শ্বশুরের মাথা ফাটিয়ে হাতের কব্জি কেটে দিলেন জামাই

আগের সংবাদ

নগরীয় কৃষি নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি

পরের সংবাদ

বাংলা ভাষার অবক্ষয়

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২১ , ১০:১২ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২১ , ১০:১২ অপরাহ্ণ

সময়ের পরিক্রমায় ভাষার স্বকীয়তা ঠিক রেখে কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক, তবে দূষণ কাম্য নয়। বর্তমানে এফএম রেডিওতে তাড়নজাত ধ্বনির বাহুল্য ও বিদেশি শব্দের অহেতুক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এ প্রজন্মের সন্তানরা এটির একটি নামও দিয়েছে। বাংলা কিংবা ইংলিশ কোনোটিই নয়। এটা হলো বাংলিশ। ‘বাংলা’ শব্দের প্রথম অক্ষর ‘বাং’ আর ‘ইংলিশ’ শব্দের শেষ অক্ষর ‘লিশ’ যুক্ত করে এর নামকরণ করা হয়েছে। এটি যে ভাষাদূষণ, ভাষা বিকৃতি এবং ভাষার জগাখিচুড়ি প্রয়োগ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এফএম রেডিওগুলোর বিকৃত ও অশুদ্ধ উচ্চারণের কারণে তরুণরা ভাষার বিষয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এটি শুধু বাংলা নয়, অন্য যে ভাষার শব্দ যোগ করে অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করা হচ্ছে সে ভাষারও অমর্যাদা করা হচ্ছে। আবার বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এসব পছন্দ করছে। কারণ তারা যুগের স্রোতে ভেসে আসা যে কোনো ফ্যাশনকে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই, দ্রুত রপ্ত করে সেটার প্রয়োগ করাকে আধুনিকতা ভাবে। তাই এই গণমাধ্যমগুলোর প্রচার করা বিকৃত শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা নিজেদের তথাকথিত স্মার্ট এবং আধুনিক ভাবতে শুরু করেছে। এতে আমাদের ভাষা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক ভাষা আজ বিলুপ্ত কিংবা বিলুপ্তির পথে। জাতিসংঘের মতে, ‘প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে।’ বাংলা ভাষা আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব। তাই আজই আমাদের সচেতন হতে হবে এবং বাংলা থেকে ভাষাদূষণ, ভাষা বিকৃতি এবং ভাষার জগাখিচুড়ি প্রয়োগ রুখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে বাংলাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধ থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। আমরা আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন করেছি এটা গর্বের বিষয়। তবে কষ্টের কথা হলো, আমাদের এখানে আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট হয়েছে, ভাষা ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার রয়েছে অথচ তারা কেউই ভাষা নিয়ে জনসাধারণের কাছে জোরদার কোনো ভ‚মিকা রাখছে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের অনেক শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেমনÑ হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মোবাইল, অ্যান্ড্রয়েড, মাদার বোর্ড, প্রসেসর, ইনবক্স, ই-মেইল, মোবাইল কম্পিউটার, মনিটর, সফটওয়্যার, টেলিভিশন ইত্যাদি। এসব শব্দ ব্যবহারে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই এবং এসবের কঠিনতর পরিভাষা সৃষ্টি নিষ্প্রয়োজন। এসব ব্যবহার স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু বাংলায় কথা বলার সময় ‘কিন্তু’ না বলে ‘বাট’, ‘তাই’/‘সুতরাং’ না বলে ‘সো’, ‘এমনকি’ না বলে ‘ইভেন’, ‘ধরেন/মনে করেন’ না বলে ‘সাপোস’, ‘ভুল’ না বলে ‘রং’, ‘ঠিক/সঠিক’ না বলে ‘রাইট’ বলা হচ্ছে এ পরিবর্তনটা অস্বাভাবিক। আসলে এটা ভাষার পরিবর্তন নয়, এটাই ভাষাদূষণ। নিজের ভাষা নিয়ে এক ধরনের হীনম্মন্যতা থেকেই এই ব্যাধি সংক্রামিত হয়েছে। ভাষার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, সংগ্রাম করেছি। সেই আন্দোলন এবং সংগ্রামের পথ ধরেই পেয়েছি আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। তাই আমাদের আন্দোলন, সংগ্রাম এবং এর পথ ধরে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে ভাষার বিকৃতি রোধ এবং সঠিক বানান ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার এবং বাংলা একাডেমিকে প্রচলিত বানান এবং উচ্চারণরীতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। আমরা আজকাল দেখি বিভিন্ন হিন্দি সিরিয়াল দেখে আমাদের শিশুরা সেই ভাষা ব্যবহার করে থাকে। এ কারণেই আমাদের শিশুদের ভাষিক, মানসিক, শারীরিক, সাংস্কৃতিক, চারিত্র্যিক এবং নৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির দ্বারা। বিজ্ঞাপনসর্বস্ব পুঁজিবাদী এই গণমাধ্যম ভাষাকেও পণ্য করে তুলেছে। চটকদারিত্বের প্রয়োজনে ভাষাকে বিকৃত করতে তাদের সংকোচ হয় না। এ থেকেই বোঝা যায় যে ভাষার প্রতি তাদের মমত্ব ও মনোযোগের অভাব। আজকের প্রজন্ম যেহেতু গণমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং হচ্ছে, কাজেই একে প্রতিহত করতে সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত। গণমাধ্যমের সাহায্যে ভাষা বিকৃতির সব অপচেষ্টা বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভাষা বিকৃতি এবং ভাষার জগাখিচুড়ি প্রয়োগ এক ধরনের ব্যাধি। এ ব্যাধিটি আমাদের অন্তরদেহে প্রবেশ করেছে জাতিগত হীনম্মন্যতা, অন্তরবৃত্তে ঔপনিবেশিক প্রভাব, নিজ ভাষার প্রতি মমত্ববোধের অভাব, গড্ডালিকায় ভেসে গিয়ে সহজে আধুনিক হিসেবে পরিচিত হওয়ার উদ্ভট বাসনা, যথাযথ ভাষা শিক্ষার অভাব, বিপণন কৌশলের কাছে শিল্পবোধ হেরে যাওয়া প্রভৃতি ভাইরাস থেকে। একই সঙ্গে ভাষার এই অবক্ষয় মূলত সামাজিক অবক্ষয়েরই আরেকটি রূপ। শুধু আইন করে এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ভাষাকে বিকৃত করার মাধ্যমে আমরা যে আমাদের নিজেদেরই হেয় করে তুলছি তা বোঝাতে হবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ড. মোহিত কামাল বলেছেন, ‘ভাষার বিকৃতি মানুষের মনস্তাত্তি¡ক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে সুস্থ ও সৃষ্টিশীল চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়।’ এমনিতেই আমাদের সুস্থ ও সৃষ্টিশীল চিন্তার অভাব। তার ওপর ভাষার বিকৃতি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়