যেন শাদা মেঘের মতো আকাশে ভেসে থাকা জীবনের আখ্যান

আগের সংবাদ

একুশে পদক পাচ্ছেন ২১ বিশিষ্টজন

পরের সংবাদ

কখনো বুচনির মা, কখনো আফরোজা বানু

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ , ৯:২৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ , ৯:২৬ অপরাহ্ণ

বস্তি নম্বর একের কথা কে করে বয়ান, কাহিনীতে কতো সূত্র কতো আত্মদান। কথাকার কথা বলে পোড়ায় পরান :
‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।
আফরোজা বানু এ কথা শুনে অনেকক্ষণ জরিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জরিনার কাছে জানতে চায়নি এ কথার কারণ। বুচনির জন্য আফরোজা বানুর মায়া হয়।
জরিনার কথাÑ বুচনির খাওয়ার কমতি হয় না। ভালোমন্দ যাই থাকে খেতে দেয়। এ জন্য বুচনির মার খুবই রাগ আফরোজা বানুর ওপর। মনে মনে বিড় বিড় করে প্রায় বলে, ‘আছে দেখে দেয়, যত জ্বালা আমাগো।’
বুচনির মা জরিনা খাতুন। জীবনে অনেক পথঘাট ঘুরে এখন আফরোজা বানুর সংসারে বুয়া হিসেবে কাজ পায়। আজ তিন-চার বছর। আগে কোনোদিন বুচনি এ বাসায় আসেনি। তার মা জরিনাও আনার প্রয়োজন মনে করেনি। জরিনার এখন ঘুরে ঘুরে দুই-তিন বাসায় কাজ করতে কষ্ট হয়। আগে মাত্র এক বাসায় কাজ করতো। এখন বস্তির ঘরভাড়া বেড়েছে। খাওয়া খরচও। ভালো-মন্দে বস্তিবাসিনী জরিনার দিন কেটে যাচ্ছে।
বুচনিদের মায়েরা আজকাল কেমন আছে! নগরবাসীর ভাববার সময় নেই। তাদের বসবাস চলার পথের ফুটপাতে, পার্কে, পরিত্যক্ত বাড়িতে, রেল লাইনের পাশে ঝুপড়ির মধ্যে, পাইপের মধ্যে। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার ভেতর উত্তর একটাই। তারা বেঁচে আছে। খোলা আকাশের নিচে সংসার নিয়ে। সাধারণজনেরা এদের প্রতি অস্বীকারের পাখনা ঝাপটায়, কিন্তু অস্বীকার করতে পারে না। ওরা এখন শহরের হাত-পা-ধড়-মুÐুর মতোই। দালানের পাশাপাশি ঝুপড়ির বস্তিগুলোকে বলা হয় করপোরেশন শহরের ক্ষত চিহ্ন। অনেকই ভাবে, আকাশছোঁয়া বাড়িরের নিচে চাপা অন্ধকার। ভাবে, ওরা বুঝি রাজনীতি করা তরুণ ছাত্রের মতো। ভাবতে ভালোবাসে কাব্য করে, শহরের ফল্গুধারার মধ্যে খড়কুটোর মতো। গতি ও গন্তব্যহীন তাদের জীবনের অনুজ্জ্বল চিত্র।
‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’। এই ভাবনায় এখন উত্তর পায়নি আফরোজা বানু।
ধমক দিয়ে বললেন, ‘যাও, কেমন মা তুমি। নিজের মেয়েরে নিজে খাওন দিতে বারণ কর।’
‘খালাম্মা, বুঝবেন না এই জ্বালা, কেমন জ্বালা। এ যে আমাগো জায়গায় যদি থাকতেন, তবে বুঝতেন।’
‘আমার বুঝে কাজ নেই, কাজে যা।’

২.
