কমলাপুরে পোশাক কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০ ইউনিট

আগের সংবাদ

সিটি করপোরেশনের মশা মারার ওষুধ অকার্যকর

পরের সংবাদ

বাকযুদ্ধে বিব্রত আওয়ামী লীগ!

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২১ , ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৪, ২০২১ , ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

লাগাম টানতে কড়া বার্তা হাইকমান্ডের।

সারাদেশে চলছে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন। আওয়ামী লীগেও শুরু হয়েছে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সম্মেলন-কাউন্সিল ও কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া। আর এসব ঘিরে করোনাকালের আড়ষ্টতা কাটিয়ে জেগে উঠেছে ক্ষমতাসীন দলটির তৃণমূল। কোথাও ভোটের দৌড়ঝাঁপ; কোথাও কমিটি নিয়ে তোলপাড়। বাড়ছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। এরই মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়েছেন নেতারা। একে অন্যকে ঘায়েল করতে মেতেছেন বাকযুদ্ধে। এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। ট্রল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। যার প্রভাব পড়তে পারে দলটির সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর। তৃণমূলের দায়িত্বশীল নেতাদের এসব কর্মকাণ্ডে অস্বস্তিতে দলটির হাইকমান্ডও। বিবদমান নেতাদের মুখের লাগাম টানতে এরই মধ্যে দেয়া হয়েছে কড়া বার্তা।

আওয়ামী লীগ নেতাদের সাম্প্রতিক বাকযুদ্ধের প্রথম ঘটনাটি রাজধানীতেই। সেদিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর ২০২০। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অবৈধ দোকান বরাদ্দে অনিয়ম ও ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে একটি মামলাকে কেন্দ্র করে সূচনা। মামলার বাদী একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দেলু। ওই দিন বিকালে এক প্রতিক্রিয়ায় সাঈদ খোকন ওই মামলার জন্য বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে দায়ী করেন।

তিনি বলেন, সবাই বলে বর্তমান মেয়র শেখ তাপস তার নিজের লোক দেলোয়ার হোসেন দেলুকে দিয়ে এসব নোংরামি করাচ্ছেন। এতে তার নিজের ও দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পরদিন শেখ তাপস জানান, অভিযান দুর্নীতির বিরুদ্ধে; কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। এতে কারো ইমেজ ক্ষুণ্ন হলে, সেটা তার ব্যাপার।

এরপর ৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের সামনে এক মানববন্ধনে সাঈদ খোকন অভিযোগ করেন, মেয়র ফজলে নূর তাপস সিটি করপোরেশনের শত শত কোটি টাকা নিজের মালিকানাধীন মধুমতি ব্যাংকে সরিয়েছেন। তাপসকে দুর্নীতিবাজ উল্লেখ করে তার মেয়র পদে থাকার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন খোকন। জবাবে ডিএসসিসি মেয়র তাপস বলেন, সাঈদ খোকনের বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। দায়িত্বশীল পদে থেকে তার জবাব দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে তাপস বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারি নীতিমালা মেনেই মধুমতি ব্যাংকে টাকা লেনদেন করা হয়েছে। এমনকি সাঈদ খোকনের বক্তব্য মানহানিকর উল্লেখ করে প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও ইঙ্গিত দেন তিনি। ওই দিন বিকালেই দুজন আইনজীবী ঢাকার একটি আদালতে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে দুটি মানহানি মামলার আবেদন করেন। যা ব্যারিস্টার তাপসের অজান্তেই হয়েছে। জবাবে সাঈদ খোকন পুনরায় একটি ভিডিও বার্তায় তাপসকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন এবং বলেন, ‘তাপসের মানসম্মানের বাজার মূল্য কত, আমি তা যাচাই করব’। তাদের এই দুজনের বক্তব্য দলের নয়, ব্যক্তিগত; গণমাধ্যমে এমনটিই জানিয়েছেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।

