প্রকাশ পেল ‘‌‌স্ফুলিঙ্গ’ সিনেমার ফার্স্ট লুক

আগের সংবাদ

এড়াব কী করে

পরের সংবাদ

ভোটের প্যাটার্ন এবং ভোটারদের চিন্তাধারা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২১ , ১০:৪৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৪, ২০২১ , ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

নির্বাচনের প্রতি আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের জোশ কাজ করে। এ যেন ঠিক বিয়েবাড়ির উৎসব। প্রচার-প্রচারণা, পোস্টার-ফেস্টুন, জনসংযোগ, মাইকিং, সভা-সমিতি, উঠান বৈঠক, প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীদের গরম গরম কথা, উত্তেজনা, বিদ্বেষ, মারামারি, খুনোখুনি- সবকিছু মিলিয়েই একটি নির্বাচনের সার্বিক দিক। পৌরসভা নির্বাচন বেশ গুরুত্ব বহন করে। শহর ও শহরতলির অবকাঠামো উন্নয়ন ও নাগরিকদের জীবনমান প্রশ্নে পৌরসভা অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। তাই এ নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের একটি বাড়তি আগ্রহ আছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো পৌর নির্বাচনেও ভোটকেন্দ্রগুলো ক্ষমতাসীনদেরই দখলে ছিল। কাউন্সিলর প্রার্থীর ভাই খুন, কাউন্সিলর প্রার্থী, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট, বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থী খুন, ভোট শেষে ব্যালট ও সরঞ্জাম নিয়ে ফেরত আসার পথে পুলিশের ওপর হামলা ইত্যাদি নানা ধরনের সহিংসতা দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল এবারের পৌর নির্বাচন। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রার্থীদের ভোট প্রাপ্তির সংখ্যা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মøান করে।
পৃথিবীর কোনো কোনো উন্নত দেশে ইদানীং একটি শখের উৎসব হচ্ছে। অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে উপস্থিত হয় কনে বউ। তার চারপাশে থাকে বান্ধবীরা উৎসবের আমেজে। অতিথিদের মুখে হাসি, হাতে উপহার, খাদ্যের ছড়াছড়ি। ক্লিক ক্লিক আওয়াজ তুলে কনে এবং অতিথিদের ছবি তোলা হচ্ছে ফটোগ্রাফার দিয়ে। উচ্চৈঃস্বরে গান চলছে। গানের তালে তালে অতিথিদের কেউ কেউ নাচ করে যাচ্ছেন। একটি আড়ম্বরপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠানের সবকিছুই উপস্থিতÑ নেই শুধু বর। এমন ‘সিঙ্গেল ম্যারেজ’ অনুষ্ঠান ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কিছু কিছু দেশে। বিয়ে দিনটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল যেসব মেয়েদের, তারা থেমে যেতে চান না। স্রেফ বর খুঁজে না পাওয়ায় তারা তাদের স্বপ্ন থেকে পিছিয়ে যেতে চান না। তাই একা একাই সাধ মিটিয়ে বিয়ে করছেন মেয়েরা। নিজেকেই বিয়ে করছেন। নিজে ভাবতে চাচ্ছেন, এরপর থেকে তারা বিবাহিত। উদাহরণটি কেন দিলাম! কারণ আমাদের নির্বাচনটিও যেন ধীরে ধীরে এমন একটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। জনসভার চাকচিক্য, মিছিলে ব্যান্ডপার্টি, প্রার্থীর মুখে থরে থরে সাজানো প্রতিশ্রুতি কোনো কিছুরই অভাব নেই। যাকে নিয়ে এত আয়োজন, সেই নির্বাচনটিই হচ্ছে না অংশগ্রহণমূলক। ভোটাররা খুঁজে পাচ্ছেন না উৎসাহ, গণতান্ত্রিক বাস্তবতা।
