সাংবাদিকের মুঠোফোন কেড়ে নিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান

আগের সংবাদ

বাংলাদেশের চেয়ে কম বয়সী ৫৯টি রাষ্ট্র

পরের সংবাদ

পিরিয়ড নারীর কাল নয়, অহংকার

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২২, ২০২১ , ১০:১৬ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২২, ২০২১ , ১০:১৯ অপরাহ্ণ

নারীর পিরিয়ডই এখন বড় বাধা হয়ে উঠল তার সাংবিধানিক অধিকার ভোগের প্রশ্নে। বাধা এসেছে আইন মন্ত্রণালয় ও বিচারিক রায় থেকে। তেমন সংবাদই প্রকাশিত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রচারমাধ্যমে। আয়েশা সিদ্দিকা স্বপ্ন দেখেছেন তিনি একজন কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হবেন। স্বপ্ন দেখতেই পারেন। বিধি অনুযায়ী সব শর্র্ত পূরণ করে তিনি লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদনও করেন। প্রথমে আইন মন্ত্রণালয় থেকে তার আবেদন নাকচ করা হয় একজন নারী হওয়ার কারণে। তিনি একটি অনলাইন পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে এ তথ্য দিয়েছেন, যা পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে। এমন সংবাদ পড়ে অনেকের ভেতর ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। আয়েশা উল্লেখ করেছেন নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী হওয়ার বিধিমালায় কোথাও উল্লেখ নেই যে, একজন নারী নিকাহ বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না। তারপরও আইন মন্ত্রণালয়ে তার আবেদন গ্রহণ হয়নি। গ্রহণ না করার চেয়ে যে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক তা হলো গ্রহণ না করার কারণটি।

আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই আজ এই লেখাটি লিখতে বসেছি। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে যতগুলো আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, হচ্ছে এবং আগামীতে হবে তার সব আইনই বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ভোগ ও তার জানমালের নিরাপত্তার জন্য এবং সব আইনই বাস্তবতার বিবেচনায়। বলাবাহুল্য যে, সেটা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্যও। এখানে নারী ও পুরুষ উভয়ই বাংলাদেশের নাগরিক। কোথাও পুরুষকে অতিনাগরিক বলা হয়নি যে অধিকার বা সুবিধাপ্রাপ্তি তার কপালে বেশি জুটবে, জুটাতে হবে। এমন একটি অবস্থায় একজন নারীর নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার আবেদন খোদ আইন মন্ত্রণালয় থেকে নাকচ হওয়ার বিষয়টি নারীর সাংবিধানিক অধিকার হরণ ও তার নিরাপত্তাকে ক্ষুণœ করে যেটা আদতে করা যায় কিনা, কেউ কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান করতে পারে কিনা সেই-ই প্রশ্নই আজ মনে জেগেছে। যা হোক, আয়েশা সিদ্দিকা তার সাংবিধানিক অধিকার আদায় করার জন্য মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হন। হতেই হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, মহামান্য আদালতের বিচারিক রায়ে তার অধিকার ফিরে আসে না। বরং আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তেরই পুনরাবৃত্তি ঘটে আদালতের রায়ে। যুক্তি ওই একটাই, তার পিরিয়ড বা মাসিক।

এটা তো সত্য যে, সারা বিশে^র মতো যেখানে বাংলাদেশের নারীরাও পর্বত চ‚ড়ায় উঠছেন, ক্রিকেট-ফুটবল খেলে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছেন, আনছেন। বিমান-ট্যাংক-অস্ত্র চালাচ্ছেন, দেশের প্রতিরক্ষায় পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন, প্রশাসন চালাচ্ছেন। পোশাক শিল্প-কৃষি-কলকারখানা ইত্যাদি উৎপাদনমূলক সেক্টরে যেখানে লাগাতার শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। ভ‚মিকা রাখছেন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বুদ্ধিজ্ঞান দিয়ে। কোথাও নারীর পিরিয়ড সংক্রান্ত বাধা নেই। ঠিক এমন একটা সময়ে নারীর পিরিয়ডের অজুহাতে নারীকে নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে অযোগ্য ভাবা কতটা যুক্তিযুক্ত কিংবা গ্রহণযোগ্য! এই সত্য সবাই মানি তো যে, রাষ্ট্রের যে কোনো সিদ্ধান্ত, বিচারিক রায় তো সংবিধানসম্মত হতেই হবে, হওয়া উচিত তাই না? উল্লিখিত পেশায় নিয়োগের সময় নিশ্চয়ই নারীর পিরিয়ড প্রসঙ্গ আসে না। তাহলে নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের প্রশ্ন আসছে কেন? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। শ্রদ্ধা রেখে বলছি, কারণটা যারা বাধা দিচ্ছেন সম্ভবত তাদের মতোই কিনা।

