যচিন্তাই হয়ে দাঁড়াবে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক মেরুকরণের অন্যতম নিয়ামক। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনো আসেনি।

লেখক ও গবেষক।
[email protected]

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়