আল-জাজিরার অপপ্রচারের নেপথ্যদের খোঁজা হচ্ছে: কাদের

আগের সংবাদ

‘গোলাপ গ্রামে’ হাসি নেই

পরের সংবাদ

ফের টালমাটাল পুঁজিবাজার!

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১ , ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১ , ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ

সক্রিয় কারসাজি চক্র, লাগাম টানবে কে

বিপর্যয় সামলে পুঁজিবাজারের টানা উত্থান খানিকটা আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সেই উত্থান টেকসই হয়নি। গত কয়েক সপ্তাহে বাজারের অস্বাভাবিক আচরণ ফের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্থান-পতন পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক নিয়ম হলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যাবে না। একদিন লাফিয়ে উঠলেও পরদিনই ধপাস করে পড়ে যাচ্ছে দর। এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন বড় খেলোয়াড়রা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নানা পদক্ষেপের কথা বললেও কার্যত সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারেনি। সম্প্রতি ১১টি ব্রোকারেজ হাউসকে সন্দেহজনক আচরণের দায়ে চিহ্নিত করলেও তাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যে ৪টি হাউসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা গেলেও এর সত্যাসত্য নিশ্চিত করেনি বিএসইসি। শেয়ারবাজার নিয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের এই কারসাজিরই খেসারত দিতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। আর কারসাজির হোতারা কামিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাভাবিক গতিতে চলছে না পুঁজিবাজার। কারসাজি হচ্ছে। যার পরিণতিতে হুট করে বাজারের অস্বাভাবিক উত্থান-পতন। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। বিগত সময়ে যেভাবে পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, সেখানে হঠাৎ করে সূচকের পতন অস্বাভাবিক। বিনিয়োগকারীদের ধারণা ছিল, সূচক ৫ হাজার ৯০০-এর মধ্যে থাকবে। কিন্তু সূচক এখন ৫ হাজার ৫০০তে নেমেছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী হতাশ। এর কিছু কারণও আছে। আগে শেয়ার দর বাড়ার ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ট্রেডিং কিংবা সিরিয়াল ট্রেডিং কাজ করেছে। যে কারণে স্থায়ী হয়নি শেয়ারের দাম। অনেক কোম্পানি আইপিওতে আসার পর শেয়ারের দর সাত গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া আইপিওর শেয়ার নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা হুজুগে শেয়ার কিনেছেন। এখন সেই দাম নেই, অনেক কমে গেছে। জোয়ারের মতো কয়েকটি শেয়ারের দর বেড়েছে। আর যখন ভাটা পড়েছে, তখন মাথায় হাত। আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফার লোভে গুজবের ফাঁদে পা দিয়ে কিছু কোম্পানির শেয়ার কিনছেন। অথচ এসব কোম্পানি সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা নেই। কিছু দিন আগে তারা বিমা খাতের পেছনে ছুটেছেন। এ খাতের শেয়ারের দর তিন-চার গুণ বেড়েছে। বিমার শেয়ার দর সে জায়গায় এখন আর নেই। তারপর তারা ছুটেছেন মিউচুয়াল ফান্ডে। সেটার দর বাড়ার পর শেষ পর্যন্ত টেকেনি। সব বিনিয়োগকারী মিউচুয়াল ফান্ড বিক্রি করে বের হয়ে গেছেন। তারপর যান আইপিওতে, তখন প্রায় সবগুলোর দর তিন-চার গুণ বাড়লেও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। রবির শেয়ার বেড়ে হয়েছিল সাত গুণ। এছাড়া বর্তমান বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, উত্থান-পতন পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হুট করে এমন উত্থান আবার দ্রুত সূচকের পতন স্বাভাবিক নয়। এ বিষয় নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। তবে শেষ দুদিনে বাজারে কিছুটা রিকভারি হয়েছে। এই বাজারে বিনিয়োগকারীদের বুঝেশুনে বিনিয়োগ করার পরামর্শ বিএসইসির সাবেক এই চেয়ারম্যানের।

ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত সপ্তাহের দরপতনে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বাজার মূলধন হারিয়েছে ডিএসই। টানা চার সপ্তাহের পতনে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা মূলধন কমেছে পুঁজিবাজারে। বড় অঙ্কের বাজার মূলধন হারানোর পাশাপাশি গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে কমেছে সবকটি মূল্যসূচক। তবে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে প্রায় তিন শতাংশ। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৯ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে বাজার মূলধন কমে ৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। তার আগের দুই সপ্তাহে কমে ৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং ৯ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এ হিসাবে টানা তিন সপ্তাহের পতনে ডিএসই ৩১ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা বাজার মূলধন কমেছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী সপ্তাহে অস্বাভাবিক লেনদেনের কারণে ১১ ব্রোকারেজ হাউসকে চিহ্নিত করে বিএসইসি। এর মধ্যে ৪ হাউসের প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর আগে মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার দর বাড়া নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ বাড়াতে দুবাইয়ে রোডশো করা হচ্ছে। রোডশো শেষে গতকাল শুক্রবার দুবাইয়ে ব্যবসারত ছোট উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে বিএসইসির। এছাড়া নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বাজারে আসার ব্যাপারে কঠোর হচ্ছে বিএসইসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ভোরের কাগজকে বলেন, পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন থাকবে কিন্তু এভাবে হুট করে বাজারের উত্থান-পতন স্বাভাবিক নয়। কাউকে বলে বাজারে বিনিয়োগ করানো বা কারো মাধ্যমে বাজারের উত্থান তৈরি করা ভালো নয়। কারণ বাজার স্বাভাবিক গতিতে না চললে এই উত্থান বেশি দিন ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ৬ মাস পর বাজার তার নিজস্ব অবস্থানে চলে যাবে, স্বাভাবিক গতিতে যেখানে থাকার কথা। বাজারে ম্যানুপলেশন হচ্ছে। কাউকে বলে ২০ হাজার টাকা না থাকলে আইপিওতে আবেদন করা যাবে না। এই প্রক্রিয়া উচিত বলে মনে হয় না। বাজারে হস্তক্ষেপ না করে পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়া উচিত বলে মনে করেন বিএসইসির সাবেক এই চেয়ারম্যান।

আইডিআরএ সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুঁজিবাজারের উত্থানের পেছনে ছিল বিমা খাতের অবদান। বিমা কোম্পানিগুলোর মূলধন সংরক্ষণে পুরনো আইনের বিষয়ে সার্কুলার জারি করে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। এতে বিনিয়োগকারীরা ঝোঁকেন বিমা খাতে। এছাড়া বিমা খাতের নন-লাইফ কোম্পানির ব্যবসার ক্ষেত্রে এজেন্ট কমিশন বাতিল করার ঘোষণা আসে। এতে হুমড়ি খেয়ে বিমা খাতের শেয়ারের দিকে ঝোঁকেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু সর্বশেষ হিসেবে, করোনাকালীন বিমা খাতে অনেক কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। কমে এসেছে বিমা খাতের ব্যবসা। বাজারে গুঞ্জন রয়েছে, থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স বাতিল হওয়ার পর কম্প্রিহেন্সিভ ইন্স্যুরেন্স বা ফার্স্ট পার্টি ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ সারা বিশ্বে কোথাও ফার্স্ট পার্টি ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক নেই। এছাড়া ফার্স্ট পার্টি ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক করার এখতিয়ার আইডিআরেরও নেই। তবে কমিশন বাতিল হলে কোম্পানির আয় কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু ব্যবসা বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। বিমা নিয়ে এসব বিভ্রান্তির কারণে বেড়ে চলছে বিমা খাতের শেয়ার দর।

এ বিষয়ে কথা হয় পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বাজারের উত্থান-পতন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আইডিআরের পুরনো এক নির্দেশনা নিয়ে পুঁজিবাজারে বিমা খাতের দর বেড়েছে। এখন এজেন্ট সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এজেন্ট না থাকলে বিমা কোম্পানির আয় কত বাড়বে, তা আমার বোধগম্য নয়। এজন্য বিমার শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বুঝেশুনে কেনা উচিত। পুঁজিবাজারের সূচক বেশি বাড়ার পর হুট করে সূচক ৩০০ পয়েন্ট কমে যাওয়ায় হতাশ বিনিয়োগকারীরা। তবে শেষ দুদিনে কিছু রিকভারি করেছে সূচক। বিমার পুরনো আইন নতুন করে জারি করে বলে জানান তিনি।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়