চীনা টিকা কার্যকারিতায় ব্রাজিলের উপলব্ধি

আগের সংবাদ

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

পরের সংবাদ

করোনায় লণ্ডভণ্ড শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুজ্জীবন সহজ হবে না

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৮, ২০২১ , ১০:১৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০২১ , ১০:১৭ অপরাহ্ণ

করোনায় দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে যেভাবে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে, ভেতরে ভেতরে যেসব সমস্যা প্রাথমিক থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত তৈরি হয়েছে সেসবের মোকাবিলা করা এবং বর্তমান যুগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জ্ঞানবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন ও গবেষণা ব্যতীত আমাদের টিকে থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার হবে। আশা করি সরকার ও নীতিনির্ধারকরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যে সুনামি ঘটে গেছে সেটিকে অতিক্রম করার মাধ্যমে নতুনভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন।

২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা করোনার কারণে বন্ধ হয়ে আছে। এখনো আমরা বুঝতে পারছি না দেশের সবস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কবে খুলে দেয়া সম্ভব হবে। করোনা এখনো সারা পৃথিবীতেই ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের এখানে কিছুদিন ধরে নিম্নগামী হলেও বিশেষজ্ঞরা এটিকে করোনার অবসানের ধারা হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারছেন না। কেননা নতুন নতুন ধরনের করোনার রূপান্তর হচ্ছে। এতে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশ ভয়ানক রকম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানান দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে মৃত্যুর মিছিল টেনে ধরতে পারছে না। সে কারণেই আমাদের দেশে করোনার সংক্রমণ আপাতত নিম্নগামী হলেও মার্চের দিকে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও করেছেন, বিশেষজ্ঞরাও তা-ই করছেন। গত বছর করোনা সংক্রমণ দেশে শুরু হওয়ার পর একটি চরম অস্থিরতা শুরু হয়েছিল। প্রায় দুই মাস দেশে লকডাউন ছিল। কিন্তু জীবন ও জীবিকার তাগিদে আমাদের করোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেও মিল, শিল্পকলকারখানা, দোকানপাট, ব্যাংক, অফিসসহ সবকিছুই খুলে দিতে হয়েছে। কিন্তু খোলা যায়নি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তবে সংসদ টিভি ও অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে শহরের বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজ তাদের ছাত্রছাত্রীদের পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। উন্নত দুনিয়ায় অনেক আগে থেকেই অনলাইন পাঠদান চালু রয়েছে। সে কারণে সেখানকার ছাত্র-শিক্ষকরা এই পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষা গ্রহণে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। করোনা এসব দেশে ভয়াবহ সংক্রমণ ও মৃত্যুর ছোবল আনলেও অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করে ওইসব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্রম অব্যাহত রেখেছে। আমাদের এখানে অনলাইন পদ্ধতি সর্বজনীন করা সম্ভব হয়নি। ফলে শহরের কিছুসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটির প্রয়োগ ঘটালেও বেশিরভাগ স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় এই পদ্ধতির ধারেকাছেও যেতে পারেনি। এর ফলে গত মার্চ মাস থেকে এই পর্যন্ত বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পড়ালেখার স্বাভাবিক চর্চা থেকে ছিটকে পড়েছে। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যন্ত বন্ধই রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই গত শিক্ষা বছরটি না পড়েই কাটিয়েছে। অনেকেই হয়তো আশা করেছিলেন সেপ্টেম্বর, অক্টোবরের দিকে অবস্থার উন্নতি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হবে, পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত করার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু কোনোটিই করা গেল না। শেষ পর্যন্ত অটোপাসের মতো সিদ্ধান্তও সরকারকে নিতে হয়েছে। গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। তাদের জন্য সংসদে আইন পাস করে জেএসসি এবং এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণের বিশেষ আইন পাস করাতে যাচ্ছে সরকার। এরপর আসবে তাদের বিশ^বিদ্যালয় ভর্তির আয়োজন। প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত উত্তীর্ণদের নতুন বই এরই মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের ক্লাস কবে থেকে শুরু করা যাবে সেই সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির মেয়াদ ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলো। আগামী কয়েকদিন করোনা সংক্রমণ যদি কমে আসে তাহলে সরকারের পক্ষে অন্তত একটি সিদ্ধান্ত নেয়া কিছুটা সহজ হবেÑ তা হচ্ছে এ বছর যারা এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে তাদের কিছুদিন শ্রেণিপাঠ দেয়ার আয়োজন করা। শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি কিছুদিন আগে বলেছিলেন যে, আগামী জুন, জুলাইয়ের দিকে এসএসসি এবং আগস্ট মাসের দিকে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার চিন্তা থেকে সরকার শিক্ষার্থীদের শ্রেণিপাঠদানের সুযোগ করে দিতে চায়। আমাদের কাছেও মনে হচ্ছে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে হয়তো খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে পারে। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি ঘটলে আরো বড় পরিসরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসার অনুমোদন দিতে পারে। এ ছাড়া বিশ^বিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষা এইচএসসির পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরই শুরু হতে যাচ্ছে বলে সবাই মনে করছেন। সুতরাং এই পরীক্ষাগুলো দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত করার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাণ ফিরে আসার সম্ভাব্যতা যাচাই করা সহজ হতে পারে।