অভাব গ্রামে গ্রামে। জরিনারও। গ্রামের মানুষ সম্পদের ন্যায্য অংশ পায় না। জরিনার স্বামীও পায়নি। নদী ভাঙনে বাড়ছে ভূমিহীনের সংখ্যা। বেশির ভাগ মানুষই বেকার। ছোটে ভরসা করে শহরের দিকে। কাজের জন্য। শহরেও মানুষ বাড়ছে। কর্ম সংস্থান নেই। জরিনার স্বামী, যে মানুষ আগে গ্রামের মুক্ত আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছে, সে এখন আশ্রয় নিয়েছে শহরের নোংরা ঝুপড়িতে। জরিনাদের আশ্রয় নেওয়া বস্তির ঝুপড়িগুলোর শতকরা সত্তর ভাগই বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে ঘেরা। নব্বই ভাগ ঘরের মেঝে স্যাঁতসেঁতে মাটির। দু’একজন বাঁশের খুঁটি দিয়ে মাচা করে নিয়েছে। বর্ষায় মেঝে অনেক সময় পানিতে ডুবে যায়। তখন অন্য কোনো জায়গায় সাময়িক আশ্রয় নেয়। জরিনাদের জীবনের অংশ এসব। সারা বছরের দিনপঞ্জিতে। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি।
জরিনাদের এক সময় জমি ছিল। বাড়ি ছিল। এখন শূন্যের গোলচক্করে ঘুরে ঘুরে খেটে-খাওয়া মানুষ। কাজ করলে খেতে পায়, না হয় উপোস। জরিনাদের প্রতিবেশীরা কেউ রিকশাওয়ালা, কেউ ফেরিওয়ালা, কেউ কুলি বা দিনমজুর, কেউবা অপরাধ জগতের দাপুটে সদস্য, এখানে আট বছরের শিশুকেও খেটে খেতে হয়। বুচনি তাদেরই একজন। একসময় বুচনি মাঠের ছুটে বেড়াতো, পুকুর পাড়ে ঘুরে বেড়াতো, বাড়ির উঠনে খেলতো এক্কা-দোক্কা। বুচনির মতো মেয়ের এখন স্কুলে পড়ার কথা। সে কপাল বুচনি হয়নি।
এখন এমন পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে জরিনা খাতুন। তাই মনে হয়, এমন এক কষ্টের নালি-ঘায়ের ভেতর থেকে সে উচ্চারণ করে :
‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।
এ জীবনও বড়ো নির্মম। এবং ক্ষমাহীনও। বড়ো কষ্টের উচ্চারণ গরিব ও নিরক্ষরের। নিঃশব্দে বাঁচা-মরার করুণ কাহিনী এখানে প্রতিদিন রচিত হয়। ফুল ফোটে, ঝরে যায় ফুল!
শহরের স্থানে স্থানে বস্তি বাড়ছে। খালি জায়গা পেলেই। বিশেষ করে খাসজমি হলেই দিনে দিনে গড়ে ওঠে ঝুপড়ি। জন্ম হয় নতুন বস্তির। রেল লাইনের পাশে গড়ে ওঠা বস্তি কখনো কখনো উচ্ছেদ হয়। তারপর আবারও গড়ে ওঠে। শহরের এ এক নিরন্তন ছবি।
একদিন দেশের এক লোকের সাথে নুরু মিয়ারও এ বস্তিতে প্রবেশ। চালা বেঁধে, চালে কাগজ ও পলিথিন দিয়ে কোনো মতে একটি ঝুপড়ি করে নেয়। পরের দিনই তার সাক্ষাৎ হয় এ বস্তির মাস্তানের সাথে, কথা হয়। এ বস্তিতে থাকতে হলে তাকে মাসে একশত টাকা ‘দ্যান’ লাগবো। এখন বাড়তে বাড়তে তাকে দিতে হয়, প্রতি মাসে বারোশ টাকা। বলে, সরকারের লোককে ম্যানেজ করার জন্য ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাদের চাঁদা। আসলে ‘মাস্তানি’ ট্যাক্স। নুরু মিয়ার এসব মাস্তানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। থাকতে দিয়েছে এ-ই যথেষ্ট। এই বস্তির খালি জায়গায় মাস্তানদের কেউ এ রকম ঝুপড়ি বানিয়ে তা ভাড়ায় লাগায়। সুবিধা অনুযায়ী ভাড়া দিতে হয় আরো বেশি। দেড়-দুই হাজার টাকার মতো। এখন দিন বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে, মাস্তানি, মাদক ব্যবসা, খুন এখন বস্তির নিত্যদিনের ঘটনা। এর মধ্যেই টিকে আছে নুরু-জরিনা-বুচনিরা।