নির্বাচনের ঘণ্টা বাজার আগেই অনুষঙ্গ হিসেবে শুরু হয়ে যায় প্রাক-নির্বাচনী সন্ত্রাস। নির্বাচনের দিন শুরু হয়ে যায় হিংসা-বিদ্বেষ, খুন-জখম। নির্বাচনী হিংসার বহুবিধ ঘটনার পেছনে কে বা কারা, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক তর্ক ও মিডিয়ার প্রচারে জনগণের তালগোল পাকিয়ে ফেলার অবস্থা। এগুলোর কোনোটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল, কোনোটি ক্ষমতা দখলের প্রকাশভঙ্গি, কোনোটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ, কোনোটা অন্তর্দ্বন্দ্বের ফসল, কোনোটি আবার একেবারেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন আর্থিক স্বার্থের লড়াই। হিংসা এক্ষেত্রে এক রাজনৈতিক কৌশল। ডিভাইড এন্ড রুলের এক সুপ্রযুক্ত মাধ্যম। এই সন্ত্রাস অনেক বড় হয়ে ওঠে, যখন এটা মদদ পায় প্রশাসনিক অবকাঠামো থেকে। শুধু বাংলাদেশই যে এ রোগের একমাত্র রোগী, তা ভাবলে ভুল হবে। এক সময় ইউরোপে ‘নির্বাচনী সন্ত্রাস’ বলে কোনো শব্দই তাদের পরিচিত ছিল না। কিন্তু এখন সেখানে তা ডাল-ভাতরূপে মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকায় নির্বাচনী সন্ত্রাস হচ্ছে ১৮ শতাংশ নির্বাচনে, এশিয়ার দেশগুলোতে হচ্ছে ৩৯ শতাংশ, পশ্চিম এশিয়ায় এবং সাহারা মরুভ‚মির দক্ষিণাবর্তী আফ্রিকাতে ৩৮ শতাংশ আর সোভিয়েত ভেঙে তৈরি হওয়া দেশগুলোতে ৪৭ শতাংশ নির্বাচনে। তবে নির্বাচনী সন্ত্রাস গণতান্ত্রিক বাতাসে এবং স্বৈরাচারী আবহাওয়ায় ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা দেয়। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনী সন্ত্রাস ঘটে শাসনব্যবস্থার উৎসাহে এবং মদদে। সেখানে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ সবাই একত্রে যোগদান করে। যেখানে গণতন্ত্রের ভিত যত মজবুত, যেখানে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ যত দৃঢ়, সেখানে নির্বাচনী সন্ত্রাস ততটাই হ্রাস পায়। বর্তমান বিশ্বে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচনী হিংসার অস্তিত্ব¡ অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি পশ্চিম দুনিয়াও এই নির্বাচনী সন্ত্রাসের বাইরে নয়। হিংসা অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনে কারসাজির একটি কার্যকর উপায়। নির্বাচনী হিংসার শিকার মানুষরা, এমনকি হিংসা-বিধ্বস্ত অঞ্চলের অন্য ভোটাররাও ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাৎক্ষণিকভাবে কমে যায় ভোটদানের হার। বিপক্ষের ভোট রুখতে সন্ত্রাসকে তাই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় অনেক ক্ষেত্রেই। ধর্ম, বর্ণভিত্তিক দাঙ্গার ফলে ভোটের ধরন বদলাতে পারে। দাঙ্গার ফলে কারো ভোট বাড়তে পারে, আবার কারো ভোট কমতে পারে। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৬৮ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যার পর কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলন, দাঙ্গা, কারফিউতে অশান্ত হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। সেই আবহের মধ্যেই সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে অস্থিরতায় প্রভাবিত কাউন্টিগুলোতে কৃষ্ণাঙ্গদের অপছন্দের রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের ভোট বৃদ্ধি পেয়েছিল ৬-৮ শতাংশ।
