মিয়ানমারে এক বছরের জরুরি অবস্থা জারি

আগের সংবাদ

সংবাদপত্র পর্যালোচনা

পরের সংবাদ

ভাষানীতি প্রণয়নের তাগিদ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১ , ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১ , ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্রভাষা’ প্রসঙ্গে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এর মানে সংবিধান যেদিন প্রণীত হলো, সেদিন থেকেই এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। প্রশাসনে বাংলার ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু এর উল্টো পাশে অন্ধকার দিকটি অনেক বেশি দৃশ্যমান। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে দেশে আইন হয়েছে ১৯৮৭ সালে। আইন করার পরও সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হয়নি, বরং ভাষা আন্দোলনের ঊনসত্তর এবং স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও উপেক্ষিত বাংলা। উচ্চ আদালতে বাংলা চালু হয়নি। উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষায় বাংলা ভাষা মূল্যহীন। উপরন্তু বাংলা, ইংরেজির মিশ্রণে এক জগাখিচুড়ি ভাষার প্রচলনে হুমকির মুখে প্রমিত বাংলা।

একাত্তরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সব সরকারি অফিস, আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না। কারণ, তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনো দিনই বাংলা চালু করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।’ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রবর্তিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ সরকারি অফিস-আদালতের দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রীয় ওই আদেশে বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার ৩ বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, পঁচাত্তরের পনের আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতোই ভাষা আন্দোলনের চেতনাও ভ‚লুণ্ঠিত হয়। পাকিস্তানি ভাবধারায় রক্তাক্ত হয় সালাম-রফিক-বরকতের রক্তে ভেজা বর্ণমালা। এরপর বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় এসে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। এতে কিছু অর্জন দৃশ্যমান হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে হাঁটতে হবে অনেক পথ। জানতে চাইলে ভাষাবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলা ভাষার শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে অনেক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। ভাষার শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ভাষানীতি প্রয়োজন। এ জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাকে গণমুখী ভাষা হিসেবে তৈরি করার জন্য নীতিমালা করা প্রয়োজন। সংবিধানে ভাষানীতির মূল ভিত্তি রচিত হলেও ভাষা-পরিকল্পনার অভাবে তা কার্যকর হতে পারেনি।
ভাষা আন্দোলনের ঊনসত্তর বছরেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন সম্ভব হয়নি। এটি ভাষা আন্দোলনের চেতনা বিরুদ্ধ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে এখনো উচ্চশিক্ষার ভাষা, উচ্চ আদালতের ভাষা ইংরেজি। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হবে; কিন্তু হয়নি। সর্বস্তরে বাংলা চালু না হওয়ার পেছনে সরকারের উদ্যোগের অভাব এবং জনগণের অনীহাকেই মূল কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন তারা। এ ব্যাপারে কবি হেলাল হাফিজ ভোরের কাগজকে বলেন, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের জন্য সরকারকে যেমন উদ্যোগ নিতে হবে; তেমনি বেসরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলা ভাষার অর্জন অনেক- এমন দাবি সরকারপক্ষের। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ ইতিহাসে ‘মাইলফলক’ হিসেবেই দেখছেন তারা। অন্যদিকে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় মাতৃভাষা বাংলাসহ বিশে^র বর্তমান ভাষাভাষির মধ্যে সপ্তম বৃহৎ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলেন ২৬ কোটি ৫০ লাখ ৪২ হাজার ৪৮০ মানুষ। এছাড়া প্রযুক্তিতেও এগিয়ে গেছে বাংলা। কম্পিউটারে বাংলায় লেখালেখি, বই-পুস্তক ও পত্রপত্রিকা প্রকাশ, গবেষণা, ওয়েবসাইট নির্মাণ, তথ্য ও ছবি অনুসন্ধান, ই-মেইল, গুগল, ফেসবুক, মোবাইলে এসএমএস বাংলাতেই পাঠানো যাচ্ছে। নিজ ভাষাসহ বিশে^র অন্যান্য মাতৃভাষা রক্ষা, লালন, বিকাশের অঙ্গীকার নিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। অন্যদিকে সরকার ২০১২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটা পরিপত্র জারি করে বলে, বানানে সমরূপতা ও সামঞ্জস্য বিধান করার জন্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করা হবে। ২০১৫ সালে ‘সরকারি কাজে ব্যবহারিক বাংলা’ নামের একটি পুস্তিকা তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালে প্রশাসনিক পরিভাষা, পদবির পরিভাষার বই হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, সর্বস্তরে মাতৃভাষা প্রচলনে সরকার কাজ করছে। উচ্চ আদালতসহ সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহারের জন্য বাংলা একাডেমির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়