গত প্রায় ১০ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নীরবে অনেক নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে গেছেÑ যা এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলে এমনকি শহর-উপশহরগুলোতেও প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে অভিভাবকরা বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই সময়ে অনেক জায়গায় রাতারাতি হেফজখানা, হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ক্যাডেট মাদ্রাসা ইত্যাদি নামে বেশকিছু অনুমোদনহীন ‘প্রতিষ্ঠান’ খোলা হয়েছে। এগুলোতে দলে দলে ছেলেমেয়ে পড়তে যাচ্ছে। অবশ্যই তা বিনা পয়সায় নয় বরং মাসিক ছাত্র বেতনের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় ধর্মবিষয়ক শিক্ষক, বিভিন্ন উচ্চতর মাদ্রাসায় পড়–য়া ছাত্র, এমনকি স্কুল-কলেজের শিক্ষকও। বিভিন্ন শহর-উপশহরে বাড়ি ভাড়া করে অনেকেই এ ধরনের আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসায় শিক্ষকরা ছাত্রীদের তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার জন্য অভিভাবকদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখন এসব মাদ্রাসায় এবং ভাড়া বাড়িতে গড়ে তোলা বিভিন্ন ধরনের অনুমোদনহীন মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন আর আগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই। বই বিতরণের সময় এই দৃশ্যটি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে।
করোনা সংক্রমণের ফলে এখন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার চিত্রটি যেভাবে ধরা দেবে সেটি আমাদের অনেকের কাছেই বেশ হতাশা ও দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অসংখ্য কেজি স্কুল এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। সেসব স্কুলের শিক্ষার্থী এখন কে কোথায় ভর্তি হচ্ছে সেটি স্কুল খুলে দেয়ার পরই কেবল বুঝা যাবে। আবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে গেছে কিনা, কমলে তারা কোথায় গেছে, সেখান থেকে ফিরে আসছে কিনাÑ এসবই দেখা যাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পর। অনেক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা সেটিও চিন্তার বিষয়। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ এখনো জানি না তাদের সব শিক্ষার্থী আবার ফিরে আসবে কিনা। সরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো খুলে দেয়ার পর হয়তো শিক্ষার্থীদের ফিরে পাবে। কিন্তু বেশকিছু বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় বোধহয় ভবিষ্যতে ছাত্র সংকটের কারণে আপনাআপনি ঝরে যেতে পারে। কিছু কিছু বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় অনলাইন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে অনেকটাই টিকে আছে। তবে সেগুলোতেও এখন শিক্ষক সংকট বেড়ে যাচ্ছে। কেননা কর্তৃপক্ষও আর্থিক সংকটের অজুহাতে শিক্ষক কমিয়ে দিচ্ছে, বাড়তি চাপ পড়ছে গিয়ে অন্যদের ওপর। এভাবেই নানা হিসাব-নিকাশ, কাটছাঁট আসছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সামনের দিনগুলোতে নতুনভাবে যদি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি গ্রহণ না করে তাহলে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে আমাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বেশ কঠিন হবে। তা ছাড়া করোনার সঙ্গে আমাদের বসবাস সম্ভবত আরো কয়েক বছর করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিশ^ অর্থনীতি, রাজনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পুনরুজ্জীবিত করলেই চলবে না নতুন কারিকুলামে ঢেলে সাজানো ছাড়া টিকে থাকার কোনো উপায় নেই। আমাদের নতুন প্রজন্ম যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানে মেধাবী ও দক্ষ না হয়ে উঠে তাহলে নিকট ভবিষ্যতে আমরা টিকে থাকার লড়াইতে খুব একটা অবস্থান নিতে পারব না। সেজন্য করোনায় দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে যেভাবে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে, ভেতরে ভেতরে যেসব সমস্যা প্রাথমিক থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত তৈরি হয়েছে সেসবের মোকাবিলা করা এবং বর্তমান যুগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জ্ঞানবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন ও গবেষণা ব্যতীত আমাদের টিকে থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার হবে। আশা করি সরকার ও নীতিনির্ধারকরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যে সুনামি ঘটে গেছে সেটিকে অতিক্রম করার মাধ্যমে নতুনভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। তাহলেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন অধিকতর কার্যকর হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়