প্রায় বছরই অন্তত একবার বস্তির ঝুপড়িগুলো ভাঙচুর হয়। উচ্ছেদ অভিযান চলে। সরকারি জমি বেদখলে চলে গেছে, তাই উচ্ছেদ করে জমি উদ্ধার করা হয়। লোক-দেখানো। নুরুর ভাষায়, এদের যত অত্যাচার ‘আমাগো’ ওপর, গরিবের কেউ নেই।
বুচনির মা জরিনা, মাঝে মধ্যে আফরোজা বানুর সাথে বস্তিবাসীদের নিয়ে গল্প করে।
আফা, কত কাজ করে ‘খাওন’ জোগাড় করে বস্তির পরিবারগুলান। আমাগো বুচনির চেয়ে দুই বছরের বড় পাশের ঝুপড়ির আনুর ছেলে রফিজ। সে বড় বড় অফিসের চারজন ‘সাবের’ জন্য টিফিন কেরিয়ারে দুপুরে ভাত নিয়ে যায়। মাসে একশ ট্যাহা করে চারজনের কাছ থেকে চারশ ট্যাহা মাইনে পায়। তার ভাই মফিজ। বাপের সাথে ঠেলা নিয়ে যায়। বোনটা আমাগো বুচনির মতো অন্যের বাড়িতে কাজ করে। ওই বাড়ির বেটিটা নাকি ভালো না। বস্তির অনেকেই পরিবারের সবাই মিলে আয় করেও কোনো বেলা ‘খাওন’ পায়, কোনো বেলা পায় না …
রাখো এখন তোমার ওইসব কথা বুচনির মা। আগে তাড়াতাড়ি কাপড়গুলো ধুয়ে শুকোতে দাও বৃষ্টি আসবে। নিজেদের শ্রেণিচরিত্রের কথা অনেকেই এভাবে শুনতে চায় না। যদিও আফরোজা বানু ব্যতিক্রমী মহিলা। বুচনির প্রতি তার মমতার কোনো তুলনা হয় না।
জরিনা সেই কথার প্রতিধ্বনি এখনো আফরোজা বানুকে অস্থির করে তুলে :
‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।
বস্তিতে সবাই নুরু মিয়ার মতো নয়। বিপরীত মেরুর মানুষ অনেক। যথেষ্ট অপরাধী ধরনের বাজে লোকও বস্তিতে বাস করে। নিরীহ ধরনের বস্তিবাসীরা নিজেদের রক্ষা করা, নিজেদের মতো করে বস্তিতে বাস করা- খুব যে সহজ কাজ তাও নয়। এ রকম মানুষও আছে, যারা বস্তির ভালো-খারাপ দুদিকের মাঝে বেড়ে উঠেছে। তাদের ভবিষ্যৎ কী? উত্তর দেয়ার কেউ নেই। এর ভেতরেই টিকে থাকা। একজন নুরু মিয়া এবং তার পরিবারের মতো সবাই এই চেষ্টাই করে যায়।
বস্তিতে কবিরউদ্দির মতো লোকও আছে। দুর্ধর্ষ, কিন্তু বস্তিকে টিকে রাখার জন্য লড়াই তাকেও করে যেতে হয়, অনেক তা-ও করে যায়। নুরু মিয়ারও। কবির চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। তার পিতা কুমিল্লার, মা নোয়াখালীর। কম-বেশি কুমিল্লা-নোয়াখালীর ভাষাও বলতে পারে। কবিরউদ্দির এই বস্তিতেই বেড়ে ওঠা। এই বস্তির ভালো-খারাপ সবই তার নখদর্পণে। বিপদে-আপদে বস্তির মানুষের উপকারই করে। আবার কবিরউদ্দিন ছোটবেলা থেকে অনেক ধরনের অপরাধ করেছে। জেল খেটেছে। মার খেয়েছে, মার দিয়েছে। চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে পা ভেঙেছে। এখন সে দাঁতের মাজন বিক্রি করে। কখনো বাসে। কখনো ফুটপাতে। কখনো ট্রেনে। কখনো রাস্তায় রাস্তায়।