আজকাল নাকি অধিকাংশ বিয়েশাদি মসজিদে পড়ানো হয়। যদিও আমার চারপাশে এমন নজির খুব একটা চোখে পড়েনি। কাজি অফিসে, কোর্টে, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে বিয়ে পড়ানোটাই চোখে পড়েছে কেবল। সামাজিক এই সম্পর্ক তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের বাইরে নয়। যা হোক বলা হলো, পিরিয়ড হলে নারী মসজিদে যেতে পারেন না অপবিত্রতার প্রশ্নে। পেছন থেকে টেনে ধরা হলো যেন আয়েশা সিদ্দিকা সামনে এগোতে না পারেন। এখানে ধর্মের অজুহাত বাড়িয়ে দেয়া হলো। সেসঙ্গে পিরিয়ডকালে নারী অপবিত্র থাকেন সেইদিকে তর্জনী নিক্ষেপ করা হলো। মানে কী? শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে একজন নারীকে কেন পবিত্র-অপবিত্রতার পাল্লায় তোলা হবে? পুরুষের কি এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্য নেই? নাকি রঙের ভিন্নতার জন্য নারীকেই কেবল অপবিত্রতার দায় নিতে হবে? মূল প্রশ্ন হলো শারীরিক গুণ বা বৈশিষ্ট্যজনিত কারণে কেন একজন মানুষ অপবিত্রতার দায় কাঁধে নিয়ে তার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন? এসব প্রশ্নের জবাব দেয়ার কে আছেন ভীষণ জানার আগ্রহ বোধ করছি।

পিরিয়ড বা মাসিক বা ঋতুস্রাব যাই-ই বলি না কেন সেটা একজন নারীর এমন এক বৈশিষ্ট্য, গুণ যা তার মাতৃত্বকে নিশ্চিত করে, মা হতে সহায়তা করে। পৃথিবীতে সন্তান ধারণের মতো পবিত্র গুণ আর কাজ কী আছে। কিস্সু না। এই মানব সভ্যতা, মানবধর্ম, আচার-আচরণ, সৃষ্টি সবই তো টিকে আছে মানব সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালনের ওপর। যে রক্তকে নারীর অযোগ্যতা ও অপবিত্রতার কারণ হিসেবে দেখা হলো, সেই রক্তদলা থেকেই যে তাদের জন্ম, মানব গড়ন নিয়ে ভ‚জগতে ভ‚মিষ্ঠ হওয়ার উৎস, কত ধরনের জ্ঞানগরিমা একবারও মনে হলো না সেই সত্যটুকু! বেমালুম ভুলে যাওয়া হলো! ভুলে গিয়ে থাকলে তা সত্যিই দুঃখজনক। আবার যদি এমন হয় যে গোঁড়ামিপনার সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে কেউ কেউ চির সত্যকে স্বীকার করতে চাইছেন না এবং নারীকে এগিয়ে যেতে দিতে আদতে চাইছেন না, পেছন থেকে অন্য কোনো ধ্যান-ধারণার মূলমন্ত্র কাজ করানো হচ্ছে এবং তা অতিগোপনে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা দরকার রাষ্ট্রকে। এ কারণে যে, এখানে পবিত্র সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কিছু করণীয় আছে কিনা তা ভাবার জন্য। বাংলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটা গোপন যুদ্ধ তো চলেই সবসময়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই হয়। আমি নিশ্চিত তারা বিষয়টি উপলব্ধি করে নারীর মর্যাদা রক্ষার্থে সংবিধানসম্মতভাবে অধিকার ভোগের বিষয়টি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের আদেশ ও পরামর্শ দেবেন। একটি রাষ্ট্রে নারীর মানব মর্যাদা নিশ্চিত না হলে সেই রাষ্ট্র সম্মানিত হয় না বিশ^বিবেকের দরবারে, নিজেদের কাছেও না। পাশাপাশি যে উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের স্থায়িত্বশীল বা টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবা হচ্ছে সেই পথও মসৃণ ও সহজ হবে না। এমন একটি সংবাদ চোখে পড়ল না যে, কোনো বুদ্ধিজীবী মুখ খুলেছেন, এই প্রসঙ্গে কিছু বলেছেন। এমনকি নারীবাদী সংগঠকদের মাঝ থেকেও কোনো জোরালো বক্তব্য ও মতামত পেলাম না, দেখলাম না। যা কিছু প্রতিবাদ, প্রতিক্রিয়া তা সোশ্যাল মিডিয়ায়, রাজপথ কিংবা মঞ্চে নয়। যাদের অধিকাংশই সচেতন পুরুষ।

উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিকতার যুগে নারীর পিরিয়ডকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করা কিংবা মনে করা কিসের আলামত তা দেখা দরকার। আয়েশা সিদ্দিকা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেই নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে আবেদন করেছেন। অধিকারের বিষয়ে তার চ্যালেঞ্জ কোনো কোনো নারীবাদীর চেয়েও শক্তিশালী এবং অতিযৌক্তিক। এমন একটা ইস্যু নিয়ে তার যুদ্ধ ঘোষণা যা প্রকৃতার্থে নারীর মর্যাদার বিষয়টিকে আপসহীনভাবে দৃশ্যমান করে। তার এই যুদ্ধ ঘোষণায় সুপ্ত থাকা নারীর প্রতি অবমাননার বিষয়টি জেগে ওঠে এবং তা বরাবারের মতো ধর্মীয় অজুহাতে। সুতরাং সব স্তরের সচেতন নাগরিক যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত তাদের আয়েশা সিদ্দিকার স্বপ্নের পাশে থাকা দরকার। সময় এসেছে দৃঢ়ভাবে বলার পিরিয়ড একজন নারীর কাল নয়, বরং অহংকার।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়