৫২ পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী ঘোষণা

আগের সংবাদ

খোলা সব, বন্ধ শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!

পরের সংবাদ

সাংবাদিক মহলে শোকের ছায়া

ভোরের কাগজের সাংবাদিক হিলালীর অকাল প্রয়াণ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২১ , ১০:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২১ , ১০:৩১ অপরাহ্ণ

জুমার নামাজের আগেই ভিড় বাড়তে থাকে ভোরের কাগজ কার্যালয়ের সামনে। উপস্থিত সবার চোখে-মুখে শোকের ছায়া। সবাই যেন বাকরুদ্ধ। অবাক চাহনিতে লাশবহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা। প্রিয় সহকর্মীর এমন অকাল মৃত্যু মানতে পারছেন না কেউ। কারো চোখের কোণে দানা বেঁধে আছে অশ্রু। কেউবা খানিক সময় পরপর স্মৃতিচারণ করে আবার নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছেন। যার জন্য এ শোকাবহ পরিবেশ তার নাম হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী। ভোরের কাগজের সিনিয়র সহসম্পাদক। মাত্র ৪৯ বছর বয়সেই বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে নীরবেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার (১৫ জানুযারি) দুপুর ২টার দিকে ভোরের কাগজ কার্যালয়ে আনা হয় তার লাশ। এর আগে সকাল পৌনে ৯টার দিকে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি। তার স্ত্রী সাদিয়া আফরোজ সাজি জানান, আজ (১৬ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিতব্য সাব-এডিটরস কাউন্সিলের নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী। তারই অংশ হিসেবে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাব-এডিটরস কাউন্সিলের (ডিএসইসি) সাধারণ সভায় অংশ নিতে বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করায় তাকে দ্রুত মালিবাগের খিদমাহ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

সাংবাদিক হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন ও সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান ও অন্যান্য সাংবাদিক নেতারা। ছবি: ভোরের কাগজ।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভোরের কাগজের প্রকাশক ও ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী এবং সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সাবের হোসেন চৌধুরী প্রয়াতের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। আর সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী ছিলেন ভোরের কাগজের অন্যতম একজন দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক। তার এই অকাল প্রয়াণ মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে আমাদের।

জুমার নামাজের পর খিলগাঁও তিলপাপাড়া জামে মসজিদে প্রথম জানাজা শেষে লাশ আনা হয় হিলালী ওয়াদুদের কর্মস্থল ভোরের কাগজ কার্যালয়ে। এখানে তার দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। এ সময় অন্যদের মধ্যে ভোরের কাগজের বার্তা সম্পাদক ইখতিয়ার উদ্দিন, চিফ রিপোর্টার খোন্দকার কাওছার হোসেন, মফস্বল সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও অর্থ ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল করিম সোহাগ, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক এস এম এ রাজ্জাকসহ তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা জানাজায় অংশ নেন। এরপর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক সুজন নন্দী মজুমদারসহ ভোরের কাগজ পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত সবাই তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় হিলালী ওয়াদুদের মেয়ে আইডিয়াল স্কুলের মুগদা শাখার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামারা হিলালীর হৃদয়বিদারক কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।

প্রেস ক্লাবে হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরীর জানাজা

জানাজার আগে ভোরের কাগজের বার্তা সম্পাদক ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ভোরের কাগজ পরিবারের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন হিলালী ওয়াদুদ। তাকে হারানোর শোক সইবার ভাষা আমাদের নেই। হিলালী শুধু পেশাগতভাবেই দক্ষ ছিলেন তা নয়, অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল, গতিশীল, বিনয়ী মানুষ হিসেবে সবার মন জয় করেছিলেন। তাকে হারানোর ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।

ভোরের কাগজের চিফ রিপোর্টার খোন্দকার কাওছার হোসেন বলেন, হিলালী ওয়াদুদের অনাকাক্ষিত মৃত্যুর শোক কীভাবে কাটিয়ে উঠব জানি না। কারণে-অকারণে কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন।

ভোরের কাগজের মফস্বল সম্পাদক আবদুল মোতালেব বলেন, আমার কাজের অন্যতম বলিষ্ঠ সহযোগীকে আর পাব না, এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কী হতে পারে। একটি সংগঠনের প্রার্থী হওয়ায় কিছু দিন ধরে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন হিলালী ওয়াদুদ। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নানা বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়। ভাবতেই পারিনি পরের দিন (শুক্রবার) সকালে শুনতে হবে হিলালী আর নেই। বাস্তবতা হয়তো মেনে নিতে হচ্ছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে জমা হওয়া স্মৃতিগুলো হয়তো চিরকাল মনে করিয়ে দেবে হিলালীকে।