এ পেশা ছিল তার জন্মদাতার। বাপ তার এখনো বেঁচে আছে। এখনো এ ব্যবসাই করে। মা চলে গেছে অন্য এক পুরুষের সাথে। কবিরউদ্দিনের বাপ দ্বিতীয় বিবাহ আর করেনি। তিনজন ছেলেমেয়ের সংসার তার। কোনো মতে চলে। বেঁচে থাকা। জীবনের আলো আর অন্ধকারের এ এক চমৎকার লুকোচুরি খেলা। কেউ জেতে। কেউ হারে। কেউ বানবাসি মানুষের মতো ভেসে যায়।
দিনযাপনের এই পরিবেশে বাস করেই জরিনার যত ভয়। ভয় তার মেয়ে বুচনিকে নিয়ে। যে কথাগুলো এখনো সে আফরোজা বানুকে বলতে পারেনি, তার মতো উপলব্ধি দিয়ে। কেন সে মেয়েকে ‘খাওন’ কম দিতে বলে পরিষ্কার করে তা বোঝাতে পারে না।।
আফরোজা বানুও কথাগুলো এ নিয়ে খুব বেশিদিন যে ভেবেছে তাও নয়। কখনো হয়তো এই ব্যাপারটা হঠাৎ তার মনে আলোড়ন তুলেছে, ‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।
বস্তির ওই জগতেও সম্পর্কের মূল্য আছে। ভালোবাসা আর বেদনা আপন আপন সৌরভ ছড়ায়। অভাবের মাঝে নূপুরের রিনিঝিনি বাজে। ফুলের নামে নাম মেয়েটির- শাপলা। সে ভালোবাসতো করিমউল্লাকে। এখন করিম আর বেঁচে নেই। শাপলা আছে। একাত্তরের রক্তঝরা দিনে বস্তিগুলোতে আগুন জ্বলে উঠলো। সারাদেশের মতো। চারদিকে অসংখ্য হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজ-নিপীড়নের লাখ লাখ ঘটনা রচিত হলো। তখনই মুক্তিযোদ্ধার দলে নাম লেখায় করিমউল্লা। করিমের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে করিমউল্লা-শাপলার ভালোবাসার উপাখ্যান শেষ হয়।
শাপলা আর করিমউল্লার ভালোবাসা সুন্দর পরিণতি পেয়েছিলো। তাদের বিয়ে হয়েছিলো। কোলজুড়ে এসেছিলো তিন বছরের বিবাহিত জীবনে দুটি ছেলে সন্তান। তারা এখন নিজেরাই এই বস্তির খেটে-খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী। শাপলা লোকজনের কাছে এখনো করিমউল্লার গল্প করে। যুদ্ধের কথা বলে। ঘৃণা ও ক্রোধের ভেতর দিয়ে, হৃদয় খুঁড়ে তার বেদনা প্রকাশ করে, হাহাকার করে। মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী এ পরিচয় দিলে যে রাষ্ট্রের সহায়তা পাওয়া যায় তা শাপলা শুনেছে। কিন্তু জানা নেই কীভাবে তা আদায় করতে হয়।
নুরু মিয়া, জরিনা, কবিরউদ্দিন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা করিমউল্লার স্ত্রী শাপলাও তার দুই ছেলের দিনকাল বস্তির পৃথিবীতে ঘুরপাক খেয়ে চলে কেবল। কী যে হতো দাঁতের মাজন বিক্রেতা কবিরউল্লা সুযোগ না পেলে? শাপলা যদি বস্তির না হয়ে কোনো গলি বা রাজপথের ধারের বাসিন্দা হতো, তবে হয়তো পেতো তার স্বামীর নামে বরাদ্দের একটি বাড়ি। বঞ্চিতের বাস্তবতা অনেক কঠিন এবং কষ্টের। মানুষের বেড়ে ওঠার পেছনে থাকে এমনই কতো কাহিনী, সুখ-দুঃখের রোদ-বৃষ্টি।
