একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ বিশিষ্টজন

আগের সংবাদ

ফাইজারের টিকার প্রথম ডোজেই ৯০ শতাংশ সুরক্ষা

পরের সংবাদ

শঙ্খ ঘোষ কেন বিশিষ্ট কবি

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ , ৯:৪৯ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ , ৯:৪৯ অপরাহ্ণ

তার প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তিনি পরিচিতি পেয়েছেন শঙ্খ ঘোষ নামে। কেন এই নাম! ধর্মশাস্ত্র মতে শুদ্ধতার প্রতীক এই শঙ্খ যে কোনো শুভ কাজে ব্যবহৃত হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পূজা-পাঠে। শাস্ত্র মতে কোনো শুভ কাজ করার আগে শঙ্খধ্বনি করলে গৃহস্থের মঙ্গল হয়। এই ধ্বনিই পরিবারকে সমস্ত রকম অশুভ শক্তি, ভাবনা ও কাজ থেকে বিরত রাখে। শুধু তাই নয়, কালা জাদুর প্রভাব থেকেও শঙ্খ দূরে রাখে। এই বিশ্বাসেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী মহিলা ও পুরুষরা প্রতিদিন সন্ধ্যারতির সময় শঙ্খধ্বনি করে থাকেন। এমনকি বিজ্ঞানও মেনে নিয়েছে, এই পবিত্র ধ্বনি নানা জীবাণু থেকে শরীরকে দূরে রাখে। আর সেই কারণেই কিছু আচার-নিয়ম মেনেই বাড়িতে শঙ্খ রাখতে হয়।
কবি শঙ্খ ঘোষ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এমনই একটি পরিশুদ্ধ নাম। একজন কবির দায়িত্ব কী? শুধুই কবিতা লেখা? নাকি চরম সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো! সমাজের প্রয়োজনে প্রতিবাদমুখর হওয়া!
এই প্রসঙ্গে আরেক বরেণ্য কবি শামসুর রাহমানকে আমি স্মরণ করি। রাহমান খুব নরম মনের মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমরা দেখেছি বাংলাদেশের জাতীয় সংকটে, গণঅভ্যুত্থানের কালে, মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, জঙ্গিবাদ-মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে শামসুর রাহমান থেকেছেন প্রথম সারিতে। মিছিলে। মিটিংয়ে। সভায়। সমাবেশে।
উপমহাদেশে এই কাজটি সাহসের সঙ্গেই করে যাচ্ছেন শঙ্খ ঘোষ। তিনি যা বলছেন, তা ওই রাজ্যের তো বটেইÑ গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর।
মাত্র কিছুদিন আগে তার একটি কবিতা গোটা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের দৃষ্টি কেড়েছিল। পড়া যাক কবিতাটি-

