যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রের লড়াই ডেবস থেকে স্যান্ডার্স

আগের সংবাদ

পাঠ্যবইয়ে তথ্য বিকৃতি ও আমাদের দায়বদ্ধতা

পরের সংবাদ

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শ্রেষ্ঠ উপহার ভূমিহীনে ভূমি, ঘরহীনে ঘরদান

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২১ , ৯:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৫, ২০২১ , ৯:১৫ অপরাহ্ণ

গত ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৭০ হাজার আশ্রয়হীন পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এক একটি করে ঘর দান করেছেন। এর আগে যখন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যে, দেশে আশ্রয়হীন পরিবারগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ঘর তুলে আশ্রয়হীন মানুষের ঘর পাওয়ার ব্যবস্থা করবেন তখনো অনেকের কাছেই বিষয়টি খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু দেশের প্রায় সব উপজেলায় ৬৬ হাজার ১৭৯টি পরিবার এবং প্রায় ৪ হাজার ঠিকানাহীন ব্যক্তিকে ব্যারাকে থাকার মতো ব্যবস্থা করার মাধ্যমে যখন ৭০ হাজার পরিবারের হাতে চাবি তুলে দেন তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্মুখে বসে দেখা দর্শকরা অভিভ‚ত হয়ে যান। এমন বিরল দৃশ্যের অবতারণা হতে অনেক বছরই কেউ দেখেছেন বলে মনে হয় না। সত্যি সত্যি আশ্রয়হীন, ঘরহীন, ঠিকানাবিহীন মানুষগুলো যখন একটি দুই কামড়াবিশিষ্ট আধাপাকা পরিচ্ছন্ন বাড়ির চাবি হাতে পান তখন অনেকেই ছিলেন আবেগে আপ্লুত, অশ্রæসিক্ত আনন্দে আত্মহারা। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমের সম্মুখে তাদের এতদিনকার ছন্নছাড়া জীবনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাদের কৃতজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন। অনেক বিধবা, বয়স্ক এবং হতদরিদ্র মানুষ আশ্রহীনভাবে এখানে-সেখানে জীবনযাপন করছিলেন। এই মানুষগুলোই প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে দুই শতক জমির ওপর নতুনভাবে নির্মিত একটি বাড়ি লাভ করলেন। এটি শুধু ওই মানুষগুলোর জন্যই অভিভ‚ত হওয়ার বিষয় ছিল না, যারা আমরা টেলিভিশনের পর্দায় বাড়িগুলো দেখছিলাম, মানুষগুলোর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ স্বচক্ষে দেখেছি তাদের কাছেও বিষয়টি ছিল পরম বিস্ময়কর। আমরা ভাবতেও পারিনি আমাদের দেশের এত বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ একসঙ্গে এতগুলো ঘর পেয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবে। কিন্তু সেই অসম্ভবটি বাস্তবে রূপ দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয়, আগামী মাসে আরো ১ লাখ পরিবার এভাবেই নতুন ঠিকানা পেতে যাচ্ছে। মুজিববর্ষে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছরে প্রায় ৯ লাখ পরিবার এভাবে নতুন ঘর এবং নতুন ঠিকানা পেতে যাচ্ছে। এই ঘোষণাটি যখন প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের সম্মুখে বলছিলেন তখন যারা শুনছিলেন তাদের সবার কাছেই ছিল এটি বিস্ময়কর সংবাদ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ‚মিহীন ও আশ্রয়হীনদের জন্য নির্মিত বাড়ির চাবি প্রতীকীভাবে যখন তুলে দিয়ে বলছিলেন যে, মুজিববর্ষের এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় উপহার ও উৎসব তখন স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং মুজিব বছর পালনের যথার্থ তাৎপর্য নতুনভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। এতদিন অনেকেই মুজিব শতবছরের কথা শুনলে হয় নীরবতা পালন করত, কিংবা মুজিব শতবছরের প্রতি একাত্ম না হয়ে বরং কিছুটা বিরূপ ভাবাপন্ন হতো, মনে করত মুজিবকে নিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার সরকার বাড়াবাড়ি করছেন, জানি না তারা এখন দেশের প্রায় ৯ লাখ পরিবারের নতুন আশ্রয় ও ঠিকানা পাওয়ার বিষয়টি দেখে মুজিব শতবছর ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের তাৎপর্য কতটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তবে যে লাখ লাখ মানুষ স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে থাকার মতো একটি ঘর লাভ করেছিলেন তাদের কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ এখানেই নিহিত রয়েছে বলে তারা এবং আমরা মনে করি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ এভাবেই ঘরহীন, ঠিকানাহীনভাবে জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন, অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন, দেখে যেতে পারেননি একটি নিজের ঘর, আজ বেঁচে থাকা আশ্রয়হীন মানুষরা স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় এসে লাভ করলেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি থাকার মতো বাসস্থান। এই বছর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী একজন মানুষও ঘরহীন, ঠিকানাবিহীন থাকবেন না। তিনি সবাইকে অনুরূপ ঠিকানা দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। সেই মহাকর্মযজ্ঞই দেশের ভেতরে চলছে। অথচ আমরা অনেকেই জানতাম না, টেরও পাইনি যে, এ বছর করোনা মহামারির এত দুর্যোগময় সময়ও এত সাহসী উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভেতরে ভেতরে বাস্তবায়ন করে চলছেন। এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজটি মাত্র কয়েক মাস আগে বাস্তবায়ন শুরু হয়। সে কারণে অনেকেই জানতে পারেনি, টেরও পায়নি। অথচ যাদের ভ‚মি ছিল না তাদের দুই শতক ভ‚মির ওপর এবং