আফরোজা বানুর দুই ছেলে ও ছেলের বউ, তিন নাতি ও এক নাতনি যখন স্কুলে চলে যায় জরিনার কাছে বস্তির ও শহরের নানান গল্প-কাহিনী শুনে শুনে তার দিন কাটে। তখন, সে ভাবে বুচনিদের কথা। ভাবতেই পারে না, নিজের ছেলেমেয়েকে কম খাওয়ার দেয়ার কথা। কিন্তু কী করে বুচনির মা জরিনা বলে, ‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।
আফরোজা বানুর ভাবনায় নেই যে, বেশি বেশি ‘খাওনা’ অভ্যাসে পরিণত হলে, ভবিষ্যতে বুচনির জীবন-যাপনে তা সমস্যা তৈরি করতে পারে সেই ভাবনা তার মাকে অস্থির করে তুলে। মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করা হবে বুচনির জীবন। ভাবতে পারে না বুচনির মা, তার মেয়ের জীবনে সুখের হাওয়ার কথা। ভালো খাওন না পেলে বুচনি কত রকমের অঘটনের জন্ম দিতে পারে। স্বামী বদল করতে পারে। চরিত্রহীন হয়ে যেতে পারে। অপরাধ জগতের সম্রাজ্ঞীও হয়ে উঠতে পারে। বুচনির মা জরিনা ভাবে, বস্তির এই জীবনচিত্রের ভয়ঙ্কর দিক তো আর আফরোজা বানু দালানের উঁচুতলায় বসবাস করে বুঝতে পারবে না।
দুঃখের এই জীবনে বস্তির মানুষের বেঁচে থাকাটা একমাত্র সুখ। যেভাবে বেড়ে উঠছে বুচনি, আফরোজা আপা, যে পরিমাণ খাবার দেয় সেইটুকুও যদি না পায়, কেবল নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গান শুনতে হয়, তাহলে কী হবে উপায়। কষ্টের কাঁটা বিদ্ধ হওয়া দেখতে দেখতে- জরিনারা এই জীবন নৌকোয় ভাসতে ভাসতে আর ডুবতে ডুবতে যেমন বলে, হয়তো তখন- বুচনিও একদিন বলবে মায়ের মতোই, ‘আমার মেয়েকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।

বস্তি নম্বর দুয়ের কথা বেশি কিছু নেই, পরিচয়টা পাল্টে যায়, না জানে নিজেরাই :
নগর সভ্যতার উন্নয়নের বিপরীতে বস্তিগুলো উটকো ঝামেলা। তবে, সমাজে এগুলোর অবস্থান বাড়ির কাছে আরশিনগরের মতো। না থাকলে চলে না। নগর সভ্যতা হয় অচল। এর ভেতর-বাইরে ছানাপোনা নিয়ে বস্তিবাসী জরিনারা বাঁচার লড়াই করে।
ওরা দেশগ্রাম ছেড়ে আসা নদীভাঙা মানুষ। কেউ কেউ দারিদ্র্যের তাড়নায় শেষ সম্বল জমি-ভিটে-মাটি বিক্রি করে গাট্টি-বোচকা নিয়ে, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ছেঁড়া কাগজের মতো উড়ে উড়ে বস্তিতে পোস্টারের মতো সেঁটে যায়। প্রত্যেকের দুঃখগুলো তাদের স্মৃতির দরোজায় কড়া নাড়ে অবসরের আলাপে-বিলাপে।
বস্তির জীবন উদ্বাস্তুর জীবন। কাহিনী কখনো এই বস্তির, কখনো ওই বস্তির। বস্তিতে আগুন। নগর-মহানগরের বস্তি এলাকার শিল্প-সংস্কৃতিতে পরিণত। বস্তি থাকলে মাঝে মাঝে আগুন হবে। জমি দখল হবে। বড়ো বড়ো দালান সেখানে উঠবে। ফ্ল্যাট বাড়িও একসময় বস্তি হবে। সেই বস্তির চিত্রে অবশ্য ভিন্নতা থাকবে। জীবন বোধ স্বতন্ত্র। হালচাল চমৎকার। এসি-গাড়ি। ইংরেজি স্কুলে পড়ুয়া ছেলেমেয়ে। ভালো বাংলা বলতে পারে না। ঠুসঠাস ইংরেজি বলে। পুরো বাক্য নয়। ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে বলে অনেকে। এখান থেকে শুরু হয় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