তাপস-খোকনের এই বাহাসের মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তোলে নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জার বক্তব্য। যিনি দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আপন ছোট ভাই। একটি নির্বাচনী সভায় মির্জা কাদের নোয়াখালী ও ফেনী জেলার শীর্ষ দুই নেতা একরামুল করিম চৌধুরী ও নিজামউদ্দিন হাজারীর বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য রাখেন। তাদের ইঙ্গিত করে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ২-৪ টা আসন বাদে বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না বলেও বক্তব্য রাখেন। তিনি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও কথা বলেন। এমনকি নিজের বড় ভাই ওবায়দুল কাদের ও ভাবীকে নিয়েও কথা বলতে ছাড় দেননি। নির্বাচনে তার বিজয় ঠেকাতে সন্ত্রাসী বাহিনী পাঠানোর অভিযোগও তুলে ধরেন ওই দুই জেলার দুই নেতার প্রতি। সত্য বলায় ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতা তাকে ফোনে ধমকিয়েছেন বলেও প্রকাশ্যে জানান। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে অস্বস্তিতে পড়ে আওয়ামী লীগ।

কাদের মির্জার বক্তব্যের সূত্র ধরেই ফরিদপুরের সংসদ সদস্য ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবর রহমান ওরফে নিক্সন চৌধুরী কাদের মির্জাকে পাবনায় পাঠানোর কথা বলেন। এই বক্তব্যেরও প্রতিক্রিয়া দেন কাদের মির্জা। বলেন, তার রাজনৈতিক বয়সের সমান বয়সও হয়নি নিক্সন চৌধুরীর। এ নিয়ে শুরু হয় নতুন বাহাস। যা পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়। এতে অস্বস্তি বাড়ে আওয়ামী লীগে। দলটির শীর্ষ নেতারা কথা বলতে শুরু করেন। এমনকি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার ভাইয়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে বলেন, শেখ হাসিনা ছাড়া এ দলের জন্য কেউ অপরিহার্য নয়। যারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবে, তাদের বিরুদ্ধেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউই ছাড় পাবেন না।

কাদের মির্জা-নিক্সন চৌধুরীর এই বাহাস শেষ না হতেই শুরু হয়েছে নতুন ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী ওবায়দুল কাদের এবং তার পরিবারকে রাজাকারের পরিবার বলে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি কথা বললে তো আর মির্জা কাদেরের বিরুদ্ধে কথা বলব না। আমি কথা বলব ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে। একটা রাজাকার পরিবারের লোক এই পর্যায়ে আসছে, তার ভাইকে শাসন করতে পারে না। এগুলো নিয়ে আমি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কথা বলব, আমার যদি জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি না আসে, তাহলে আমি এটা নিয়ে শুরু করব।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এই বক্তব্য ভাইরাল হলে নতুন আলোচনার সূত্রপাত হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। ওবায়দুল কাদের এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় শুরু হয়েছে আন্দোলন। তার ভাই আবদুল কাদের মির্জা লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গতকাল তা স্থগিত করে আজ কোম্পানিগঞ্জে অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। পরে অবশ্য এ কর্মসূচিও স্থগিত করা হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে উদ্দেশ করে দলীয় সাংসদের এরকম বক্তব্য দেয়ায় বিব্রত কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা এই ঘটনাকে কোনোভাবেই ভালো চোখে দেখছেন না। এতে প্রাচীনতম এই সংগঠনটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি হবে। এ ধরনের বক্তব্য তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কোনোভাবেই বরদাশত করবে না। দলটির একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, যা চলছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে আমরা বিব্রত। দলের কোনো নেতাকর্মী এসব পছন্দ করে না। অতিকথন বা দলকে বিতর্কিত করার জন্য যারা কাজ করে, তারা যত বড়ই হোক না কেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় অবশ্যই হাইকমান্ড কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ একটা বৃহৎ পরিবার। সেখানে নানা ধরনের টানাপড়েন থাকতে পারে। কিন্তু মূল রাজনীতিতে সবাই একমত। তিনি বলেনÑ হ্যাঁ, দলে টানাপড়েন না থাকা ভালো। এটা দূরের প্রচেষ্টাও আছে। নোয়াখালীর বসুরহাটে যে হরতাল ডাকা হয়েছিল, ইতোমধ্যে তা প্রত্যাহারও করা হয়েছে। এখানেই প্রতীয়মাণ হয় যে দলীয় শৃঙ্খলা মানার মতো মানসিকতা সবার আছে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়