আমারই হাতের স্নেহে ফুটেছিল এই গন্ধরাজ
যে কোনো ঘাসের গায়ে আমারই পায়ের স্মৃতি ছিল
আমারই তো পাশে পাশে জেগেছিল অজয়ের জল
আবারও সে নেমে গেছে আমারই চোখের ছোঁয়া নিয়ে
কোণে পড়ে থাকা ওই দালানে দুপুরে ভাঙা থামে
আমারই নিঃশ্বাস থেকে কবুতর তুলেছিল স্বর
শালবন পেরোনো এ খোলা মাঠে মহফিল শেষে
নিথর আমারই পাশে শুয়েছিল প্রতিপদে চাঁদ।
[ মাটি ]
ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের স্বাক্ষরের পর সেটি আইনে পরিণত হয়। এরপর থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বিক্ষোভ বেড়েই চলে। এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দিল্লিসহ আরো বেশ কয়েকটি রাজ্যে। আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গেও। এই সময়েই কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেন এই কবিতাটি। তিনি শাসক শ্রেণিকে তোয়াক্কা করেননি সামান্যই। এটাই তার শক্তির জায়গা। এটাই তার বিশিষ্টতার আসন।
আমাদের মনে আছে, সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা। একদিকে যেমন মানুষজন দেখেছে নকশাল আন্দোলন, অন্যদিকে আরও একটি ঘটনা ভারতের ইতিহাসে চিরকালের মতো প্রভাব রেখে যায়। তা ছিল- ইমারজেন্সি বা জরুরি অবস্থা। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ওই প্রায় দেড় বছরব্যাপী সময়ে বহু সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠরোধ করা হয়। অনেকে জেলও খাটেন। সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ব্যতিক্রম ঘটেনি কবি শঙ্খ ঘোষের বেলায়ও। পঞ্চাশের দশক থেকে বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি যিনি, তাকেও জরুরি অবস্থায় নিষেধের কোপে পড়তে হয়েছিল।
ঘটনাটি অনেকেরই জানা। ‘অল্পস্বল্প কথা’ গ্রন্থে সে কথা কবি নিজেই লিখেছেন।
‘দেশ’ শারদীয় সংখ্যা ছাপানোর কাজ চলছে তখন। হঠাৎ শঙ্খ ঘোষ শুনতে পেলেন, তার কবিতা নাকি এবার ‘দেশ’-এ প্রকাশ পাবে না। কেন? না, সরকারের নিষেধাজ্ঞা। আকাশ থেকে পড়লেন তিনি। তা কেমন করে হয়?
অথচ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ নিজেই চেয়ে নিয়েছিলেন কবিতা। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেন তাকে। কথাটা যে স্রেফ গুজব নয়, সেটাই জানালেন সাগরময় ঘোষ। ‘রাইটার্স’ থেকে না ছাপানোর নির্দেশ এসেছে। সরকারবিরোধী কোনো কথাই যে তখন বলা যাবে না! সাগরময় ঘোষ সসংকোচে অন্য লেখা দিতে বললেন। এতে যে কোনো লেখক, কবির রাগ হওয়ারই কথা। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ শান্ত থাকলেন। সেইভাবেই বললেন, ‘অন্য কোনো কবিতা তো পারব না পাঠাতে। কেননা যা কিছু লিখছি এখন, তার সবটাই তো ও রকম সরকারি হুকুম নিয়ে ফিরে আসতে পারে।’ নতুন লেখা তিনি আর দেননি।
জরুরি অবস্থার কোপ এতেও থামেনি। ছোট পত্রিকাগুলো লেখা চাইতে এলে শঙ্খ ঘোষ প্রথমেই বলে দেন তার শর্ত। ছাপতে হলে এইভাবে, কোনোরকম বদল না করে এই লেখাই ছাপাতে হবে; ঝুঁকি নিয়ে হলেও। অনেকেই সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। একই কথা বললেন ‘লা পয়েজি’র সম্পাদক বার্ণিক রায় ও ‘সাহিত্যপত্র’র সম্পাদক অরুণ সেন। কিন্তু তারা পিছিয়ে আসেননি। সেই বছরই, অচলাবস্থার মধ্যেও ছাপা হয় শঙ্খ ঘোষের ‘রাধাচ‚ড়া’ ও ‘আপাত শান্তিকল্যাণ’ কবিতা দুটি। না, লেখক-সম্পাদক, কাউকেই হাজতবাস করতে হয়নি।
তবে শুধু লেখার জগতেই নয়, আকাশবাণীর মতো প্রতিষ্ঠানও সেই কোপ থেকে রেহাই পায়নি। স্বয়ং শঙ্খ ঘোষও কিছু কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। দূরদর্শনের শুরুর সময় তখন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দিন এবং অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষে সেখানে হবে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। ‘জন্মদিন মৃত্যুদিন’ শীর্ষক এই রেকর্ডিংয়ে অবনীন্দ্রনাথের যাত্রাপালার একটি অংশ পড়া হচ্ছিল। হঠাৎই অনুষ্ঠানটির প্রযোজক শঙ্খ ঘোষকে একটি লাইন বদলে দেয়ার অনুরোধ করেন। স্টেশন ডিরেক্টর নাকি আপত্তি জানাচ্ছেন এটা রাখতে। লাইনটি ছিল- ‘তখন ইন্দ্রের ভয়ে ঘরে কুলুপ দিয়েছেন ব্রহ্মা’। দর্শকদের কানে ‘ইন্দ্র’ যদি ‘ইন্দিরা’ হয়ে যায়! তাহলে তো আবার কারাবাস! জরুরি অবস্থার সময় এমন ঘটনাও প্রতিনিয়ত ঘটেছে।
সাধারণ লোকজন তো বটেই, শিল্প-সাহিত্য জগতেও যে একটা ভয় ঢুকে গিয়েছিল, সেটা স্বীকার করেন শঙ্খ ঘোষ। শুধু তিনি কেন, অনেকেই সেটা করবে। একটা কবিতা বা গল্পের লাইন, একটা শব্দও তখন আতশ কাচের নিচে থাকত। এই সময় আরো একটি ঘটনার কথা স্মৃতিচারণায় তুলে এনেছেন শঙ্খ ঘোষ। আকাশবাণীর বিভাগীয় দায়িত্বে তখন আরেক কবি কবিতা সিংহ। একটি ভাষণ শেষ করে দুজনে বাইরে বেরিয়েছেন। হঠাৎই কবিতা বলে উঠলেন, ‘লেখাটা খানিক এডিট করে দেব?’ নিজের লেখা তিনি নিজেই কাটছাঁট করবেন; আর তার দরকারই বা পড়ল কেন? জানা গেল, রবীন্দ্রনাথের ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্প থেকে নেয়া একটি বিশেষ অংশ নিয়েই আপত্তি। অংশটি হলো-
শশীভ‚ষণ কহিলেন, ‘জেল ভালো। লোহার বেড়ি মিথ্যা কথা বলে না, কিন্তু জেলের বাইরে যে স্বাধীনতা আছে সে আমাদিগকে প্রতারণা করিয়া বিপদে ফেলে। আর, যদি সৎসঙ্গের কথা বল তো, জেলের মধ্যে মিথ্যাবাদী কৃতঘ্ন কাপুরুষের সংখ্যা অল্প, কারণ স্থান পরিমিত- বাইরে অনেক বেশি।’
শঙ্খ ঘোষ তখনো ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাদ যদি দিতেই হয়, পুরোটা বাদ যাবে। নয়তো একটি শব্দও এদিক-ওদিক হবে না। নিজের বিশ্বাস থেকেই এ কথা বলেছিলেন তিনি। বিপদ এবারেও কিছু হয়নি। কিন্তু গোটা দেশের যে অবস্থা ছিল তখন, তার থেকে বেরিয়ে আসতে বোধহয় কেউই পারেনি। চারদিকে ভয়ের পরিবেশ। তার মধ্যেই লেখা দিয়েই নিজের বক্তব্য জানিয়ে গিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষের মতো মানুষরা। সেই পরম্পরা অবশ্য আজো থামেনি। কিন্তু এই বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছেও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ধরেন তিনি। কলমও তোলেন। আর তার জন্য অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও শুনতে হয় তাকে। কিন্তু তিনি সবসময়ই অটল থেকেছেন তার শক্ত অবস্থানে।