বুচনির মার দুঃখও একই। বুচনি ভালো বাংলা বলতে পারে না। দেশগ্রামের ‘আইসুনি, খাইসুনি’ আইসা যায়। নিজের পরা কাপড়েই হাত-মুখ মুছে ফেলে। ওর মুখে ফ্ল্যাট বাড়ির বস্তির ছেলেমেয়েদের মুখের ভাষা আসেÑ ‘হ্যান্ডওয়াশ করবো, মাম-ডাড, ওয়াটার ওয়াটার…’।
বস্তি এক আর দুই- উভয়ে একই পতনমুখী সমাজব্যবস্থার মালা গাঁথে। ফুল বাগানের মৌসুমি ফুলের মতো। মৌসুমে মৌসুমে রং বদলায়। সমাজবন্ধনের, পরিবারিকবন্ধনের সুতো টানটানÑ এই ছিঁড়ে গেলো বুঝি! একান্নবর্তী পরিবারÑ এখন চিন্তারবন্ধনে আর নেই। বাজে না, সুরের তার ছিঁড়ে গেছে। সবারই স্বাধীনভাবে বসবাস করার নতুন ধারণা দ্রæত প্রসারতা পেয়ে গেছে। ঘরে ঘরে। কেবল স্বামী-স্ত্রী। কিছু কিছুতে ছেলেমেয়ে। ভাই-বোন। বৃদ্ধ পিতা-মাতারা বৃদ্ধাশ্রমে। গৃহকর্তা ঘোরে ভেতরে-বাইরে শূনতা নিয়ে। কখনো কখনো অন্যমনস্কতায় দূর আকাশের তারা গণনা করে সময় কাটায়। স্ত্রী থাকে সিরিয়াল নিয়ে নিমগ্ন। সিরিয়ালের ষড়যন্ত্রের সংসার নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছেলেমেয়ে ফেসবুকে চ্যাট করছে। বেচারা অফিস ফেরতার নাগরিক জীবনের খোলসের ভেতর আড়ষ্ট কেউ যেনো বসে আছে। কিন্তু মুখে হাসি লেগেই থাকে।
বুচনির মা যখন বস্তিতে ফেরে তার মুখেও হাসি লেগে থাকে। বুচনির মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারার। অন্যরকম এ সুখ। ভিন্নমাত্রার আনন্দযোগে সময় চলে যায়।
ফ্ল্যাট বাড়ির বাবা-মারা ছেলেমেয়ে নিয়ে বাইরে খেতে বের হয়। কখনোই একই রেস্টুরেন্টে খায় না! খাদ্য তালিকা সমৃদ্ধ হয় নানা উপাদানে। নতুন নতুন রেস্টুরেন্টে খায়। এখানেই তাদের আনন্দ সুখ।
এখানে বুচনির মার সাথে তুলনা নয়। যে যেভাবে বেঁচে থেকে আনন্দ উপভোগ করতে চায়, তা-ই করে। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে এই এক আলো-আঁধারির খেলা।
বস্তি নম্বর এক আর বস্তি নম্বর দুইতে খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পায় না আজকাল সমাজ বিশ্লেষকরা। অর্থনীতিবিদরা। একজন নদী ভাঙায় ঘরবাড়ি হারিয়ে বস্তি নম্বর একে উঠেছে। অন্যজন নিকট আত্মীয়-পরিজন, বাড়ির ঐতিহ্য ছেড়ে বস্তি নম্বর দুইতে উঠেছে।
একজীবনে নানারূপ দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। কোথাও একটি মাত্র কক্ষে সবাই ঘুমায়। চালের ফুটো দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো উঁকি মারে। আরেক জীবনে নিঃসঙ্গতা নিয়ে যে যার যার কক্ষে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফ্লোরোসেন্ট আলোর ধার করা উজ্জ্বলতায় ভাসে।
দুই বিপরীতমুখী জীবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আফরোজ বানু। জরিনার কথা। বার বার মনে পড়ে :
‘বুচনিকে খালাম্মা কম খাওন দিয়েন’।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়