সুখপাখি

আগের সংবাদ

তোমার জন্যে

পরের সংবাদ

গৌরবদীপ্ত অনুভবের জন্মদাতা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ , ৯:৪১ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ , ৯:৪১ অপরাহ্ণ

তার গল্পগুলোতে জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে নিরাসিক্ত আবেগ ও ঋদ্ধবোধের অনুরণনে। তৃণমূল পর্যন্ত জীবনের যে ব্যাপক ব্যাপ্তি তাকে তিনি ধরতে চেয়েছেন। সামাজিক শোষণ, ভনিতা, ক‚টকৌশলে প্রতিনিয়ত যে জীবনকে করছে পর্যুদস্ত, দমিত সেই জীবন সূত্রতার দিক উন্মোচনে তিনি ছিলেন সচেষ্ট। সাহিত্য ও শিল্পের নামে নানা ঘটনা, যাপিত দিনকাল, মানবিক বোধকে আলাদা আবরণে
তিনি চিত্রিত করেননি।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল এক নাম। এই ঔজ্জ্বল্য তার স্বোপার্জিত। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের যে অভিযাত্রা সেখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অবস্থান আলাদাভাবেই সুনির্দিষ্ট। এক্ষেত্রে আরো তিনজনকে হয়তো মেলানো যেতে পারে তারা হলেন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মহাশ্বেতা দেবী ও হাসান আজিজুল হক। সাহিত্য আলোচনায় এ ধরনের তুলনা সব সময় যুক্তিসঙ্গত নয়, তবে বোধকে সহজতর করতে অনেকটা সহায়ক বলেই ধরে নেয়া যায়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছেন কম। সর্বসাকল্যে ৫টি গল্পগ্রন্থ, দুটি উপন্যাস ও একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ। গল্পগ্রন্থগুলো হলো অন্য ঘরে অন্যস্বর (১৯৭৬) খোঁয়ারি (১৯৮২), দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫) দোজখের ওম (১৯৮৯) জল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)। উপন্যাস : চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) ও খোয়াবনামা (১৯৯৬)। একমাত্র প্রবন্ধ সংকলন ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু (১৯৯৮)
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেই বিরলপ্রজ লেখক, অল্প লিখেও অন্তহীন এক আলোর জগৎ সৃষ্টি করতে সফল হয়েছেন। যা লিখেছেন তাই তাকে বাংলা সাহিত্যের অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে তার সৃষ্টির অতুলনীয় প্রভা সমানভাবে আদৃত। যেন সমকালে কেউ তার সমকক্ষ নেই। এক্ষেত্রে তিনি একক। কথাসাহিত্যের এক অপরাজেয় কণ্ঠস্বর, স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সৃষ্ট সাহিত্য সময়কে ধারণ করেছে প্রবলভাবে। সেই সঙ্গে ভেঙেছে এক সনাতন বৃত্ত। গড়েছে প্রকাশ ও ভাবের নতুন জগৎ। জীবন, জগৎ, পরিবেশ, পরিস্থিতিকে নানাভাবে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ দিনযাপন, নিগৃহীত, নিরস জীবনের সাদামাটা ভ‚মিতে তিনি বহমান সৌন্দর্য ও স্বপ্নময়তার চাষাবাসে প্রয়াসী ছিলেন। তার লেখা গভীর পর্যবেক্ষণ ও সম্মোহনে ছিল সব সময়। জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরও সে ধারা সমানভাবে পরিব্যাপ্ত। ভাষা ও কথাসাহিত্যের গবেষকদের জন্য তার সাহিত্য নতুন এক ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করেছে। আর এ দিকটা হলো তার গল্প উপন্যাসের বিষয়, চরিত্র, ভাষাগত পরিচর্যা ও নিরীক্ষা। শিল্পের সৃষ্টিগত দিক থেকে আরোপিত আজ্ঞা বা প্রথাগত প্রশ্রয়কে তিনি বড় করে দেখেননি। সাহিত্য শিল্প প্রথাগত ধারায় আবর্তিত হবে বা সেই আঙ্গিকে গড়ে তুলতে হবে এ ধারণায় তিনি বদ্ধমূল ছিলেন না কখনো। এ ক্ষেত্রে তার নিজস্ব প্রচেষ্টা ও প্রয়াস বাংলা কথাসাহিত্যে তাকে আলাদা আদলে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভাষা, নিত্যকথোপকথন, শব্দের প্রয়োগগত পার্থক্য তার আগে বাংলা কথাসাহিত্যে এক প্রকার মজ্জাগত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভাষার মধ্যে সৃষ্ট ব্যবধান সামাজিক কৌলিন্যকে তুলে ধরত। এর মধ্যে যে আবহ সৃষ্টি হয় তা কথিত সামাজিক আভিজাত্য ও ব্যবধানকে প্রকট করে তোলে। ঔপনিবেশিক আমলে সৃষ্ট এ ধারা প্রথম থেকে আজ অবধি ভাষাগত পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। তিনি রুদ্ধতার এ দেয়াল অপসারণে কাজ করে গেছেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত তথা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে তিনি সাহিত্যের সুষমায় তুলে এনেছেন। এখানে তার বিশ্বাস ও প্রয়াস বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘদিনের এক অচলায়তনে ভেঙেছে। তিনি সাধারণ মানুষের জীবন যাপন আনন্দ, বেদনা, অনুভ‚তি, অনুরাগ কেন্দ্রিক সৃষ্টির সঙ্গে শিল্পী ও লেখকদের সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন সব সময়। তাই তার পর্যবেক্ষণ ও পরিণতবোধে তাড়িত মানস নিম্ন-মধ্যবিত্তের কাতারে শামিল হয়ে সাহিত্যের রসদ সংগ্রহের কাজ করেছে। তার গল্প, উপন্যাসের ভাষা তির্যক, তীক্ষ, নিত্য আবহের প্রতিফলন। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তী’ রসবোধ। তার ভাষা, বর্ণনাভঙ্গিতে প্রথাগত আবেগময়তা, কোমলাশ্রয়ী ঢঙের বাড়াবাড়ি নেই। অনেকের কাছে তার গল্প ও উপন্যাসের পরিবেশন রীতি তাই অশ্লীল, কর্কশ, রসকষহীন মনে হতে পারে। তিনি সাহিত্যে তো প্রথানির্ভর ও প্রচলিত ভাষা রীতিকে শ্রমজীবী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবন সংগ্রামের বাহন মনে করেননি। এসব মানুষ যেভাবে ভাব প্রকাশ করেন, কথা বলেন তার মধ্য দিয়েই তিনি তাদের তুলে ধরতে প্রয়াসী ছিলেন। রাজনীতি, ঔপনিবেশিক শাসন, পরাধীনতা, আজ্ঞাবহ মধ্যবিত্ত সমাজের লালিত বোধকে তিনি স্বাভাবিক জীবনের সমান্তরালে নিয়ে আনতে সচেষ্ট ছিলেন। লিখেছেন রাজনৈতিক পটভ‚মিতে, মানুষের নির্মেদ জীবন যাপন, বাস্তবতা ও প্রদাহের চিত্র। যে পথে তিনি মানব মুক্তির জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক শোষণের অবসানকে প্রধান বাহন মনে করেছেন। তার সাহিত্য সে চেতনাকে অন্তর্লীনভাবে ধারণ করে। তবে তার রাজনৈতিক বিশ্বাস এক্ষেত্রে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করেনি। তবে দর্শনগত প্রত্যয়ের প্রতিফলন ঘটেছে।
তার গল্পগুলোতে জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে নিরাসিক্ত আবেগ ও ঋদ্ধবোধের অনুরণনে। তৃণমূল পর্যন্ত জীবনের যে ব্যাপক ব্যাপ্তি তাকে তিনি ধরতে চেয়েছেন। সামাজিক শোষণ, ভনিতা, ক‚টকৌশলে প্রতিনিয়ত যে জীবনকে করছে পর্যুদস্ত, দমিত সেই জীবন সূত্রতার দিক উন্মোচনে তিনি ছিলেন সচেষ্ট। সাহিত্য ও শিল্পের নামে নানা ঘটনা, যাপিত দিনকাল, মানবিক বোধকে আলাদা আবরণে তিনি চিত্রিত করেননি। যা করেছেন তা হলো সময়ের সরস উপস্থাপন। স্বদেশ, স্বকালকে তিনি সব সময় সজ্ঞানে লালন করতেন, সাধারণ মানুষের প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ, গভীর দায়বোধ ছিল তার। নির্মোহ, নির্লোভ মৃত্তিকা মনের এ দায়বোধ তাকে সব সময় মানুষের মাঝে থাকতে তাড়িত করেছে। এ বোধই তার লেখক জীবনের ব্যাপ্তি ও সংবেদের প্রধান ভিত্তি। তার এ স্বকীয়তার মহিমা মূল্যায়নের চিরায়ত সূত্রতায় অবিচ্ছেদ্য।

জন্ম ১৯৪৩ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রংপুর জেলার গোটিয়া গ্রামে, মাতুলালয়ে। পৈতৃক নিবাস বগুড়া। সর্বশেষ লেখাপড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স। ১৯৬৫ সালে জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে পেশাগত জীবনের শুরু। শেষাবধি অধ্যাপক। পেয়েছেন হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, প্রফুল্ল কুমার সরকার স্মৃতি পুরস্কার, সাদাত আলি আকন্দ পুরস্কার, আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার (পশ্চিম বঙ্গ), কাজী মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক। মৃত্যু ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭।
আখতারুজ্জান ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে অনেকে নানাভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের আরেক মহিরুহ মহাশ্বেতা দেবীর কয়েকটি পঙ্ক্তির মধ্য তার সম্পর্কিত ধারণা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মহাশ্বেতা দেবী ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস’ শীর্ষক (স্মারকগ্রন্থ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ফিরে দেখা সারা জীবন) একটি ছোট্ট স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘অবশ্যই আমি যাকে চিনি সে লেখক আখতারুজ্জামান এবং আমি বিশ্বাস করি, কি পশ্চিম বাংলা কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক। আমার চেয়ে অনেক বড় লেখক।’

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়