২০১৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে এই ‘মুক্ত গণতন্ত্র’ কবিতা লিখেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। এর পরই বীরভ‚মের তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অনুব্রত মণ্ডলের তোপের মুখে পড়তে হয় তাকে। কবি শঙ্খ ঘোষকে উদ্দেশ করে অনুব্রতের মন্তব্য নিয়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ।
শঙ্খ ঘোষ এই সময়ে বিশ্বের অন্যতম মানবিক এবং সাহসী কবি। যারা মনে করেন, কবিতা হবে রাজনীতিবিবর্জিত, তারা অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন এই কবির কবিতা।
কবিতা মানুষের জন্য। কবিতা সমাজের জন্য। এটাই যদি কাব্য-অভিধানের
নিগূঢ় চেতনা হয়, তাহলে তো আমরা এই শঙ্খ ঘোষের কবিতায়ই পড়েছি-
‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার জন্য গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।’

তার এমন অনেক কবিতা ফেরে গণমানুষের মুখে মুখে। পাঠক বিশ্বাস করেন, কবির লেখা সাধারণ মানুষের জন্য। রাজনীতির কুশীলবদের জন্য নয়। নয় সেই সব রাজ অনুগ্রহ প্রার্থী বুদ্ধিজীবীর জন্যও যাদের মূল কাজই হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে যাওয়া। তিনি দেখেছেন, কি সীমাহীন উদাসীনতায় মানুষ চোখ বুজে মনে করছে, ‘এমনি ভাবেই যায় যদি দিন যাক না’। কিন্তু এভাবে তো দিন যাবে না। যেতে পারে না। কবি জানেন সে কথা। সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে চান কবি শঙ্খ ঘোষ। তার অমোঘ লেখনীর ব্যাপৃত মায়াজালে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়