যাদের ভ‚মি ছিল কিন্তু ঘর ছিল না তাদের একই রঙের একই পরিমাপের একই সুবিধাসংবলিত থাকার বাড়ি নির্মাণ করে দিলেন। বাড়িতে দুটি থাকার কামড়া, একটি টয়লেট, একটি রান্নাঘর বিদ্যুৎ সংযোগসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এমন পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিনন্দন বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এই বাড়ি নির্মাণে খরচ হচ্ছে মাত্র ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা; যা ভাবতেও অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। এমন কর্মযজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরাসরি তত্ত্বাবধায়ন করা হয়, মাঠের ইউএনওসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ সবার সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি যাতে না ঘটে সেজন্য নামের তালিকা কয়েকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এমন একটি পরিচ্ছন্ন প্রকল্প এত কম খরচে, এত সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ঘর এবং কেবল সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করার বিষয়টি ছিল মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই রাত-দিন পরিশ্রম করে চলছেন, এ বছরের মধ্যেই বাকি সব ভূমিহীন, আশ্রয়হীন, ঠিকানাবিহীন মানুষকে একইভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হবে।
এত বিপুলসংখ্যক আশ্রয়হীন ও ভূমিহীনদের পৃথিবীর কোনো দেশে এভাবে ঘর প্রদানের নজির নেই। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক বছর আগে আশ্রয়হীনদের বাড়ি করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু নোয়াখালীতে আশ্রয়হীন মানুষদের মধ্যে ঘর তুলে দেয়ার সময় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন যে, তার লক্ষ্য হচ্ছে সব মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা। এটি আমাদের সংবিধানেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গঠনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটি তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দেশের প্রতিটি মানুষের থাকার বাসস্থান দেয়ার নিশ্চয়তা বিধান করার প্রতিশ্রুতি দেন। সেটি তিনি মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রতিপালন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। সেই লক্ষ্য পূরণেই তিনি ২০২০ সালে জানুয়ারি মাস থেকেই গৃহহীন মানুষের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব প্রদান করেন। করোনার কারণে এই প্রকল্পের কাজ শুরুতে কিছুটা ধীরগতিতে হলেও অক্টোবর মাস থেকে দ্রুতগতিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের তাগাদা দেন। অবশ্য গত বছরই কক্সবাজারে বেশকিছু মানুষকে অ্যাপার্টমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে আশ্রয়হীনদের ঠিকানা প্রদানের যাত্রা শুরু করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান উদ্যোগ। সামনের দিনগুলোতে দেশব্যাপী যত গৃহহীন ও আশ্রয়হীন মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে তাদেরও গৃহদানের তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিত্তশালী মানুষদের এগিয়ে আসার জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে তার ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। আশা করা যাচ্ছে এ বছরই দেশে গৃহহীনদের থাকারই শুধু নয় নানা ধরনের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, এসব হতদরিদ্র মানুষের গৃহদানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেয়া হবে। সেটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের দেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে উঠে আসবেন তা-ই নয়। নারী-পুরুষই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হবেন যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। তা ছাড়া তাদের সন্তানরা শিক্ষা লাভের সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই উন্নত জীবন লাভের স্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাজের একেবারের নিম্নস্তরের মানুষকে গৃহদানের মাধ্যমে প্রকৃতই সম্পদের মালিকানার অংশীদারিত্ব প্রদান করেছেন এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষায় বেড়ে ওঠার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে যুক্ত হওয়ার দ্বার খুলে দিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে আবিভূত হওয়ার সুযোগ লাভ করবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হতদরিদ্র মানুষের জীবনকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংবিধানে যেসব মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া আছে সেগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। অথচ দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো এতদিন আমরা পূরণ করতে পারিনি। আমরা এত বছর দারিদ্র্য দূরীকরণের যেসব রাজনৈতিক প্রতিশ্রæতি দলগুলোর কাছ থেকে শুনেছিলাম সেটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ আগে কোনো দল বা সরকারই নেয়নি। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার এবার সেই কঠিন এবং দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করার নজির স্থাপন করলেন। পৃথিবীতে এই নজির আর দ্বিতীয়টি নেই। বাংলাদেশ অচিরেই দারিদ্র্যমুক্ত একটি রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়