রাণীনগরে আ.লীগ নেতা মজিদের মোটর শোভাযাত্রা

আগের সংবাদ

শেরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১

পরের সংবাদ

পোশাকশিল্পে বাঁচার লড়াই!

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২১ , ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৭, ২০২১ , ১২:১৮ অপরাহ্ণ

প্রণোদনার টাকা পরিশোধে আরো এক বছর সময় চেয়েছে বিজিএমইএ

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরু হয় গত বছরের মার্চে। তার পরের মাসেই দেশের পোশাক খাত মুখ থুবড়ে পড়ে। গড় রপ্তানি দুই-তৃতীয়াংশ কমে এক বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। বেতন বকেয়া, আকস্মিক ছাঁটাই ও কর্মহীনতার মুখে পড়ে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জের শ্রমঘন এলাকার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন চালিয়েছিল পোশাকশিল্প মালিকরা। অর্ডার কমে যাওয়ায় শ্রমিকের সংখ্যাও কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। গত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি বাড়ায় তারা আশাবাদী হলেও নতুন বছরের শুরুতে নেমে এসেছে হতাশা। তারপরও লড়াই করে পোশাকশিল্প বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় প্রণোদনার টাকা পরিশোধে আরো এক বছর সময় চেয়েছে পোশাকশিল্প খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় পোশাকশিল্পে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারসহ নতুন বাজারে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণসহ অন্যতম আয়ের উৎস ওভেন পোশাকে রপ্তানি কমেছে। নতুন করে যোগ হয়েছে পোশাক তৈরির কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া। অন্যদিকে আগের দামে পোশাক কিনতে চান না ক্রেতারা। সব মিলিয়ে নতুন শঙ্কায় পড়েছে দেশের পোশাক খাত। বর্তমানে টিকে থাকাই কঠিন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৫৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এ অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যের চেয়ে কম ৪ দশমিক ১২ শতাংশ। এ ৬ মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় ৩ শতাংশ বাড়লেও ওভেন পোশাক রপ্তানি আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে। রপ্তানিতে ধস নামায় শ্রমিকদের ওপরেও চাপ বাড়ছে।

এদিকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) তথ্য মতে, করোনার সময়ে প্রায় ৮ হাজার ২৯টি কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের ৭১৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। পরে অবশ্য বেশ কিছু শিল্প কারখানা চালু হলেও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি পোশাক মালিকদের। জানতে চাইলে নিউ এইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ২০২০ সালে বহুকষ্টে করোনার প্রভাব মোকাবিলা করলেও নতুন বছর নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। ইউরোপের দেশগুলোতে দ্বিতীয় ধাপে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। দিন দিন রপ্তানি কার্যাদেশও কমে আসছে। আয় কমে গেলে ব্যয় কমানোর পথও আমাদের খুঁজতে হবে। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের কারখানা বন্ধ না করে আর উপায় থাকে না। আসিফ ইব্রাহীম বলেন, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় আনুমানিক ক্যাপাসিটির তুলনায় ৩০ শতাংশ প্লেসমেন্ট কম হচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানিতে লকডাউনের সময় যত বেশি বাড়বে, আমাদের উদ্বেগও তত বেশি বাড়বে। সার্বিকভাবেই পোশাক খাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আর এ জন্যই আগে পোশাক খাতে যে ঋণ দেয়া হয়েছে, তা পরিশোধে গ্রেস পিরিয়ড সুবিধাসহ ২ বছরের পরিবর্তে ৫ বছরে পরিশোধের দাবি জানিয়েছি। পাশাপাশি নতুন করে প্রণোদনার আবেদন করেছি।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কায় ১০৬ পোশাক কারখানায় ৭০ হাজার পোশাক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। এ দায় শুধু পোশাকশিল্প মালিকদের নয়, বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকেও নিতে হবে। কেননা তারা গত বছর একের পর ক্রয়াদেশ বাতিল করেছেন। কারখানাগুলো টালমাটাল পরিস্থিতির সঙ্গে প্রাণান্তকর সংগ্রাম করে কোনোভাবে টিকে রয়েছে। এবার করোনার দ্বিতীয় প্রকোপ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশে^ করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি ক্রয়াদেশও স্থগিত ও বাতিল হওয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে পোশাকশিল্প গভীর অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীর এ খাতে নতুন করে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। ফলে এ শিল্প দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ও এশিয়া অঞ্চলে যখন কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরু হয়, তার পরের মাসেই দেশের পোশাক খাত মুখ থুবড়ে পড়ে। গড় রপ্তানি দুই-তৃতীয়াংশ কমে এক বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। বেতন বকেয়া, আকস্মিক ছাঁটাই ও কর্মহীনতার মুখে পড়ে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জের শ্রমঘন এলাকার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন চালিয়েছিল পোশাকশিল্প মালিকরা। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি বাড়ায় তারা আশাবাদী হলেও নতুন বছরের শুরুতে নেমে এসেছে হতাশা।

পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি এম এ রহিম ফিরোজ বলেন, দেশে কার্যাদেশ স্থগিতের হার প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো আরো একটি ঝুঁকি মোকাবিলা করছে। এ ঝুঁকি আরো তীব্র করে তুলেছে ক্রয়াদেশের মূল্য কমে যাওয়া (মার্জিন) ও রপ্তানিমূল্য (পেমেন্ট) পেতে দেরি হওয়া। রহিম ফিরোজ বলেন, প্রথমত করোনার টিকা কতটা সফল হচ্ছে তা দেখার জন্য ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। টিকার ফলাফল ইতিবাচক ও নতুন-পুরাতন করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে টিকা কার্যকর হলে আমরা দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াব। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকেন্দ্রিক যে সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা হয়েছে, ২০ জানুয়ারির ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে যদি পরিস্থিতি অশান্ত না হয় তাহলে কার্যাদেশের অনিশ্চয়তাগুলো কেটে যাবে।

জানা গেছে, দ্বিতীয় দফায় কার্যাদেশে ধাক্কা লাগায় বেশ কিছু কারখানাকে আবারো পুরোপুরি বা আংশিক লে-অফে যেতে হয়েছে। কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বেশ কিছু কারখানায় কার্যাদেশ থাকার পরও সময়মতো রপ্তানিমূল্য না আসার কারণে শ্রমিকদের সময় মতো বেতন দিতে পারেনি। এর ফলে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। মিরপুর, সাভার, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে এ ধরনের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রণোদনার কিস্তি দেয়া শুরুর সময় বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। নিট তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আরো এক ধাপ এগিয়ে ২০২০ সালের শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট না দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ইউরোপ-আমেরিকায় দ্বিতীয় ঢেউ লাগার ফলে দ্বিতীয়বার কার্যাদেশ কমেছে। এ হ্রাসের হার প্রায় ২০ শতাংশ। আমরা আশা করেছিলাম ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার টিকা শুরু হলে মানুষের মনে সাহস আসবে। মানুষ কেনাকাটা শুরু করবে। এর প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাব। কিন্তু করোনার তৃতীয় ওয়েভ, নতুন ধরনের করোনার অস্তিত্ব ধরা পড়া ও করোনার টিকার ফল পুরোপুরি দৃশ্যমান না হওয়ার কারণে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে যেতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়