বিএসএফের আমন্ত্রণে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে বিজিবি

আগের সংবাদ

৬২ সহযোগীর মাধ্যমে টাকা পাচার করতেন হালদার

পরের সংবাদ

সরকারের রাজস্ব আয়ে টান

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২১ , ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২১ , ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

সরকারের ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রে নির্ভরতা বাড়বে
৬ মাসে রাজস্ব ঘাটতি সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা
অর্থনীতির কাক্সিক্ষত উত্তরণ হচ্ছে না : ড. জাহিদ

করোনার কারণে সারা বিশে^র মতো বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বেড়েই চলেছে। করোনার সংক্রমণ হার কিছুটা নিম্নমুখী হলেও সরকার নির্ধারিত জিডিপির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, করোনার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হয়নি। যার প্রভাব পড়েছে সরকারের আয়ে। সরকারের রাজস্ব আয়ের ৮৬ শতাংশের জোগান দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই পরিস্থিতিতে কোথা থেকে আসবে বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের ব্যয়? এই ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রে নির্ভর করতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

জানা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করেছে সরকার। বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় করা হবে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এডিপিবহির্ভূত প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৭২২ কোটি ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে যাবে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। অন্যান্য উন্নয়ন খাতের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। আর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

বাজেটে সরকারের আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কর ব্যতীত আয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ড ছাড়াও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে আরো ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের আয়ের জোগানদাতা এনবিআরের রাজস্ব আয়ে ধারা ক্রমশ নিম্নমুখী। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৬ মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত ভ্যাটে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শুধু ভ্যাটেই নয়, আয়কর ও আমদানি-রপ্তানি খাতেও রাজস্ব আদায়ের চিত্র খুব নাজুক। করোনাকালে কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দিয়েও কার্যত সুফল মিলেনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার করোনাকালীন সময়ে যেভাবে অর্থনীতির গতিধারা বিবেচনায় নিয়ে প্রাক্কলন করেছে কার্যত সেভাবে অর্থনীতির উত্তরণ হচ্ছে না। যার প্রমাণ ভ্যাট আদায়। কারণ অর্থনীতির গতিশীলতার সঙ্গে ভোক্তা ব্যয় একটি বড় অনুসঙ্গ। অর্থনীতি সচল থাকলে ভোক্তা ব্যয় বাড়বে। এতে ভ্যাট বাড়ার কথা। উল্টো ভ্যাটে মাইনাস প্রবৃদ্ধি হওয়ার অর্থ জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন সরকার করেছে, তার থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও দ্বিমত ছিল বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের। তিনি এক পত্রের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা একটি অবাস্তব। যা অর্জন করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার করোনাকালে উচ্চ বিলাসী বাজেট পেশ করেছে। এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। করোনাকালে মানুষের আয় কমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবিরতা বিরাজ করছে। যার কারণে রাজস্ব আয় কমছে। এছাড়া বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ সহায়তাও কমেছে। সবমিলে এই অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে এমন প্রশ্নের উত্তরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাজেট ঘাটতি বাড়বে। এই অর্থের জোগান দিতে সরকারের ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রে নির্ভরতা বাড়বে।

জানা গেছে, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ায় বৈদেশিক সহায়তায় অনুদানের পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক সহায়তায় অনুদানের পরিমাণ ছিল ৮৪ থেকে ৮৬ শতাংশ, বাকিটা ছিল ঋণ। এখন সেই অনুদানের পরিমাণ নেমেছে ৩ শতাংশে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বৈদেশিক সহায়তা সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করার প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যে পরিমাণে রাজস্ব ঘাটতি ছিল, শেষ তিন মাসে তা বেড়ে দিগুণ দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। ভ্যাট আদায়ে সক্রিয়তা দেখানো হলেও ভ্যাটেও সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। আলোচ্য সময়ে এনবিআরের ভ্যাটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। ভ্যাটে প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানিতে অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। আমদানি-রপ্তানিতে ঘাটতি ১২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। আয়করে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৩৪ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ আয়কর খাতে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, করোনাকালে রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কারণে ঘাটতি বাড়ছে। এনবিআরের অটোমেশনসহ ভ্যাট আদায়ে নানা জটিলতা রয়েছে। করদাতাদের হয়রানিসহ নানা কারণে রাজস্ব আদায়ের গতি শ্লথ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলোÑ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ভ্যাট অটোমেশন, ট্যাক্স অটোমেশন ও ভ্যাট অটোমেশন না হওয়ায় কোনো সুফল দিচ্ছে না। যার কারণে রাজস্ব আদায়ে গতি ফিরছে না।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়