একজন শিল্পীর সংগ্রামী জীবনকথা

আগের সংবাদ

বাংলাদেশ এই বোঝা থেকে মুক্তি চায়

পরের সংবাদ

সমাজের এই ভগ্নদশা থেকে মুক্তি মিলবে কবে

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০, ২০২১ , ১০:২১ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২০, ২০২১ , ১০:২১ অপরাহ্ণ

দেশে চলমান করোনা মহামারির মধ্যেও কমছে না ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা। মাঝে মাঝে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে অস্বাভাবিক দৈহিক সম্পর্ক এবং এর করুণ পরিণতি দেশের সমাজসচেতন মানুষকে বড্ড ভাবিয়ে তোলে। গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী আনুশকা নূর আমিনকে তার সহপাঠী বন্ধু ১৮ বছর বয়সের ফারদিন ইফতেখার দিহান লেখাপড়ার ছুতো দেখিয়ে ডেকে কলাবাগানের ডলফিন গলিতে নিজ বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে বিকৃত যৌনাচারের শিকার আনুশকা অসুস্থ হয়ে পড়লে দিহান তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আনুশকার মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিছুদিন আগে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এখলাশপুর ইউনিয়নে নারী নির্যাতনের বীভৎস চিত্র গোটা জাতিকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। বখাটে যুবকদের কুপ্রস্তাব ও মাদক বিক্রিতে রাজি না হওয়ায় মধ্যবয়সি এক নারীকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণ ও মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন সভ্য সমাজের জন্য ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। অন্য এক ঘটনায় সিলেটের টিলাগড় এলাকার গৃহবধূর ধর্ষকরা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের সামনে স্বামীকে আটকে রেখে তার সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঔদ্ধত্য দেখায়। ওই দম্পতির গাড়ি আটকে রেখে অর্থ দাবি করে। আনুশকা দিহান ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থী বলে এমনটি ঘটেছে তা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। দেশের সাধারণ স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বেলায় এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।
ধর্ষণের মতো একটি অপরাধ সংঘটিত হলেই নারীর প্রতি আঙুল তোলা হয়। কটাক্ষ করা হয় তার পোশাক নিয়ে, নির্বিঘ্ন চলাফেরা নিয়ে। যেমনটি হয়েছে আনুশকার বেলায়। নারীর পোশাক বা পুরুষের কামপ্রবৃত্তির উন্মাদনা ধর্ষণের মূল কারণ নয়। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারীকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে না পারার মানসিকতা পুরুষের মাঝে যে মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ববোধের জন্ম দেয় তা থেকে মূলত তাদের ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। অর্থবিত্ত ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা বা তাদের মদদপুষ্টরাই ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধ করে থাকে। ক্ষমতার দাপটের কাছে আইন বা ন্যায়নীতির বাঁধন কোনো কিছু করতে পারবে না বলে তারা ধরে নেয়। বিত্তশালী পরিবারের সন্তান দিহানের হাতে এত কম বয়সেই তার পরিবার তুলে দিয়েছিল গাড়ি। সেই গাড়িতে করেই আনুশকাকে সে নিজ বাড়িতে নিয়ে বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হয়।
বেগমগঞ্জের অসহায় নারীকে ধর্ষণ করে যে যুবক সে বেগমগঞ্জ এলাকার প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত-পালিত, অনেক অপকর্মের খলনায়ক। সেখানে সে বাহিনী গড়ে তোলে নির্বিঘ্নে এলাকায় দাপিয়ে বেড়ায় এবং বিষয়টি কাউকে জানালে ধর্ষিতাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার সাহস পায়। তার ভয়ে স্থানীয় লোকেরাও মুখ খুলতে চায় না। অর্থ ও ক্ষমতার কারণে কিছু অসৎ পুলিশও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে গড়িমসি করে। আবার মামলা নিলেও তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে টালবাহানা করে। কখনো টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের বাঁচিয়ে প্রতিবেদন দিতে চেষ্টা করে দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশ। কিংবা অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের না দেখার ভান করে। একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর পুলিশের যথাসময়ে সঠিক ধারায় মামলা গ্রহণ, ধর্ষক ও ধর্ষিতার সঠিক বয়স উল্লেখ, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, চিকিৎসকের নির্ভুল ময়নাতদন্ত, যথাযথ ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ওপর পুরো বিচার প্রক্রিয়া নির্ভরশীল। এর ভিন্নতা হলে ধর্ষক বিচারে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। কাজেই ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় অপরাধী যাতে উপযুক্ত শাস্তি পায় এর নিশ্চয়তা বিধান মামলার বিচার সংশ্লিষ্টদের মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
ধর্ষণসহ নারীর প্রতি যে কোনো ধরনের সহিংসতা রোধে সামাজিক কাঠামোকে বদলাতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ার সংস্কার ও নিয়মে আনতে হবে পরিবর্তন। ধর্ষণের মতো দুষ্টক্ষতকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হলে তরুণ সমাজকে মাদকের কবল থেকে ফেরাতে হবে। তরুণদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের যথাযথ ভ‚মিকা পালন করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে কিশোর-কিশোরীদের জন্য যৌনশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বাবা-মা ও অভিভাবকদের তাদের সন্তানকে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময় দিতে হবে। ঘরে বিনোদনের ব্যবস্থা করে সন্তানের সঙ্গে একত্রে খাওয়া-দাওয়া ঘরোয়া খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখতে হবে।
বন্ধ কক্ষে সন্তান যেন শুধু মোবাইল ফোন আর ভিডিও গেমে মজে না থাকে সেই দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের স্বীকৃত সমঅধিকার প্রতিষ্ঠাসহ রাস্তাঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হলে ধর্ষণ প্রতিরোধ অনেকটা সহজ হবে। পুরুষতন্ত্রের সমাজমানসের চলমান ধারা না পাল্টিয়ে ধর্ষণ রোধ কঠিন হবে। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনায় সহিংসতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি ধর্ষণ নির্মূলে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করবে। একটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া দুটি সন্তান আনুশকা ও দিহানের জীবনের আজকের করুণ পরিণতির অচলায়ন ভেঙে মুক্তির পথে বেরিয়ে আসার এখনই সময়। সমাজের এই ভগ্নদশা থেকে মুক্তি না পেলে আমাদের আনুশকারা কেবল ধর্ষিতা হতেই থাকবে, প্রতিদিন আমাদেরই ঘরে জন্ম নেবে দিহানরা।

মালিবাগ, ঢাকা।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়