সাংবাদিক হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ভোরের কাগজ পরিবার। ছবি: ভোরের কাগজ।

এরপর লাশ নেয়া হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবে। সেখানে আগেই জমায়েত হন শত শত সাংবাদিক ও শুভাকাক্সক্ষী। ফুল দিয়ে হিলালী ওয়াদুদকে শ্রদ্ধা জানায় জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), সাব-এডিটর কাউন্সিল, ঢাকা সাংবাদিক পরিবার বহুমুখী সমিতি (আরডিজেএ), রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি। সেখানেই সম্পন্ন হয় তৃতীয় জানাজা।

এতে অংশ নেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাঈনুল আলম ও আশরাফ আলী, কোষাধ্যক্ষ শাহেদ চৌধুরী, কার্যনির্বাহী সদস্য রহমান মোস্তাফিজ, বিএফইউজের কোষাধ্যক্ষ দিপ আজাদ, ডিইউজের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু, প্রচার সম্পাদক আছাদুজ্জামান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোরসালিন নোমানী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব আবদুল জলিল ভ‚ঁইয়া, সাব-এডিটর কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি কায়কোবাদ মিলন, শাহজাহান মিয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বর্তমান সভাপতি জাকির হোসেন ইমন, সাধারণ সম্পাদক মুক্তাদির অনিক, মৃত হিলালী ওয়াদুদের চাচা আবু হাতেম চৌধুরী, ফুফাতো ভাই লাজ্জাদ এনাব মহসি, মামাতো ভাই রফিক আহমেদ মুফদিসহ কয়েকশ সাংবাদিক।

সাংবাদিক হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা। ছবি: ভোরের কাগজ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য শাহনাজ বেগম পলি। ফরিদা ইয়াসমিন তার অনুভ‚তি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, এ মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। বৃহস্পতিবারও গভীর রাত পর্যন্ত প্রেস ক্লাবে নিজের জন্য ভোট চেয়েছেন হিলালী। অথচ তার মৃত্যুর খবরে আজকের দিনটা শুরু হলো। আমরা প্রতিটা সদস্য আজ মর্মাহত। তিনি আরো বলেন, প্রেস ক্লাবের প্রতিটা কাজে আমরা তাকে পাশে পেয়েছি। ফ্যামিলি ডে, নারী দিবস পালন থেকে শুরু করে সব কাজই সূ²ভাবে শেষ করতে কাজ করে গেছেন। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত নরম মনের মানুষ ছিলেন। কোনো ধরনের আওয়াজ ছিল না। তার নীরবে কাজ করা আবার নীরবে চলে যাওয়া আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে গেছে। এই দুঃসময়ে হিলালী ওয়াদুদের পরিবারের পাশে থাকার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, আমাদের সবার জন্য নীরবে কাজ করে গেছেন অত্যন্ত বিচক্ষণ, পরিশ্রমী সাংবাদিক হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী। একদিন পরই সাব-এডিটর কাউন্সিলে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী ছিলেন তিনি। অকাল মৃত্যুর খবরে সেখানেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এজন্য ভোটের তারিখ পিছিয়ে ২৪ জানুয়ারি করা হয়েছে।

হিলালী ওয়াদুদের মামাতো ভাই রফিক আহমেদ মুফদি বলেন, আমরা অনেক ভাই-বোন মিলে এ পেশায় যুক্ত রয়েছি। এ সূত্রেই সাংবাদিকতায় এসেছিল সে। দীর্ঘ সময় এ পেশায় যুক্ত ছিল। এ সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত বা পেশাগত কারণে কারো মনে কষ্ট জমা থাকলে ক্ষমা করে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বেলা সোয়া ৩টার দিকে, তার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর ডোমারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সেখানেই চতুর্থ জানাজার নামাজ শেষে আজ শনিবার সকালে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

নীলফামারী জেলার ডোমার থানার ছোট রাউতা গ্রামের স্বনামধন্য সাংবাদিক মরহুম মো. ওবায়দুল মোকাদ্দেস চৌধুরীর ছেলে হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর খিলগাঁও তিলপাপাড়ার ৩৪৪/এ নম্বর বাসায় থাকতেন। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৯৪ সাল থেকে দৈনিক রুপালীতে সহসম্পাদক (মফস্বল সম্পাদক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৫ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ভোরের কাগজে যোগদান করেন। সর্বশেষ সিনিয়র সহসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়