দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য নির্মল পৃথিবী চাই

আগের সংবাদ

গাইবান্ধায় শীতের তীব্রতায় জনজীবন স্থবির

পরের সংবাদ

টিকায় দশ কাজের এক কাজে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২১ , ১০:০৫ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৯, ২০২১ , ১০:০৫ অপরাহ্ণ

ভ্যাকসিনে রোগ সারানোর আগে ভ্যাকসিনকে সারানোর পর্বটা বিপদের সঙ্গে আপদের মতো। সরকারের আয়োজন যেখানে ভ্যাকসিন আমদানি, সংরক্ষণ, বিতরণ, প্রয়োগ ইত্যাদি নিয়ে, সেখানে বাড়তি যোগ হয়েছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো। বলার অপেক্ষা রাখে না করোনার টিকা কার্যক্রম একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা বা সদর হাসপাতাল মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৭ হাজারের মতো কেন্দ্রে চলবে টিকাদান।

নানা বিতর্ক-সমালোচনার মধ্যেও করোনা ভ্যাকসিন পেতে ‘সব পথ খোলা’ রেখে কাজের কাজ করেছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, সুদূরের নরওয়ে, ফিলিপাইনসহ দেশে দেশে ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াদৃষ্টে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তটির যথার্থতা নির্দেশ করছে।
ভারতে প্রথম ধাপে করোনার ভ্যাকসিন নেয়ার পর অন্তত ৬৪ জনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পড়াদের সবাই স্বাস্থ্যকর্মী। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দিল্লিতে কয়েকজনের শরীরে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখার পর তারা ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। খবর চাউর হয়েছে বিশ্বগণমাধ্যমে। ব্যাপক নিউজভ্যালু পেয়েছে ভারতে করোনার টিকার সাইড ইফেক্টের খবর। এদিকে কোভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছে ভারত বায়োটেক। কোভ্যাকসিন নামের টিকাটি ভারতে অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা ছিল- এই টিকা হবে এক ‘গেম-চেঞ্জার’। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এর অনুমোদন দেয়ার প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও অনেকে বলেন, ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়ার আগে টিকা অনুমোদন করে দেয়াটা উদ্বেগজনক এমনকি পরে যদি এটা কার্যকর বা নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয় তাহলেও। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান অল ইন্ডিয়া ড্রাগ অ্যাকশন নেটওয়ার্ক বলেছে, ব্যাপারটায় তারা ‘স্তম্ভিত।’ সব মিলিয়ে ভারত টিকা প্রয়োগে একটা ধাক্কা খেল।
ভারত এবং টিকা প্রশ্নে খবরটি বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। নরওয়ের খবর আরো খারাপ। সেখানে করোনার টিকা নেয়ার পর ২৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে। তাদের সবার বয়স পঁচাত্তরের ওপরে। আশির ওপরে কয়েকজন। টিকা দেয়ার জন্য নরওয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল বয়স্ক এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ক্যাটাগরির ৪২ হাজার নাগরিককে ফাইজারের টিকা দেয়া হয়েছে। তাদের ২৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
এক দেশের জন্য ভ্যাকসিন নিরাপদ হলে অন্য দেশে তা নাও হতে পারে। যুক্তরাজ্যে ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচি শুরুর পর গত ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়েকজনের শরীরে অ্যালার্জি দেখা গেছে। ফিলিপাইনে পরীক্ষা ছাড়াই শিশুদের ওপর একটি টিকা প্রয়োগের পর অনেকে মারা গিয়েছিল। ওই টিকা কিন্তু বাংলাদেশেও প্রয়োগের কথা ছিল। কিন্তু ফিলিপাইনের ঘটনার পর দ্রুত সেটা বাতিল করা হয়। নরওয়ের ২৯ জনের মৃত্যু কি টিকার কারণে ঘটেছে? নরওয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ সেটি খতিয়ে দেখছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য হচ্ছে, বয়স্ক এ ২৯ জনের প্রত্যেকেই নানা ধরনের জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। দেহের অনেক ফাংশনালিটিজই ডিজঅর্ডারে ছিল। আরেক তথ্যে বলা হয়েছে, নরওয়েতে যারা মারা গেছেন তাদের সবাই ছিলেন টারমিনালি ইল। মানে তাদের বেঁচে থাকার আয়ু ছিল মাত্র এক সপ্তাহ থেকে এক মাস। মানে, এক মাসের মধ্যে এমনিতেই তাদের মৃত্যু হতো। এ সম্পর্কিত তথ্য আরো আছে। প্রয়োজনে তথ্য জোগাড় হয়। পুনঃপ্রচারও হয়। বলা হয়ে থাকে, নরওয়েতে প্রতি সপ্তাহে এ ধরনের কেয়ার হোমে সাড়ে ৩ থেকে ৪শ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। তথ্য যা-ই হোক করোনার টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে এ ধরনের খবর। আপাত পরীক্ষায় দেখা গেছে ভ্যাকসিনের সাধারণ সাইড ইফেক্ট হচ্ছে জ্বর, বমির ভাব এবং ডায়রিয়া। দেশে দেশে আতঙ্কও কম নয়। ভ্যাকসিন আমদানি ও প্রয়োগের সন্ধিক্ষণে এসে বাংলাদেশে ভয়টা আরেকটু বেশি। মানুষের ভয়ের বিপরীতে সরকারের দিক থেকে সতর্কতা অবশ্যই ভালো খবর। পরীক্ষার শেষ ধাপে থাকা ভ্যাকসিনের সব উদ্যোগের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগও চলছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল যারা দিতে চাচ্ছে তাদেরই স্বাগত জানাচ্ছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটি অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে বেক্সিমকোর চুক্তি ছাড়াও চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির তৈরি ভ্যাকসিনও বাংলাদেশে ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তবে চীনা ভ্যাকসিনের এই ট্রায়াল কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কিছুই জানানো হয়নি। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি আরো কিছু প্রতিষ্ঠানও ভ্যাকসিন পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী এ পর্যন্ত বিশ্বে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের ১৭০টির বেশি উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ১৩৯টি এখন ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তিনটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ২৫টি ভ্যাকসিন। দ্বিতীয় ধাপে ১৫টি আর পরীক্ষার সবশেষ ধাপে আছে ৭টি। সেগুলোর মধ্যে চীনেরই রয়েছে ৩টি ভ্যাকসিন। এছাড়া চ‚ড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা চালাচ্ছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ও ফাইজার। আর সবকিছু নির্ভর করছে হিউম্যান ট্রায়ালের রেজাল্টের ওপর। তাই সবাই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। এর বাইরে রাশিয়া তাদের ভ্যাকসিন কার্যকর দাবি করে তার অনুমোদন দিয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শেষ হওয়ার আগেই একে বিশ্বের প্রথম করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কারের দাবি করে বসেছে রাশিয়া। তা নিয়ে নানা প্রশ্ন, বিতর্কের মধ্যেই আশার আলো দেখাচ্ছে ভারতে তৈরি কোভিড টিকা ‘কোভ্যাকসিন’। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই টিকাকেও ‘নিরাপদ’ দাবি করেছেন ভারতের গবেষকরা। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির (এনআইভি) সাহায্য নিয়ে এই টিকা তৈরি করেছে হায়দরাবাদের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা ভারত বায়োটেক।
করোনা মোকাবিলায় দেশে দেশে ভ্যাকসিনের এ বাহাদুরিতে ছেদ ফেলছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। আবার এ কথাও সত্য যে, কোনো ভ্যাকসিনেই কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। ইনজেকশন দেয়া জায়গা ফুলে বা লাল হয়ে ওঠা, জ্বর, অবসাদ, মাথা বা শরীর ব্যথার মতো উপসর্গগুলো দীর্ঘস্থায়ী নয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, শরীরে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা শুরু হলে অ্যান্টিবডি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে থাকায় এ ধরনের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। এখন পর্যন্ত সবদিক দিয়ে নিরাপদ বিবেচিত হওয়ার কারণেই ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, স্পুটনিক ইত্যাদি ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ।
এখন পর্যন্ত যতগুলো ভ্যাকসিনের তথ্য জানা গেছে, সেগুলো আসলে পরিপূর্ণ তথ্য নয়। ভ্যাকসিনগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলে মানবদেহে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা এখনো অজানা। শিগগিরই সেটি পরিষ্কার হতে থাকবে। জানার পরিধি বাড়বে। কিন্তু সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করাও আক্রান্ত কারো কারো জন্য অধৈর্যের। আবার ধৈর্যের বিকল্পও নেই। এমন পরিস্থিতিতে সবদিকে দুয়ার খুলে রাখার কৌশলে একটা সুবিধাজনক জায়গা করে দিয়েছে বাংলাদেশকে। এরপরও উদ্বেগ চারদিকে।
ভ্যাকসিনে রোগ সারানোর আগে ভ্যাকসিনকে সারানোর পর্বটা বিপদের সঙ্গে আপদের মতো। সরকারের আয়োজন যেখানে ভ্যাকসিন আমদানি, সংরক্ষণ, বিতরণ, প্রয়োগ ইত্যাদি নিয়ে, সেখানে বাড়তি যোগ হয়েছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো। বলার অপেক্ষা রাখে না করোনার টিকা কার্যক্রম একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা বা সদর হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল, বিজিবি হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল এবং বক্ষব্যাধি হাসপাতাল মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৭ হাজারের মতো কেন্দ্রে চলবে টিকাদান। একটি কেন্দ্রে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জনকে করোনার টিকা দেয়া হবে। ব্যক্তি যাচাই, সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর বা টিপসই নেয়া এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দিতে সব মিলে একেকজনের জন্য ৭ থেকে ১০ মিনিট সময় লাগবে। আয়োজন বিচারে এটি যেনতেন কাজ নয়। পরিসর ও ব্যবস্থাপনা ভোটের চেয়েও বৃহৎ। টিকা নেয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি সম্মতিপত্রে সই করতে হবে অথবা আঙুলের ছাপ দিতে হবে। টিকা দেয়ার জায়গাটি হবে গোপনীয়তায় ঘেরা। কিছুটা ভোটকেন্দ্রের বুথের মতো। তবে তফাৎ থাকবে। ভোট দেয়ার পর কাউকে ভোটকেন্দ্রে থাকতে দেয়া হয় না। কিন্তু টিকা দেয়ার পরপরই কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র ত্যাগ করতে দেয়া হবে না। একটি আলাদা রুমে টিকা নেয়ার পর অপেক্ষা করতে বলা হবে। গোটা আয়োজনটি বাংলাদেশের জন্য নতুন অভিজ্ঞতার।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়