নির্বাচনী সন্ত্রাস ভোটের প্যাটার্ন এবং ভোটারদের চিন্তাধারা বদলে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে যখন সন্ত্রাসে কিংবা নির্বাচন কলাকৌশলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অংশ পক্ষ হয়ে ওঠে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং সমাজতাত্তি¡ক গবেষণার বিষয়বস্তু। সাধারণ ভোটার, প্রার্থী, রাজনৈতিক দল সবারই বিষয়টি বোঝা জরুরি। আমাদের দেশে এ বিষয়ে কখনো কোনো বিস্তারিত গবেষণা হয়নি। ২০১৩ সালে কেনিয়াতে এ বিষয়ে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সমীক্ষাভিত্তিক গবেষণার ফলাফল সবাইকে চমকে দিয়েছিল। নির্বাচনী হিংসা ছড়ানো দল এবং প্রার্থীর যোগ্যতা যতই থাকুক, সমীক্ষায় দেখা যায়, নির্বাচনী হিংসায় জড়িত দল এবং তাদের প্রার্থীর ভোট কমে যায় কমপক্ষে ৯ শতাংশ। বাংলাদেশের ভোটাররা হিংসাশ্রয়ীদের ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে কেনিয়া বা আফ্রিকার ভোটারদের মানসিকতা বজায় রাখে কিনা, তা জটিল সমাজতান্ত্রিক প্রশ্ন। তবে এর থেকেও বড় প্রশ্ন হলো- নির্বাচন কমিশন কিংবা শাসনব্যবস্থার অক্ষমতা কিংবা পক্ষপাতিত্বের কারণে ভোটারকে ভোটকেন্দ্রমুখী করা থেকে বিরত রাখার কাজে সাহায্য করেছে কিনা। ভোটের প্রতি আগ্রহ, ভোটে সন্ত্রাস হবে না এমন একটি আস্থার জায়গা তৈরি করার মধ্যেই আগামী দিনের ভোটযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। ভোটারদের মনে এই বিমূর্ত বিশ্বাস সঞ্চারিত করাটা আজকের ভোটযুদ্ধের অংশ হওয়া জরুরি। এমন নয় যে, সবাইকে সহমত হতে হবে। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তে সবার অংশীদারি থাকতে হবে। এটিই গণতন্ত্রের একেবারে গোড়ার কথা। অন্যের কথা শোনার ইচ্ছা, নিজের কথা বলার ক্ষমতা- এটাই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা। ভোটারকে যদি ভোটকেন্দ্রেই না আনতে পারলেন, তাহলে তাদের কথা শুনবেন কীভাবে? আর সেটা হলে তো গণতন্ত্র থাকল না। যে ক’টা লোক আপনার কথায় হাততালি দেয়, তাদের নিয়ে ভোটযুদ্ধে পাস করলেও জনগণের প্রতিনিধি হওয়া যায় না।

নিজ পক্ষের, অন্য পক্ষের এবং নিরপক্ষের সব ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আসার সুযোগটি অবশ্যই করতে হবে। তা না হলে, নির্বাচন হয়ে উঠবে দর্শকহীন শূন্য মণ্ডপে ঢাকের বাদ্যের মতো। এখানে ভয়টা অন্য জায়গায়। ভোটাররা ঠিকই ভোটের প্রতি আগ্রহী থাকে। সন্ত্রাস কিংবা অন্য কোনো কারণে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারলেও কিংবা আসতে না চাইলেও তাদের মধ্যে ভোটের আবেদন জাগ্রত থাকে। যদি কখনো ভবিষ্যতে তারা ভোটকেন্দ্রে এসে নিজের ইচ্ছাটা পূরণ করার সুযোগ পায়, তখন কিন্তু তারা ভোটটা দিয়ে দেবে অন্য ঘরে- যেখান থেকে সন্ত্রাস কিংবা বাধা আসেনি। তখন আপনি নিজেকে যতই উপযুক্ত ভাবুন, যতই জনপ্রিয় ভাবুন- ভোটগুলো চলে যাবে অন্য ঘরে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়